বিনোদন প্রতিবেদক : ‘শোভনের স্বাধীনতা’ চলচ্চিত্রে নাম ভূমিকায় দেখা মিলবে এক কিশোর মুক্তিযোদ্ধার, যার নাম রুদ্র রাইয়ান। দেখতে আর দশটা সাধারণ কিশোরের মতো হলেও, ছবির গল্পে পরিচালক তাকে উপস্থাপন করেছেন বিক্ষুব্ধ সময়ে দ্রোহের আগুনে পুড়ে অঙ্গার হওয়া এক কিশোর হিসেবে।
সেই কিশোরের সঙ্গে দেখা- রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে, যেখানে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আত্মসর্ম্পন করেছিল। সেখানে বসেই ছবি তোলার ফাঁকে চলছিল কথা। ‘এতটুকু বয়সে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ক্যামেরার সামনে দাড়াঁতে হবে, তা কখনও ভাবিনি। ছোট থেকেই নাটক সিনেমার প্রতি দূর্বলতা থাকলেও, সাংস্কৃতিক অঙ্গনে খুব একটা যোগাযোগ ছিলো না’-বললেন রাইয়ান।
ছোট থেকেই মেধাবী ছাত্র হিসেবে পরিচিত ছিলেন। এ কারণেই এসএসসি পাশের পর ঢাকার নটরডেম কলেজে ভর্তি হন রাইয়ান। তারপর বন্ধুদের উৎসাহেই কলেজের থিয়েটার দলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে কয়েকবার মঞ্চে ওঠা। অভিনয়ের সঙ্গে রাইয়ানের সর্ম্পক এতটুকুই। তারপরের গল্প জানালেন ‘শোভনের স্বাধীনতা’ ছবির পরিচালক মানিক মানবিক। তিনি বলেন, ‘আমার ছবিতে গল্পের প্রযোজনে বেশ কিছু কিশোরের দরকার পড়ে। এতে অংশ নেয়ার জন্য নটরডেম কলেজ থেকে প্রায় দুইশত শিক্ষার্থী আগ্রহ প্রকাশ করে। সেখান থেকেই রাইয়ানকে আবিষ্কার করি।’
এ প্রসঙ্গে রাইয়ান বলে, ‘প্রথমে আমাকে জানানো হয় একটি মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক চলচ্চিত্রের জন্য বেশ কিছু কিশোর অভিনেতা প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে আমরা প্রায় দুইশ জন পরিচালকের সামনে হাজির হই। সেখানে থেকে প্রথম দফায় ৪০জনকে বাছাই করে টানা কয়েকমাস গ্রুমিং পর্ব চলে। তারপর ২০ জন এবং সর্বশেষ ১৩ জনকে ছবিতে অভিনয় করার জন্য নির্বাচন করা হয়। কিন্তু সেখানে থেকে আমাকেই যে নাম ভূমিকায় অভিনয় করতে হবে তা প্রথমে বুঝতে পারিনি।’
শোভন প্রসঙ্গে ফোনে কথা হল মানিক মানবিকের সঙ্গে। তিনি বললেন, ‘গ্রুমিংয়ে প্রত্যেকটি ছেলের উপর পর্যবেক্ষণ করা হত। সবশেষ ১৩ জন থেকে রাইয়ানকে পেলাম, যার মধ্যে সত্যিই অভিনয়ের প্রতি আসক্তি রয়েছে। আমার ছবির মূল চরিত্র শোভনের দায়িত্বটা তাকেই দিলাম। ছেলেটির অভিনয়ে প্রাতিষ্ঠানিক অভিজ্ঞতা না থাকলেও অভিনয়ের প্রতি তার একাগ্রতা আমাকে মুগ্ধ করেছে।’
‘শোভনের স্বাধীনতা’ ছবি গল্পের শুরুটা ২৫ মার্চের কালরাত্রি থেকেই। সেদিন পাকিস্তানি সেনারা হত্যাযজ্ঞে মেতে উঠে। মৃতের নগরীতে পরিণত হয় ঢাকা। রাত শেষ হওয়ার আগেই প্রাণ নিয়ে যে যেদিকে পারছে পালিয়ে যাচ্ছে। কয়েকদিনের মধ্যেই শোভনের বড় ভাই সুমন মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিতে ভারত পাড়ি জমায়। নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে থাকা শোভনের মা-বাবা তাকে গ্রামে মেজ মামার বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়।
গল্পের এ অংশের চিত্রধারণের মধ্য দিয়েই শুরু হয় ‘শোভনের স্বাধীনতা’ ছবির শুটিং। তাই প্রথমবার ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানোর অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে রাইয়ান বলেন, ‘ছবির প্রথম শর্টটি ছিলো আমার মামার বাড়ির অংশ। সেখানে আমার সঙ্গে ছিলেন ফেরদৌস ভাই। জীবনে প্রথম চলচ্চিত্রের ক্যামেরার সামনে অভিনয়, তাও আবার ফেরদৌস ভাইয়ের মতো একজনের সঙ্গে। তাই কিছুটা সংকোচ বোধ করছিলাম, যদি ঠিকঠাক অভিনয়টা করতে না পরি? কিন্তু ভেতরে ভেতের নিজেকে বুঝাতে চেষ্টা করি, আমি পারব।’
হ্যাঁ, রাইয়ান পেরেছিলেন। প্রথম শর্টটি মাত্র দুইবারে টেক করতে হয়েছিলো পরিচালককে। সঙ্গে সঙ্গে সেটের সবাই মিলে হাতে তালি দিয়ে রাইয়ানকে শুভেচ্ছা জানায়। ‘হাততালির শব্দে রাইয়ান বুঝতে পারি সবঠিক আছে’ বললেন রাইয়ান। তারপর থেকে সব সংকোচ আর ভয় জয় করে ছুঁটে চলে এই কিশোর।
এদিকে ছবির গল্পে মামার বাড়িতে শোভন পৌঁছানোর পর আবিষ্কার করে তার মামা একজন স্বাধীনতা বিরোধী। পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে হাত মিলিয়ে গ্রামের নিরীহ মুক্তিকামী মানুষের ওপর অকথ্য নির্যাতন চালাচ্ছে সে। বিদ্রোহ করে শোভনের মন। মামার সঙ্গে ঝগড়া করে গ্রামও ছেড়ে আবারো শহরে। কিন্তু এখানে এসেও স্বস্তি পায় না শোভন। কারণ তাকে নিয়ে মা-বাবার উৎকণ্ঠা। সে ধীরে ধীরে একা হয়ে পড়ে।
এদিকে আর কদিন পরেই শোভনের মেট্রিক পরীক্ষা শুরু হবে। তার সহপাঠী জহির, জুয়েল, বুলবুলরাও বুঝে উঠতে পারে না পাকিস্তান সরকারের কোন পরীক্ষায় অংশ নেয়া ঠিক হবে কিনা। অন্যদিকে এই সময়ে দেশের জন্য কিছু করতে না পারার অসহায়ত্বও শোভনকে ভাবিয়ে তোলে। তাছাড়া শোভনের আরেক সহপাঠী বাদল তো কট্টর পাকিস্তানপন্থী। তার সঙ্গে ইতিমধ্যেই মতবিরোধ দেখা দেয় শোভনের। বাধ্য হয়ে সবকিছু সহ্য করে শোভন। কিন্তু একটা সময় শোভন শামিল হতে চায় এ যুদ্ধে। তবে বাধা হয়ে দাঁড়ায় বয়স। সুযোগ খুঁজতে থাকে সে। এভাবেই চূড়ান্ত একটি পরিণতির দিকে এগোতে থাকে চলচ্চিত্রটি।
মুক্তিযুদ্ধ মানেই অস্ত্র হাতে শত্রুর সঙ্গে সম্মুখ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়া। শত্রুর হাতে ধরা পড়ার পর তাদের বুটের তলায় পিষ্ট হওয়ার পরও সহযোদ্ধাদের সর্ম্পকে কোন তথ্য প্রকাশ না করা। শোভন অর্থ্যাৎ রাইয়ানের ক্ষেত্রেও এমনটি হয়েছিলো? ‘হ্যাঁ, ছবির গল্পে আমাকে টেনে হিঁচছে জিপে তুলে পাকিস্তানি সেনারা। এসময় হঠাৎই আমার পায়ের উপর একজনের বুটজুতা উঠে যায়। বেশ ব্যথা পেয়েছিলাম সেদিন। তারপর কয়েকদিন এটা আমাকে ভুগিয়েছে’ বললেন রাইয়ান।
‘শোভনের স্বাধীনতা’ ছবির শুটিং শুরু হয়েছিলো ২০১৩ সালে। আর তা মুক্তি পাচ্ছে ২০১৫ সালে। এ দু’বছরে রাইয়ানের মধ্যেও এসেছে বেশ পরিবর্তন। কলেজের গন্ডি পেরিয়ে সে এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে। আগের সেই কিশোর ভাবটা একটু একটু করে কমে যাচ্ছে। তাছাড়া প্রথম ছবিটি শেষ করার পর থেকে রাইয়ানের কদর বেড়ে গিয়েছে। ইতিমধ্যেই বেশ কিছু নাটক, বিজ্ঞাপন এমন কী মূলধারার চলচ্চিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাবও পেয়েছেন। এ প্রসঙ্গে রাইয়ান বলেন, ‘গত দু’বছরে আমার চারপাশটা পাল্টে গিয়েছে। অনেকেই আমাকে নিয়ে কাজ করতে চায়। বিজ্ঞাপন, নাটক এমন কী চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য বেশ কিছু প্রস্তাব পেলেও, সেগুলো ফিরিয়ে দিয়েছি। আগে আমার প্রথম ছবিটা মুক্তি পাক, তারপর সবকিছু নিয়ে ভাববো বলে।’
অভিনয়ের প্রতি রাইয়ানের দূর্বলতাটা সেই ছোটবেলা থেকে। তাই আগামীতেও অভিনয়টা করে যাওয়ার ইচ্ছা রয়েছে তার। এ প্রসঙ্গে রাইয়ান বলেন, ‘পড়াশোনার পাশাপাশি অভিনয়টাও করব। তবে এক্ষেত্রে মুক্তিযুদ্ধের গল্প হলে, সেটা চোখ বন্ধ করে করতে চাই। কারণ ‘শোভনের স্বাধীনতা’ ছবিতে অভিনয় করতে গিয়ে বার বার মনে হয়েছে, আমি মুক্তিযুদ্ধ দেখিনি কিন্তু অংশ হতে পেরেছি। আর সেটা সম্ভব হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের ছবির মাধ্যমে।’
উল্লেখ্য, রশীদ হায়দারের উপন্যাস থেকে ‘শোভনের স্বাধীনতা’ ছবির সংলাপ, চিত্রনাট্য লিখেছেন মানিক মানবিক। পরিচালনাও করেছেন তিনি। ছবিতে রুদ্র রাইয়ান ছাড়াও অভিনয় করেছেন ফেরদৌস, নিপুন, আতাউর রহমান, খায়রুল আলম সবুজ, চিত্রলেখা গুহ, ওয়াহিদা মল্লিক জলি, স্বাধীন খসরু, চৈতি, মাহমুদুল ইসলাম মিঠু, স্বদেশ সুমন প্রমুখ।

