নিজস্ব প্রতিবেদক : পরিবেশ বিপর্যয়ের ফলে প্রাকৃতিক যে পরিবর্তন ঘটছে তা ক্যানসারের প্রকোপ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। এতে বাংলাদেশে ক্যানসার রোগীর সংখ্যা আশংকাজনকহারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। যা জনস্বাস্থ্য, চিকিৎসা ব্যবস্থাসহ দেশের সার্বিক অর্থনীতির উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
বৃহস্পতিবার বিশ্ব ক্যানসার দিবস উপলক্ষে আয়োজিত ‘ক্যানসার এবং পরিবেশ বিপর্যয়’ শীর্ষক আলোচনা সভায় এসব মতামত উঠে আসে। পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা) নিজেদের কার্যালয়ে এই আলোচনা সভার আয়োজন করে।
স্বাস্থ্যবান জাতি গঠনে পরিবেশ বিধ্বংসী কর্মকাণ্ড বন্ধে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি ওঠে সভা থেকে। একই সঙ্গে উন্নয়ন ভাবনায় পরিবেশকে অগ্রাধিকার দেয়ার ব্যাপারে অভিমত দেন বক্তারা।
পবা’র চেয়ারম্যান আবু নাসের খানের সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখেন, পবার নির্বাহী সাধারণ সম্পাদক প্রকৌশলী আবদুস সোবহান, কুমুদিনী উইমেন্স মেডিকেল কলেজের সহযোগী অধ্যাপক ডা. বিলকিস বেগম চৌধুরী, প্রিজারভেশন অফ সিভিল রাইটসের চেয়ারম্যান সৈয়দ নাজমুল আরেফিন। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিষমুক্ত খাদ্য বিষয়ক জাতীয় কমিটির সদস্য সচিব ডা. লেলিন চৌধুরী।
প্রবন্ধে বলা হয়, প্রতিবছর বাংলাদেশে নতুন করে ক্যানসারে আক্রান্ত হচ্ছে আড়াই লাখের মতো মানুষ। এর কারণ- কৃষিতে অনিয়ন্ত্রিত কীটনাশকের ব্যবহার, খাদ্যদ্রব্যে ফরমালিনসহ বিষাক্ত রাসায়নিকের মিশ্রণ, শব্দদূষণ, ধুলা ও পানি দূষণসহ নানা দূষণে বিপর্যস্ত হচ্ছে এখানকার পরিবেশ। যা জনস্বাস্থ্যের উপর মারাত্মক বিরূপ প্রভাব ফেলছে এবং ক্যানসার আক্রান্তের হার বাড়াচ্ছে।
বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ক্যান্সার রোধ করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নিতে পারলে ২০৩২ সালের মধ্যে সারা বিশ্বে মারা যাবে ২২ মিলিয়ন মানুষ। মোট ক্যানসারের প্রায় পাঁচ ভাগের একভাগ সরাসরি পরিবেশ দুষণের সঙ্গে যুক্ত। এ কারণে ২০০৪ সালে ১ দশমিক ৩ মিলিয়ন মানুষের মৃত্যু হয়েছিলো। এছাড়াও অন্যান্য ক্যানসারের উল্লেখযোগ্য অংশ পরিবেশ বিপর্যয়ের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে যুক্ত।
পরিবেশবাদীরা বলছেন, অপর্যাপ্ত খোলা জায়গা, খেলাধুলা ও বিনোদন সুবিধার অভাবে এখানকার শিশুরা নানাবিধ অসুখ-বিসুখ নিয়ে বেড়ে উঠছে। সেইসঙ্গে পরিবেশবান্ধব যাতায়াত ব্যবস্থা সংকুচিত হওয়ায় এবং গাড়ির সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধিতে বায়ু ও শব্দদূষণ বৃদ্ধি পাচ্ছে আশংকাজনকহারে। স্বাস্থ্যসহ যার মারাত্মক প্রভাব পড়ছে জাতীয় অর্থনীতিতেও।
আলোচনাসভা থেকে, জনস্বাস্থ্যসহ সার্বিক উন্নয়নে পরিবেশ বিপর্যয় রোধে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন পরিবেশবাদীরা।
এদিকে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পানি দূষণ, খাদ্য দূষণ, বিভিন্ন ধরণের বিকীরন, জীবন যাপনের ধরণ, প্রসাধন সামগ্রী, কীটনাশক, মানবসৃষ্ট নানা ধরনের ধোঁয়া ইত্যাদির প্রতিদিন আমাদের ক্যানসার ঝুঁকির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এছাড়া যে ১০টি কেমিক্যাল ক্যানসার তৈরির সঙ্গে যুক্ত সেগুলোই ব্যাপকভাবে আমাদের খাদ্য, পানীয়, জীবনযাত্রা ও পরিবেশকে নিয়ত দূষণ করছে।
ক্যানসার তৈরির সঙ্গে যুক্ত ১০টি রাসায়নিক হলো : ইউরিয়া, প্যারাবিন, থ্যালেট, পেট্রোলিয়াম বাই প্রডাক্টস, প্রোপাইলিন গ্লাইকল ও পলিইথিলিন গ্লাইকল, সোডিয়াম লরেল, ডাই ইথানল এ্যামাইন (ডিয়া) ও ট্রাই ইথানল এ্যামাইন (টিয়া), ফরমালডিহাইড, কৃত্রিম সুগন্ধী, কৃত্রিম রং ও জিএম খাদ্যশস্য।
এছাড়া কারসিনোজেন হিসেবে ঘোষিত ১০৭ টি কারণের মধ্যে এ্যাসবেস্টেস, আর্সেনিক, বেনজিন, বেনজো পাইরিন, সিলিকা, এ্যালমুনিয়াম, লোহা ও ইস্পাত কারখানা ইত্যাদিও বিভিন্নভাবে পরিবেশ দূষণের সঙ্গে যুক্ত।
বিশ্বসাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, প্রতি ১০ জন ফুসফুসে ক্যানসার রোগীর মধ্যে অন্তত ১ জন কর্মক্ষেত্রের পরিবেশ দূষণের আক্রান্ত হয়ে থাকেন।

