নিজস্ব প্রতিবেদক : আমাদের ঐতিহ্যবাহী শিল্প–সংস্কৃতির পীঠস্থান বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি। রাজধানীর সেগুনবাগিচায় অবস্থিত এ স্থানটি সংস্কৃতিপ্রেমীদের মিলনমেলায় মুখর থাকে প্রতিদিন। সেই শিল্পকলার মাঠে এখন সারি সারি পিঠাপুলির স্টল। স্টল গুলো থেকে বের হচ্ছে মিষ্টি ঘ্রাণে মনমাতানো গরম ধোয়া। এ যেন ভাপা পুলি, মালাই, পাটিসাপটাসহ বাহারি শত রকমের পিঠার মিষ্টি গন্ধে জিভে জল আসার জোগাড়। আর তাইতো পিঠার স্বাদ নিতে শিল্পকলার প্রাঙ্গনে রসনাবিলাসীদের উপচেপড়া ভিড়।
শুধু কি রসনা বিলাস? পিঠা প্রেমীদের আনন্দ দিতে এখানে তৈরি করা হয়েছে উৎসব মঞ্চও। আর সেই মঞ্চ থেকে ভেসে আসছে বাংলার মা মাটির সঙ্গে মিশে থাকা লালন, হাসনরাজা, রাধারমণের গানসহ লোকসঙ্গীত। প্রদর্শিত হচ্ছে লোকনৃত্য, নাটক, যাদুশিল্প ও পিঠার গান।
প্রতিবছরের মতো এবারও শিল্পকলা একাডেমির কফি হাউস প্রাঙ্গণে শুরু হয়েছে আট দিন ব্যাপী এ ‘জাতীয় পিঠা উৎসব’। জাতীয় পিঠা উৎসব উদযাপন পরিষদের আয়োজনে নবমবারের মতো এই উৎসব চলবে ২২ থেকে ২৯ জানুয়ারি পযর্ন্ত। উৎসব উপলক্ষে প্রতিদিন বিকাল ৩টা থেকে রাত ৯টা পযর্ন্ত পিঠা তৈরি, প্রদর্শন ও বিক্রি করা হচ্ছে শিল্পকলার মাঠে। এখানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলভিত্তিক ৩৩টি স্টলে তৈরি হচ্ছে ১৬৮ রমকের পিঠা। পিঠার মধ্যে আছে ছাইয়া পিঠা, সেমাই বল, সুচি পিঠা, শামুক পিঠা, পুলি পিঠা, মুগ পাকন, জামাই পিঠা, বোড়া পিঠা, খেজুরের রসের পিঠা, সবজি পিঠা, ভাপা পিঠা, ঝাল চাপাটি পিঠা, মুগডাল পিঠা, মাসরুম পিঠা, পোয়া পিঠা, সুজি পিঠা, সেমাই পিঠা, বেগুন পিঠা, মাংস পিঠা, পাটি সাপটা পিঠা, ইলিশ পিঠা, ছিট পিঠা, ভাপা পুলি, খাজ পিঠা, সাকুর পিঠা, টক ঝাল পিঠা, গাজর পিঠা, আন্দসা পিঠা, ডিমের পিঠা, ডালের পিঠা, চাঁদ পাকন,পাকুয়ান পিঠা, নয়নতারা পিঠা, চুসি পিঠা, আমের পিঠা, তালের পিঠা, পাটি শাপটা, সতিনের মোচড়, টক ঝাল মিষ্টি পিঠা, পুডিং পিঠা, দুধ পায়েস, ডিম পাতা পিঠা, বুটের ডাল পিঠা, দুধ পুলি, মালাই পিঠা, হার্ট পিঠা, দুধ চিতই, কমলা পিঠা, সাগুদানা পিঠা, প্রজাপতি পিঠা, চিড়া পিঠা, ডিম সাপটা পিঠা, নারিকেল ফুলি, ডিম পকেট, তেলের পিঠা, চিতই পিঠা, পাউরুটি পিঠা, ক্ষিসা পিঠা, ঝাল পুলি, শাহী কুলি, সরভাজা, ভাজা গোলাপ, সেমাই পিঠা, কাটা পিঠা, জাল পুলি, সন্দেশ পিঠা, ডোবা পিঠা, জামাই ঠক পিঠা, নকশী পিঠা, মনপুড়া পিঠা, বকুলফুল পিঠা, চাপড়ি পিঠা, ঝিনুক পিঠা, এলেবেলে পিঠা, তেল চিতই পিঠা, মুখ শেওলা, পোয়া পিঠা, পনির পুলি, মুড়ির রসমালাই, গোলাপ পিঠা, পাকন পিঠা, রস সুন্দরী পিঠা, কলার বড়া পিঠা, সূর্যমুখী পিঠা, তালের বিবি খানা, দুধ লাউ, লাউয়ের বরফি, তিলের পুলি, পান পিঠা, চিটা পিঠা, লবঙ্গ লতিকা, মালপোয়া, ঝাল চাপটি, সাদা দুধ ম্যাড়া পিঠা, বালুসা পিঠা, বাদামি পিঠা, কাঠালি পাতা পিঠা, লঙ্কা পিঠা, করলা চিকেন, ক্ষির মুখি, বৌ পিঠা, কলাপিঠা, ভর্তা পিঠা, মণ্ডা পিঠা, কুকি পিঠা, কুসুম কলি পিঠা, সুন্দরী পাকন পিঠা, হৃদয় হরণ পিঠা, মসলা পিঠা, রসমাধুরী পিঠা, বেনী পিঠা, রস কদম, স্যান্নাই পিঠা, লাটি পিঠা, গাজরের পাটি সাপটা, বিস্কুট পিঠা, পাতা পিঠা, ক্যালকাটা পুলি, বাকরখানি, ফুল পিঠা, চিকেন মনপুরা, প্রজাপতি, কুমার পিঠা, ক্ষিরের প্যাড়া, ফুল পাকন, মুগ সলা পিঠা, রসভরি পিঠা, বৈশাখি পিঠা, চিড়ার নাড়ু, নারকেলের নাড়ু, কাথা পিঠা, মাকড়সা পিঠা প্রভৃতি।
নোয়াখালী অঞ্চলের পিঠার স্টল ‘নোয়াখালী চম্পা পিঠা ঘর’। এখানে পাওয়া যাচ্ছে চিকেন পুলি ৩০ টাকা, চিরুনী ১০ টাকা, শবজি পুলি ২০ টাকা, পাকন ৩০ টাকা, নকশী ২০ টাকা, মালপোয়া ২০ টাকা, পাটি সাপটা ২০ টাকা, লবঙ্গ লতিকা ২০ টাকা, ভাজা পুলি ২০ টাকা। এছাড়া আছে নারিকেল পুলি, চিকেন পুলি, সেদ্ধ পুলি, মেরা ও ছাইয়া পিঠা প্রভৃতি।
এই স্টলের বিক্রয় প্রতিনিধি মনসুর ও সজল বলেন, পিঠার এ দাম শুধু উৎসবের জন্য। একই পিঠা আমাদের ডেমরা সারোলিয়ার বাজারের যে পিঠাঘর আছে সেখানে কিছুটা কম দামে পাওয়া যাবে।
তারা বলেন, উৎসবে প্রতিদিন ১০ থেকে ২০ হাজার টাকার পিঠা বিক্রি হচ্ছে। অনেক ক্রেতা আছে যারা নিজেরা এখানে খেয়ে আবার বাসার জন্যও কিনে নেন। ছাইয়া ও নারিকেলের পুলি নোয়াখালীতে অনেক জনপ্রিয় বলে জানালেন এ দুজন বিক্রেতা।
বাহারি পিঠা তৈরি দেশজ সংস্কৃতির এক অনন্য শিল্প বলে সমাদৃত। পারিবারিক, সামাজিক ও ধর্মীয় উৎসবে পিঠার প্রচলন বহু পুরনো বিধায় শত সহস্র বছরে পিঠা তৈরি এক অনন্য শিল্পরুপ লাভ করেছে বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে। ফাস্টফুডের এই যুগে ঢাকার আনাচে কানাচে গড়ে উঠেছে অনেক পিঠাঘর।
শুধু ব্যবসার জন্যেই নয় এমনও অনেক আছেন যারা শখের বসে পিঠা নিয়ে কাজ করতে ভালবাসেন। তাদেরই একজন নরসিংদীর টুনটুনি। দৈনিক ইত্তেফাকের ফিচার রাইটার টুনটুনি বলেন, আমার পেশা সাংবাদিকতা। তবে সখের বসেই পিঠা নিয়ে কাজ করি। রাজধানীর লালমাটিয়া, ধানমণ্ডি, মগবাজার আমার ‘লুকলাভ’ নামে তিনটি পিঠাঘর আছে। যেহেতু আমার জেলা নরসিংদী তাই ‘নরসিংদী পিঠাঘর’ নাম দিয়ে পিঠা উৎসবে যোগ দিয়েছি।
টুনটুনির দোকানের প্রতিটি পিঠার দাম ৩০ টাকা। তিনি জানান, নরসিংদী মূলত নকশী পিঠার জন্য বিখ্যাত। একটি নকশী পিঠা তৈরি করতে ১৫ মিনিট সময় লাগে।
ভ্রমর যেমন ফুলের গন্ধে ছুটে আসে। পিঠার গন্ধেও তেমনি যেন এখানে ছুটে আসছেন নানান বয়সী বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষেরা। তাদেরই একজন গৃহবধু সুইটি ও তার দুই মেয়ে আনন্দ ও আয়না। তিনি বলেন, আমাদের সমাজে ফাস্টফুট এমন প্রভাব বিস্তার করেছে যে, এ যুগের ছেলে মেয়েরা যতগুলো বিদেশী ফাস্টফুডের নাম জানে ঠিক ততটি নিজেদের দেশী পিঠার নাম জানে না। প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সামনে দেখবেন ফাস্টফুডের দোকান। কিন্তু একটি পিঠার দোকানও নেই।
সুইটি জানান, সন্তানদের পিঠার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতেই পিঠা উৎসবে এসেছেন তিনি।
উৎসব সূত্রে জানা গেছে, উৎসবে অংশগ্রহণকারী পিঠাশিল্পীদের পাঁচজনকে সেরা পিঠাশিল্পী সম্মাননা স্মারক প্রদান করা হবে। ইতিমধ্যে দেশের প্রথিতযশা শিল্পী, কবি –সাহিত্যিক, সাংবাদিকদের সমন্বয়ে গঠিত ১২১ সদস্যের জাতীয় পিঠা উৎসব উদযাপন পরিষদ উৎসবের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
পিঠা এখনও আন্দোলিত করে সবাইকে। এক সময় পিঠা তৈরি পারিবারিক পরিবেশে এবং অনুষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। ২০০৮ সাল থেকে জাতীয় পিঠা উৎসব আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য ছিল দেশে বিদেশে বাংলাদেশের শত শত রকমের পিঠাকে পরিচিত করে তোলা। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন শহর এমনকি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বাঙালির পিঠা নিয়ে আয়োজিত হচ্ছে বহু উৎসব।

