ঢাকাWednesday , 30 December 2015
  1. অর্থনীতি
  2. আইন-আদালত
  3. আন্তর্জাতিক
  4. আবহাওয়া
  5. কৃষি ও অন্যান্য
  6. খেলাধুলা
  7. গল্প ও কবিতা
  8. জাতীয়
  9. তথ্যপ্রযুক্তি
  10. দেশজুড়ে
  11. ধর্ম ও জীবন
  12. প্রবাস
  13. বানিজ্য
  14. বিনোদন
  15. বিশেষ প্রতিবেদন
আজকের সর্বশেষ সবখবর

চারুকলায় নান্দনিক জয়নুল মেলা

Link Copied!

joynalনিজস্ব প্রতিবেদক : পাহাড়ের ঢালে আদিবাসীরা জুম চাষে উৎপাদিত কার্পাস-জাতীয় তুলা থেকে সুতা তৈরি করেন। বন থেকে সংগৃহীত নানা গাছের পাতা ও ছালের রস দিয়ে তৈরি করেন রং, যা দিয়ে বিভিন্ন রঙে রঙিন করা হয় সুতো। বনাঞ্চল থেকে সংগ্রহ করা বাঁশ ও কাঠ দিয়ে তৈরি হয় কোমরতাঁত শিল্পের প্রয়োজনীয় সব যন্ত্রপাতি। পরিবার-পরিজনের ব্যবহার্য থামি, লুঙ্গি, ওড়না, পিনন, গামছা, খাদি প্রভৃতি তৈরি করেন কোমরতাঁতে। পাহাড়ে কোমরতাঁতে কাপড় বোনার দৃশ্য বিরল না হলেও রাজধানীতে এ দৃশ্য মেলা ভার। কিন্তু চারুকলা প্রাঙ্গণে দেখা গেল এ অসাধারণ দৃশ্যটি।
লিচুতলার এক কোণে বসে আদিবাসী এক নারী কোমরতাঁতে বুনছিলেন সুতোর মাফলার। লাল-নীল সুতোয় গেঁথে চলেছেন পরিধেয় এই বস্ত্রটি। খটাং খটাং আওয়াজ। ছন্দ খেলে যাচ্ছিল চারপাশ। প্রান্তিক এই নারীর ছন্দময় বুননকাজ খুব কাছ থেকে দেখছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়–য়ারা। শুধু শিক্ষার্থীরাই নয়, যারা এসেছিলেন এ উৎসবে তারাও দেখছিলেন ঘোরলাগা এই বুননকর্ম।
২৯ ডিসেম্বর মঙ্গলবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের প্রাঙ্গণে শুরু হয় তিন দিনের জয়নুল মেলা ও উৎসব। সেখানেই দেখা মেলে দেশের ঐতিহ্যবাহী এই কোমরতাঁতের বুনন। মেলায় মিলছে প্রান্তিক জনপদে উৎপাদিত শিল্পিত অনেক কিছুই।
মঙ্গলবার ছিল শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের ১০২তম জন্মজয়ন্তী। ঢাকা আর্ট কলেজ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে যিনি এদেশের শিল্পানুরাগীদের কাছে পথিকৃৎ হয়ে আছেন। তারই সৃষ্ট ঢাকা আর্ট কলেজ তথা বর্তমানের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ ঘটা করেই আয়োজন করেছে ‘জয়নুল মেলা ও উৎসব’। চারুকলার বকুলতলায় সকালে শীতের পরশ গায়ে মেখে উদ্বোধনী আয়োজনে অংশ নেন জয়নুল ভক্তানুরাগীরা। ঢাক-ঢোলের বাদ্যসহযোগে তিন দিনের  এই মেলা ও উৎসবের উদ্বোধন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক।
এ সময় ছিলেন জয়নুলের সহধর্মিণী জাহানারা আবেদিন, সন্তান প্রকৌশলী মঈনুল আবেদিন ও শিল্পী সমরজিৎ রায় চৌধুরী। উদ্বোধনী আয়োজনে ‘এদিন আজি কোন ঘরে গো খুলে দিল দ্বার’, ‘আজি শুভ দিনে পিতারও ভবনে’ ও ‘আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে সত্য-সুন্দর’ গানগুলো পরিবেশন করেন চারুকলার শিক্ষার্থীরা।
প্রধান অতিথির বক্তৃতায় ঢাবি উপাচার্য বলেন, ‘শিল্পচার্য আমাদের নিজেদের সংস্কৃতিকে ভালবাসতে শিখিয়েছেন। তিনি বাংলার মানুষের বৈচিত্র বিদেশে তুলে ধরেছেন। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচিতি লাভে যারা ভূমিকা রেখেছেন শিল্পচার্য তাদের অন্যতম।’
এবার জয়নুল সম্মাননা দেয়া হয়েছে শিল্পকলা ইতিহাস বিভাগের সাবেক অধ্যাপক আবদুল মতিন সরকার ও অধ্যাপক বুলবুল ওসমানকে। তাদের হাতে সম্মাননা স্মারক ও অন্যান্য উপহারসামগ্রী তুলে দেন উদ্বোধক আরেফিন সিদ্দিক ও জয়নুল আবেদিনের সহধর্মিণী জাহানারা আবেদিন। এ সময় চারুকলা অনুষদের ডিন চিত্রশিল্পী অধ্যাপক নিসার হোসেন উপস্থিত ছিলেন। সুশান্ত ঘোষকে দেয়া হয় বিশেষ সম্মাননা। জয়নুল আবেদিনের পরিবারের উদ্যোগে এই পুরস্কারটি তুলে দেন জয়নুল আবেদিনের সন্তান মঈনুল অবেদিন।
অনুষ্ঠানের তৃতীয় পর্বে চারুকলা গ্রাফিক্স ডিজাইন বিভাগের অধ্যাপক মামুন কায়সার সম্পাদিত ‘শিল্পাচার্য জয়নুল অবেদিন জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে বার্ষিক শিল্পকলা প্রদর্শনীর-২০১৪’ গ্রন্থের  মোড়ক উন্মোচন করা হয়। উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ জয়নুল আবেদিনের সংগৃহীত মাটির পুতুলের প্রদর্শনী। ৮ দিনের এ প্রদর্শনী চলবে জয়নুল গ্যালারিতে।
উৎসবে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা ১৭টি স্টল অংশ নিয়েছে।  এগুলোর মধ্য রাজশাহীর পৃৃথক পৃথক দুইটি স্টলে রয়েছে টেপাপুতুল ও শখের হাড়ি। মৌলভীবাজার থেকে আসা দুটি স্টল সাজিয়েছে ঐতিহ্যবাহী শীতলপাটি দিয়ে। সোনারগাঁও থেকে আসা তিনটি স্টলে রয়েছে হাতপাখা, নকশিকাঁথা ও তামা-কাঁসায় নির্মিত নানা অলংকার। ঝিনাইদহ, মাগুরা, নওগাঁ, ঢাকা মহাখালী, নারিন্দা থেকে আগতরা তাদের নিজস্ব শিল্পকর্মের পসরা সাজিয়েছে।
চারুকলার মূল ফটক থেকে শুরু নান্দনিক সব শিল্পদৃশ্য। বাঁশ দিয়ে তৈরি করা হয়েছে উৎসবের গেইট। চারুকলার বারান্দাজুড়ে লাল-নীল, সবুজ-হলুদের সমাহার। বর্ণিল কাগজ ও কাপড় কেটে শিক্ষার্থীরা বানিয়েছেন নববর্ষের শুভেচ্ছা কার্ড, দেয়ালিকা, দিনপঞ্জি, ডায়েরি। রঙিন কাগজগুলোর কোনোটাতে ফড়িং, কোনোটার প্রতিমা-আদল। অঙ্কন, ছাপচিত্র ও প্রাচ্যকলা বিভাগের শিক্ষার্থীরাও সাজিয়েছেন এসব।
ভাস্কর্য বিভাগের শিক্ষার্থীরা তৈরি করেছেন ছোট-বড় নানা আকৃতির ভাস্কর্য ও মুখোশ। মৃৎশিল্প বিভাগের শিক্ষার্থীরা কাদামাটিতে ফুটিয়ে তুলেছেন লোক-ঐতিহ্য। বাংলার পুতুলের ধারাবাহিকতায় আছে টেপা পুতুল, বাহারি গহনা, ছোট-বড় নানা ধরনের পটারি। পটারির ওপর দেখা যায় হাতি-ঘোড়া বা পেঁচার নকশা।
এর আগে সকাল সাড়ে ৯টায় জয়নুল আবেদিনের সমাধিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করে জয়নুল আবেদিনের পরিবার, চারুকলা অনুষদের বিভিন্ন বিভাগ, জাতীয় জাদুঘর, শিল্পকলা একাডেমি, নারায়ণগঞ্জ চারুকলা ইনস্টিটিউটসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন।
অধ্যাপক নিসার হোসেন জানান, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনকে স্মরণ করাই এ উৎসবের প্রধান উদ্দেশ্য। কোনো ব্যবসায়িক মুনাফার উদ্দেশ্যে এই উৎসবের আয়োজন করা হয় না। প্রতিটি বিভাগের ছাত্রছাত্রী ও যশস্বী শিল্পী-শিক্ষকদের সৃষ্ট শিল্পকর্ম ও চিত্রমালা প্রদর্শনই এ মেলার লক্ষ্য।
জয়নুল উৎসব চলবে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত। উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ জয়নুল গ্যালারিতে মাটির পুতুল প্রদর্শনী চলবে ৫ জানুয়ারি পর্যন্ত।