নিজস্ব প্রতিবেদক : স্বাক্ষর জালের মাধ্যমে রাজধানীর কয়েকটি বহুতল ভবনের নকশা অনুমোদন করে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ এসেছিল রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) একটি চক্রের বিরুদ্ধে। অনুসন্ধানে ওই জালিয়াতি চক্রের সঙ্গে রাজউকের একজন অথরাইজড অফিসারের জড়িত থাকার প্রাথমিক প্রমাণ পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
দুদকের অনুসন্ধানে রাজউকের অথরাইজড অফিসার- ২/১ মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে একটি নকশা অনুমোদনের মাধ্যমে প্রায় ৩ কোটি টাকার লেনদেনের প্রমাণ পাওয়া গেছে। শিগগিরই তার বিরুদ্ধে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরির মাধ্যমে মামলার সুপারিশ করে প্রতিবেদন জমা দেয়ার কথা দুদকের উপ পরিচালক ও অনুসন্ধান কর্মকর্তা এস এম রফিকুল ইসলামের।
দুদক সূত্র এসব তথ্য নিশ্চিত করেন।
দুদকে আসা অভিযোগে বলা হয়েছিল, বিভিন্ন ভবনের নকশা অনুমোদনের দায়িত্বে থাকা এ কর্মকর্তা রাজউকের সদস্য (পরিকল্পনা) ও বিল্ডিং কনস্ট্রাকশন (বিসি) কমিটির সভাপতি শেখ আব্দুল মান্নান, সদস্য (উন্নয়ন) ও পরিচালক (উন্নয়ন)সহ কমিটির কয়েকজন সদস্যের সই জাল করেছেন। এরপর পাস দেখিয়ে সংশোধিত নকশা অনুমোদনের কপি মালিকপক্ষকে সরবরাহ করেছেন। এ কাজে প্রায় ১০ কোটি টাকার অবৈধ লেনদেন হয়েছে। এই স্বাক্ষর জালিয়াতির নেতৃত্বে ছিলেন অথরাইজড অফিসার মিজানুর রহমান।
দুদকের অনুসন্ধানে দেখা যায়, এর আগে রাজউক এই বিষয়ে পৃথক একটি তদন্ত করেছিল। সেই তদন্তে অথরাইজড অফিসার মিজানুর রহমানসহ সংশ্লিষ্ট ১৩ জনের স্বাক্ষী গ্রহণ করা হয়েছিল। বাকি ১৩ জনই মিজানের বিরুদ্ধে সেই জালিয়াতির বিষয়ে স্বাক্ষী দেয়। সেই মোতাবেক তৎকালীন সদস্য (স্টেট) শামিম ইকবালের নেতৃত্বে থাকা ওই তদন্ত কমিটি মিজানকে অভিযুক্ত করে তদন্ত রিপোর্ট জমা দিলেও রাজউক এব্যাপারে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। এদিকে দুদকের অনুসন্ধানে মিজানের বিপক্ষে স্বাক্ষ্য প্রমাণও যায়। মিজানুর রহমান রাজউকের পরিচালক (উন্নয়ন) ও সদস্য (উন্নয়ন)সহ কয়েকজন সদস্যের স্বাক্ষর জাল করে নকশা অনুমোদন করান। এর মধ্যে সেখানে একটি নকশা বাবদ প্রায় ৩ কোটি টাকার অবৈধ লেনদেন হয়েছে বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে।
তবে এ ব্যাপারে জানতে চেয়ে যোগাযোগ করা হলে প্রথমেই অভিযোগের বিষয় অস্বীকার করেন রাজউকের অথরাইজড অফিসার মিজানুর রহমান। তিনি বলেন, ‘এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ অসত্য ও উদ্দেশ্যমূলক। আসলে আব্দুল মান্নান (বিসি কমিটির সভাপতি) উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে এসব করেছেন।’
রাজউকের অভ্যন্তরীণ তদন্তে এ জালিয়াতির প্রমাণের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আব্দুল মান্নানের লোকজনই সেই তদন্ত কমিটিতে ছিলো। আর তারাই আমার বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন দিয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘যারা একটু ভালো কাজ করে বলে সুনাম আছে তাদের বিরুদ্ধে এসব লোক লেগে থাকে। আসলে এসব অভিযোগ শুধু আমি ‘মিজানুর রহমান’ নামের কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়, এর মাধ্যমে গোটা রাজউকের ভাবমুর্তিও নষ্ট করা হচ্ছে।’
দুদকে আসা অভিযোগে আরো আছে, রাজউকের মহাখালী জোনাল অফিসের অথরাইজড অফিসার-৪/১ এর আওতাধীন বনানী কামাল আতাতুর্ক এভিনিউ-এর ৩৫ ও ৩৭ নাম্বারের একটি প্লট। ২০১৪ সালের ১৩ অক্টোবর অথরাইজড অফিসার-৪/১ সুকমল চাকমা সদস্য (পরিকল্পনা) ও বিসি কমিটির সভাপতির কাছে চিঠি আকারে একটি অভিযোগ জমা দেন। ওই চিঠির অভিযোগের মাধ্যমে এই ভয়ঙ্কর জালিয়াতির কাহিনী বের হয়। চিঠিতে বলা ছিল, ওই প্লটে ডা. আবু সালেহ, মো. আমিনুল মাওলা গংদের নিযুক্ত আম-মোক্তার ক্যাপ্টেন শামীম আহমেদের (অব.) নামে এ দপ্তরে ২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর চারটি বেজমেন্টসহ ১৯ তলা বাণিজ্যিক ইমরাতের সংশোধিত একটি নকশা জমা দেন। যার নথি নং- ৩সি-১৭৩/১৪।
এ নথিটি অথরাইজড অফিসার-৪/১ এর কার্যালয়ে জমা দেয়ার জন্য ২/১ এর অথরাইজড অফিসার মো. মিজানুর রহমান সংস্থার নকশা গ্রহণকারী কর্মচারীর (মো. রফিকুল ইসলাম) কাছে জমা দিতে আসেন। কিন্তু নথিতে পরিবেশ অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন সেবা সংস্থার আটটি ছাড়পত্র সঠিক না থাকায় তা নিতে আপত্তি জানান রফিকুল ইসলাম। তবে মিজানুর রহমান নথিটি জমা নেয়ার জন্য রীতিমতো চাপ প্রয়োগ করে নথি গ্রহণে বাধ্য করেন। পরে ইমারত পরিদর্শক মো. আওলাদ হোসেনের কাছে নিয়ে যান তিনি। ইমারত পরিদর্শক নথিটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জানান, প্রস্তাবিত নকশাটি চারটি বেজমেন্টসহ ১৯ তলা হলেও পরিবেশ অধিদপ্তরসহ অন্যান্য সেবাসংস্থাগুলোর ছাড়পত্র ১৫ তলার। তাই তিনি রিপোর্ট দিতে পারবেন না। ওই সময় তিনি (আওলাদ) মূল নথিসহ নকশাগুলো নিয়ে সদস্য (পরিকল্পনা) ও বিসি কমিটির সভাপতির সঙ্গে আলোচনা করার বিষয়ে মিজানুর রহমানকে জানান।
মিজানুর রহমান নিজেকে আর্কিটেক্ট পরিচয় দিয়ে সব কিছু ঠিক আছে এই মর্মে নথিটি কমিটিতে উপস্থাপন করতে বলেন। এরপর ২০১৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর নথিটি বিসি কমিটিতে উপস্থাপন করেন পরিদর্শক আওলাদ। পরে তিনি বিসি কমিটির চেয়ারম্যানসহ অন্য সদস্যদের স্বাক্ষর নেয়ার জন্য মূল নথিটি নিয়ে যান। তবে বিসি কমিটির চেয়ারম্যানসহ অনেকেই নথিতে সই না করলেও পরবর্তীতে সেখানে তাদের জাল স্বাক্ষর করেন মিজানুর রহমান। একই বছরের ৩০ সেপ্টেম্বরে নথির নির্মাণ অনুমোদনপত্র তৈরি করা হয়। ওই বছর ১ অক্টোবর কমিটির সবার সই দেখে স্বাক্ষর করেন পরিদর্শক আওলাদ। এরপর মো. সাইফুল ইসলাম নামের এক কর্মচারীকে ডেকে এনে নকশা ইস্যু করান মিজানুর রহমান।

