নিজস্ব প্রতিবেদক : ছোট ছোট চায়ের দোকানগুলো থেকে প্রতিদিন আদায় করা হয় ২শ টাকা করে। ভাজা-পোড়া সিঙ্গাড়া-পুরির দোকান থেকে নেয়া হয় ৩শ করে। আর পান-সিগারেটের দোকান থেকে দেড়শ করে। এভাবেই মাসশেষে একটি বিশাল অংকের টাকার মালিক বনে যাচ্ছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মোতাহার হোসেন প্রিন্স।
এর আগে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হলের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন স্থানে ভ্রাম্যমান দোকান বসিয়ে সেগুলো থেকে নির্ধারিত হারে নিয়মিত চাঁদা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
প্রিন্স জিয়াউর রহমান হলে থাকেন। সরেজমিনে দেখা গেছে, এই হলের সামনে চারটি চায়ের দোকান, দুটি সিঙ্গাড়া-পুরির দোকান, একটি দই-চিড়ার দোকান ও ১টি পিঠার দোকান, ১টি রুটি-পরোটার দোকান, তিনটি পান-সিগারেটের দোকান, ১টি কলা ভর্তা ও আচারের দোকানসহ মোট ১৩টি দোকান রয়েছে। প্রিন্স ও তার অনুসারীরা মিলে এসব দোকান পরিচালনা করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এরমধ্যে চায়ের দোকানগুলো আগে থেকেই চালু ছিল। কিছুদিন আগে সেখানে নতুন করে দই-চিড়ার দোকান বসান ঢাবি ছাত্রলীগের সদ্যসাবেক ছাত্রবৃত্তি বিষয়ক সম্পাদক মাসুম ও কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের উপ-সম্পাদক জুয়েল। এরা দুজন প্রিন্সের বন্ধু এবং একসাথে চলাফেরা করেন। হলের সামনে পিঠার দোকানটি বসিয়েছেন প্রিন্সের ‘বাম হাত’ বলে পরিচিত হলের সাংগঠনিক সম্পাদক গাজী হাসিব। সম্প্রতি বিশৃঙ্খলার কারণে প্রিন্স হলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বনি আমিনকে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে অব্যাহতি দিয়ে গাজী হাসিবকে ওই দায়িত্ব দেন। তবে একটি সিঙ্গাড়ার দোকান বসিয়েছেন হলের গ্রন্থনা ও প্রকাশনা বিষয়ক সম্পাদক তানভীর রহমান মাহিদ। তিনি হলশাখা সভাপতি আবু সালমান প্রধান শাওনের অনুসারী।
সূত্র জানায়, এগুলোর মধ্যে ৪টি চায়ের দোকান থেকে তিনি দৈনিক ২০০ টাকা হারে মাসে প্রায় ২৪ হাজার টাকা, ৩টি সিগারেটের দোকান থেকে দিনে ১৫০ টাকা করে মাসে প্রায় ১৩ হাজার ৫০০ টাকা, ২টি নাস্তার দোকান থেকে দৈনিক ৩০০ টাকা করে মাসে অন্তত ১৮ হাজার টাকা আদায় করেন। পরোটার দোকান শুরু করার সময়ে প্রিন্স তার কর্মীদের মাধ্যমে দোকানদারের কাছ থেকে এককালীন ২০ হাজার টাকা আদায় করেন। এছাড়াও তার কর্মীরা সেখানে নিয়মিত খান বলেও জানা গেছে। কলাভর্তা ও আচারের দোকান, রাস্তার উপরের কয়েকটি সিগারেটের দোকানসহ সবমিলিয়ে নূন্যতম মাসিক ৭০-৮০ হাজার টাকা আয় করেন বলে জানিয়েছেন ছাত্রলীগেরই একজন নেতা।
জানা গেছে, কিছুদিন আগে মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হল ও বিজয় একাত্তর হলের সামনে দোকান বসানো নিয়ে দুই হল শাখা ছাত্রলীগের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়। এরই সূত্র ধরে ওই দোকানগুলো উচ্ছেদ করে রাস্তা খালি করে দেয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টরিয়াল টিম। এর কিছুদিন পর আবারো ওই রাস্তায় দুইটি সিগারেটের দোকান বসানো হয়। এরমধ্যে একটি সিগারেটের দোকান বসিয়েছেন জিয়া হলের জাহিদ নামের এক ছাত্রলীগ নেতা। তিনি প্রিন্সের অনুসারী বলে জানা গেছে। আরেকটি জসীমউদ্দিন হলের একজন কর্মচারী বসিয়েছেন বলে জানা গেছে। এছাড়া রাস্তায় আরেকটি কলাভর্তাসহ বিভিন্ন আচারের দোকান বসিয়েছে প্রিন্সের কর্মীরা। সেখান থেকেও তারা নিয়মিত চাঁদা আদায় করেন বলে অভিযোগ আছে।
প্রিন্সের বিরুদ্ধে অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতা হওয়ার পর থেকে তিনি নীলক্ষেতের বিভিন্ন দোকানে পানি সরবরাহের উপর মাসিক চাঁদা নির্ধারণ করেছেন। জানা গেছে, আগে নীলক্ষেত এলাকায় পানি সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করতো ঢাকা কলেজের ছাত্রলীগ নেতারা। ঢাবি ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক হওয়ার পর চাঁদার নিয়ন্ত্রণ করেন প্রিন্স। সূত্র জানায়, নীলক্ষেতে পানি সরবরাহকারীদের কাছ থেকে মাসিক ৩০ হাজার টাকা আদায় করেন প্রিন্সের একান্ত অনুগত কর্মী খাজা খায়ের সুজন। তিনি জিয়া হল শাখা ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং প্রিন্সের বাইক চালান বলে জানা গেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হল সংলগ্ন পিয়ারুর ফুচকার দোকান থেকে প্রিন্সের কর্মীরা মাসিক চাঁদা নেন বলে অভিযোগ আছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থী জানিয়েছেন, সম্প্রতি রোকেয়া হলের নির্মাণাধীন ৭ই মার্চ ভবনের সামনে নতুন একটি সিগারেটের দোকান বসিয়েছে প্রিন্স। ফলে ওই এলাকায় বহিরাগতদের আড্ডা বেড়ে গেছে। সেকারণে বিভিন্ন সময়ে হলের মেয়েরা হয়রানির শিকার হচ্ছে বলেও অভিযোগ আছে।
এর আগে জিয়া হলের সাধারণ সম্পাদক থাকাকালীন অর্থের বিনিময়ে ছাত্রদল কর্মীদের হলে পদ দেয়ার অভিযোগ ওঠে এই নেতার বিরুদ্ধে। সেসময় বিষয়টি নিয়ে তিনি খুবই বিতর্কিত হন।
এছাড়া বিভিন্ন সময় তার বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ঠতারও অভিযোগ পাওয়া গেছে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মোতাহের হোসেন প্রিন্স বলেন, ‘আমি একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ সম্পাদক, এর আগে হলের নেতা থাকার সময়ও কেউ আমার বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ তুলতে পারেনি।’
তিনি তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেন। একে একে সবগুলো অভিযোগ তুলে ধরলে তিনি ক্ষেপে যান এবং ফোন কেটে দেন।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ বলেন, ‘বাংলাদেশ ছাত্রলীগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ সম্পাদক কখনোই এধরনের কাজ করতে পারে না। আর বাংলাদেশ ছাত্রলীগ কখনোই দোকান-পাট বসানোর কাজ করে না। দোকানদাররা বাঁচার জন্যে হয়তো তার নাম বলেছে।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন বলেন, ‘ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অব্যহত মিথ্যাচারের নমুনা এ অভিযোগ। ঢাবি ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক একজন পরিচ্ছন্ন রাজনীতিবীদ। দলের দুঃসময়ে তিনি সামনের সারিতে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। কোন মহল হয়তো তার বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলে ছাত্রলীগের দুর্নাম রটাতে চাইছে।’
তিনি বলেন, ‘কেবল ঢাবি ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকই নয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো পর্যায়ের নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে এ ধরনের কোন অভিযোগ নেই।’

