ঢাকাSaturday , 26 December 2015
  1. অর্থনীতি
  2. আইন-আদালত
  3. আন্তর্জাতিক
  4. আবহাওয়া
  5. কৃষি ও অন্যান্য
  6. খেলাধুলা
  7. গল্প ও কবিতা
  8. জাতীয়
  9. তথ্যপ্রযুক্তি
  10. দেশজুড়ে
  11. ধর্ম ও জীবন
  12. প্রবাস
  13. বানিজ্য
  14. বিনোদন
  15. বিশেষ প্রতিবেদন
আজকের সর্বশেষ সবখবর

‘স্বৈরাচার নিজেকে করে স্বাধীন কিন্তু মানুষকে করে দাস’

Link Copied!

the-greatবিনোদন ডেস্ক : ‘দ্য গ্রেট ডিক্টেটর’, পৃথিবীর ইতিহাসে এক অনবদ্য ছবি। স্যার চার্লি চ্যাপলিনের চিত্রনাট্য, পরিচালনা আর অভিনয়ে ছবিটি গত আশি বছর ধরেও আছে শীর্ষস্থানে। বিশেষ করে ছবির শেষে যে ঐতিহাসিক বক্তব্যটি চ্যাপলিন দিয়েছিলেন, মনে করা হয় যুদ্ধ বিরোধী এবং একইসাথে মানবতাবাদী বক্তব্য হিসেবে পৃথিবীতে এমন অসাধারণ আর উদ্দীপনামূলক বক্তব্য বিরল! পৃথিবীর কোনো যুদ্ধবিরোধী সৈনিক এমন বক্তব্য দিয়েছে, তা ইতিহাসে এখনো শোনা যায়নি।
মূলত ‘দ্য গ্রেট ডিক্টেটর’ এই শেষ বক্তব্যটাই চ্যাপলিনের দর্শন। সারা জীবন তিনি এমন দর্শনই মেনে চলেছেন। যুদ্ধবিরোধী, মানবতাবাদী যে ভীত তারমধ্যে গড়ে উঠেছিল চ্যাপলিন তার ভাষণের মধ্য দিয়ে তাই বলে গেছেন। পৃথিবীর ইতিহাসে বাস্তবের কোনো মহান মানবতাবাদী যেমনটি বলেননি, চ্যাপলিন তার ছবিতে সেই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তাই বলে গেছেন।
একজন নৃপতি থেকে হঠাৎই নানান নাটকীয়তায় রাষ্ট্রের দায়িত্ব পাওয়ার পর ছবির শেষে যে অসাধারণ বক্তব্যটি তিনি তার সৈন্য সামন্ত আর সাধারণ মানুষের উদ্দেশে দেন তা এখানে তুলে ধরা হলো। ভাষণটি হুবুহু কথাসাহিত্যিক শাহাদুজ্জামানের ‘চ্যাপলিন, আজও চমৎকার’ বইটি থেকে নেয়া:
“আমাকে মার্জনা করবেন। আমি সম্রাট হতে চাইনি। সম্রাট হওয়া আমার পেশা নয়, আমি শাসন করতে চাইনা, চাইনা কিছু দখল করতে। আমি সবাইকে সাহায্য করতে চাই-যতটুকু সম্ভব আমার ক্ষমতায়-সে ইহুদি হোক,অ-ইহুদী হোক, কৃষ্ণাঙ্গ, শেতাঙ্গ সকলকে। প্রতিটি মানুষ, প্রতিটি মানুষকে সাহায্য করতে চায়। এটা মানুষের সহজাত ধর্ম। সবাই সুখি হবে, এটিই সবাই চায়, কাউকে দুঃখী করতে কেউ অভ্যস্থ নয়। ঘৃণা নয়। ঘৃণা আমরা ঘৃণা করি। হিংসা করতে আমাদের বাধে। এই দুনিয়ার সকলেরই আছে বেঁচে থাকবার অধিকার। প্রকৃতির অপার সম্ভার সবার জন্য দু’হাত উজাড় করে দেয় জন্মভূমি। যাতে সবাই বেঁচে থাকে। সুখে শান্তিতে, জীবনযাপন করতে পারে।
জীবন হবে সুন্দর সহজ। হবে মুক্ত। সেটিই কাম্য। কিন্তু সে পথ থেকে আমরা দূরে সরে এসেছি। এসেছে লোভ। লোভ দিয়েছে মানুষের মন বিষিয়ে। দুনিয়াকে করেছে টুকরো টুকরো। পাঁচিল তুলে দিয়েছে চুতুর্দিকে-ঘৃণার পাঁচিল। তাতে দুঃখ আর রক্তপাতের ইতিহাস। গতিময় হয়েছি আমরা কিন্তু গতি দিয়েছে আমাদের নিজস্ব গন্ডির মধ্যে আটক করে। যন্ত্র আবিষ্কার করেছি। যন্ত্রে আসে প্রাচুর্য। আমাদের জন্য এসেছে অভাব। জ্ঞান দিয়েছে আমাদের মনে বিশ্বনিন্দার বীজ। করেছে আমাদের শঠ, নিষ্ঠুর আর নির্দয়। ভাবি আমারা অত্যধিক কিন্তু অনুভূতির ঘরে শূণ্য। যন্ত্র নয়, আমরা চাই মানবতা। শঠতা নয়, আমরা চাই দয়া, চাই নম্রতা। এগুলো নেই অর্থাৎ জীবনও নেই। সব হারিয়ে যাবে। আমরা ক্রমশঃ আরও ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠবো।
দূরকে করেছি আমরা নিকট। বেতার করেছে আমাদের ঘনিষ্ঠ, উড়োজাহাজ দিয়েছে দূরত্বের সীমা দূর করে। এগুলোর সদ্ব্যবহার চাই। মানুষের সততার জন্য এরা আজ আর্তনাদ করে ফেরে। চাই সারা দুনিয়ার সম্প্রীতি। ভাই হতে চাই সবার। এই তো বেতারে শুনছেন আপনারা আমার ভাষণ-সারা দুনিয়ার লাখো মানুষ-দুঃখী মানুষ, দুঃখী বোন আমার দুঃখী ভাইটি তোমরা সবাই আজ এই অবস্থার শিকার। এই নিয়ম। মানুষকে এই নিয়মই অত্যাচার করে। নিরীহ নির্দোষ মানুষকে কারাগারে নিক্ষেপ করে। সকলকে বলি, হতাশার কোনো কারণ নেই। মাথা তুলে দাঁড়ান আপনারা। এই যে দুর্দশা এর মূলে মুষ্টিমেয় মানুষের লোভ। তারা চায় না সভ্যতা এগিয়ে যাক। তারা চায় না দেশের উন্নতি। ঘৃণ্য একদিন পৃথিবী থেকে বিদায় নেবে। স্বেচ্ছাচারীর পতন হবে। জনগণের কাছ থেকে যে ক্ষমতা তারা একদিন কেড়ে নিয়েছে, তা আবার জনগণের কাছেই ফিরে আসবে। জন্ম হবে মানুষের, মুত্যুও হবে। কিন্তু স্বাধীনতার বিনাশ নেই । স্বাধীনতা চিরন্তন সত্য।
সৈন্যদল, দিয়ো না নিজেদের এইসব শয়তানের হাতে তুলে। এরা ঘৃণা করে তোমাদের। তোমাদের দাস মনে করে। তোমাদের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলে। তোমাদের জীবনের গতিপথ স্থির করে দেয়। বলে এইভাবে ভাবো, এইভাবে অনুভব করতে শেখো। এরা তোমাদের কুচকাওয়াজ শেখায়,তোমাদের খাদ্য দেয় নামমাত্র, পশুর মতো তোমাদের সাথে আচরণ করে। এবং ব্যবহার করে তোমাদের কামানের গোলা হিসেবে। এরা অস্বাভাবিক। মনুষ্য পদবাচ্য না। এদের হাতে তুলে দিও না নিজের সত্ত্বা। এরা যন্ত্র। যন্ত্রের মতো এদের মন, যন্ত্রের মতো শুষ্ক নির্দয় হৃদয়। তোমরা তো যন্ত্র নও। তোমরা মানুষ। তোমাদের হৃদয়ে আছে ভালবাসা, তোমারা মহান। ঘৃণা করো না। যারা ভালবাসাহীন, যারা অস্বাভাবিক তারা ঘৃণা করে। তোমরা স্বাভাবিক। তোমরা মানুষ।
সৈন্যদল। দাসত্বের জন্য যুদ্ধ করো না, যুদ্ধ করো স্বাধীনতার জন্য। সেন্ট লিউকের চতুর্দশ অধ্যায়ে আছে-ইশ্বরের রাজ্য মানুষের মধ্যেই বর্তমান। কোনো ব্যক্তি মানুষের জন্য নয়,কোনো দলের জন্যও নয়। সকলের জন্য, সব মানুষের জন্যেই এই সুবিশাল রাজ্যের বিস্তৃতি। তুমিও সেই রাজ্যের একজন অংশীদার। তোমারই হাতে শক্তি, যন্ত্রের জন্ম তুমিই দিয়ে থাকো। এই শক্তির বিনিময়ে তুমি অর্জন করতে পারো সুখ। জীবনকে সুন্দর সার্থক, মুক্ত করার সমস্ত শক্তি তোমার মধ্যেই নিহিত। জীবন হলো এক অপূর্ব সুন্দর অভিযান। এসো গণতন্ত্রের নামে সেই শক্তিকে আমরা ব্যবহার করি। সবাই ঐক্যবদ্ধ হই। নতুন এক দুনিয়া গড়ে তুলি। অপূর্ব অনবদ্য এক জগত। সেখানে কাজের অধিকার থাকবে সকলের। যুবকদের থাকবে সুন্দর ভবিষ্যতের প্রেরণা। বৃদ্ধ মানুষের জন্য থাকবে আগামী জীবনের নিরাপত্তার ইঙ্গিত।
শয়তানও এই শপথ শোনায়। এভাবেই তারা ক্ষমতায় অধিষ্টিত হয়। কিন্তু তার সেই শপথ মিথ্যা। তাতে সত্যের স্থান নেই। তারা কখনওই প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে পারে না। পারবে না কোনোদিন। স্বৈরাচার নিজেকে করে স্বাধীন কিন্তু মানুষকে করে দাস। যুদ্ধ করো তাই। আনতে হবে মুক্তি। জাতীয় সব বাধা দূর হোক। লোভ ধ্বংস হোক। ঘৃণা দূর হোক। অসহনীয়তার স্থান নেই এই পৃথিবীতে। এসো নতুন জগতের সূচনা করি। সেখানে মুক্তিই হবে বিচারের মূলমন্ত্র। সেখানে বিজ্ঞান মানুষকে দেখাবে সুখের মুখ। সুখ আসবে সকলের। সৈন্যদল, এসো গণন্ত্রের নামে আমরা ঐক্যবদ্ধ হই।
হান্না, তুমি কি আমার কথা শুনতে পাচ্ছো? কোথায় তুমি? মুখ তুলে তাকাও। দেখো একবার। মেঘ একটু করে মিলিয়ে যাচ্ছে। চেয়ে দেখো সূর্য উঠছে ঐ। অন্ধকার থেকে আমরা ক্রমশঃ আলোর দিকে এগোচ্ছি। নতুন এক জগত আমাদের সম্মুখে। অপরুপ সুন্দর সেই জগত। এখানে লোভ নেই। লালসার ঊর্ধ্বে প্রতিটি মানুষ। এখানে ঘৃণার স্থান নেই। নিষ্ঠুরতার স্থান নেই। তাকিয়ে দেখো হান্না। আমাদের আত্মা পেয়েছে মুক্তির আহ্বানবাণী, ডানা মেলে উড়ছে সে মুক্ত আকাশে। ঐ যে আকাশ। ঐ যে রামধনু। ঐ আলোক রেখা। মুখ তোলো হান্না। তাকিয়ে দেখো।”