খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি : দেড়যুগেও পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন না হওয়ায় চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত পাহাড়িরা। দীর্ঘ তিনদশক ধরে পাহাড়ে আত্মনিয়ন্ত্রণাধীকার (গেরিলা যুদ্ধ) আন্দোলনের পর ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি (মতfন্তরে শান্তি চুক্তি) স্বাক্ষরিত হয়। কিন্তু ১৮ বছরেও চুক্তির বহু ধারা আজও রয়ে গেছে অবাস্তবায়িত। এতে করে দিন দিন বেড়ে চলছে অবিশ্বাস ও দূরত্ব। ফলে এখনও কাঙ্ক্ষিত শান্তির দেখা মেলেনি পাহাড়ে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের মূল সমস্যার সৃষ্টি পাকিস্তান আমল থেকে (১৯৬০ সাল)। জল বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের নামে পাহাড়ি বাঙালিদের উদ্বাস্তু করা হয়। সেই থেকে তাদের মনে বাসা বাঁধতে থাকে তীব্র ক্ষোভ। পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধের পর থেকে সরকার কর্তৃক রাজনৈতিকভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামে ব্যাপক পুনর্বাসন করা হয়। যার বিরোধিতা থেকে আস্তে আস্তে জন্ম নেয় সশস্ত্র সংগ্রাম বা গেরিলা যুদ্ধ। তৎকালীন কথিত শান্তিবাহিনী কর্তৃক দীর্ঘ ত্রিশ বছর পার্বত্য চট্টগ্রামে সশস্ত্র সংঘাত চলতে থাকে। এতে শান্তি বাহিনী ও নিরাপত্তাবাহিনীর সদস্যসহ অসংখ্য বেসামরিক নাগরিক প্রাণ হারায়। পার্বত্য চট্টগ্রামের ওই সংঘাত বন্ধে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা (১৯৯৬ সালে ক্ষমতা থাকার সময়) শান্তি বাহিনীদের আলোচনায় বসার প্রস্তাব দেন।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে তৎকালীন হুইপ আবুল হাসনাত আব্দুল্লাহ ও শান্তি বাহিনীর পক্ষে বর্তমান পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা ওরফে সন্তু লারমার মধ্যে বেশ কয়েকবার বৈঠক হয়। বৈঠকের ফলশ্রুতিতে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর ঐতিহাসিক পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় এবং পরের বছরের জানুয়ারি মাসে খাগড়াছড়ি স্টেডিয়ামে অস্ত্র সমার্পনের মধ্য দিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে শান্তি বাহিনীর সহস্রাধিক নেতাকর্মী। কিন্তু পাহাড়ে এখনও প্রতিষ্ঠিত হয়নি শান্তি চুক্তির পক্ষে ও বিপক্ষে অবস্থান নেয়া দলগুলোর।
সাধারণ পাহাড়িদের অভিমত পার্বত্য চট্টগ্রামের চলমান সমস্যা নিরসনে চুক্তির বাস্তবায়ন যেমন জরুরি তেমন জরুরি ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত বন্ধসহ জাতিগত ভাবে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার।
চুক্তি স্বাক্ষরের ১৮ বছরে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির সিংহভাগ বাস্তবায়ন হয়েছে বলে সরকারের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি-এমএন লারমা গ্রুপের সভাপতি সুধাসিন্ধু খীসা বলেন,‘সরকার মিথ্যাচার চালাচ্ছে আর মিডিয়া সেটা প্রচার করছে। আদৌ এর বাস্তবায়ন করবেন কিনা তা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে।’
পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি সমস্যার সমাধান ছাড়া কখনো পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রকৃত শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয় মন্তব্য করে তিনি আরও বলেন, ‘ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি করা না হলে অদূর ভবিষ্যতে পার্বত্য চট্টগ্রামের চলমান সমস্যা আরও বেশি কঠিন হবে। তাই তিনি প্রপাগান্ডা না চালিয়ে সরকারকে পার্বত্য চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে আন্তরিক হতে অনুরোধ জানান।
অন্যদিকে, পার্বত্য চুক্তিবিরোধী সংগঠন ইউপিডিএফ’র সভাপতি প্রসিত বিকাশ খীসা জানান, বিগত ১৮ বছরে প্রমাণিত হয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার তথা শাসকচক্র রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের লক্ষ্যে চুক্তি করেছিল। শান্তি প্রতিষ্ঠা বা রাজনৈতিক সমাধান লক্ষ্য ছিল না। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি বিভিন্ন সময় সভা-সমাবেশে সরকারের চেলাচামুণ্ডাদের প্রদত্ত অঙ্গীকার লোক ঠকানোর ফন্দি ছাড়া আর কিছু নয়। স্পষ্টতই চুক্তিটি সরকারের অনুকূলে, তা সত্ত্বেও প্রতিশ্রুতি মোতাবেক সরকার চুক্তি বাস্তবায়ন করেনি, নানা উছিলায় কালক্ষেপণ করে চলেছে।
প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ‘চুক্তি’ বাস্তবায়ন না করলেও সরকার তার অন্য পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বসে নেই মন্তব্য করে তিনি আরও জানান, পরিকল্পিতভাবে সরকার তার অন্য এজেন্ডা বাস্তবায়নে নিয়োজিত। বিতর্কিত পঞ্চদশ সংশোধনী আইন পাস করিয়ে ভিন্ন ভাষা-ভাষী জাতিগুলোর ওপর সাংবিধানিকভাবে বাঙালি জাতীয়তা চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক গণবিরোধী ১১দফা নির্দেশনা জারির মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামে অঘোষিত সেনা শাসনকে বৈধতা দেয়া হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে আন্তরিক জানিয়ে খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান কংজরী চৌধুরী বলেন, ‘ধাপে ধাপে চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন করা হবে। চুক্তির শর্তমতে ৭২টি ধারার মধ্যে ৪৮টি ধারা বাস্তবায়ন করা হয়েছে। বাকিগুলোর কিছু আংশিক বাস্তবায়ন হয়েছে এবং কিছু প্রক্রিয়াধীন। চুক্তির অংশ হিসেবে রয়েছে তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ। পার্বত্য জেলা পরিষদে ন্যস্ত বিভাগগুলোর অধিকাংশ হস্তান্তর করা হয়েছে। খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের ৩৩টি বিভাগের মধ্যে ৩০টি বিভাগ হস্তান্তর করা হয়েছে। বাকি ৩টি বিভাগ হস্তান্তরের জন্য দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
উল্লেখ্য, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির দেড় যুগ বর্ষপূর্তি পালনে সরকারের পক্ষ থেকে নেয়া হয়েছে নানান উদ্যোগ। ২ ডিসেম্বর (বুধবার) সকালে সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণে খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ থেকে বর্ষপূর্তি উপলক্ষে বণার্ঢ্য শোভাযাত্রা বের করা হয়েছে। বিকেলে হবে খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

