সিলেট প্রতিনিধি : অবশেষে সিলেটের শিশু সামিউল আলম রাজনকে সৌদি আরব থেকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। আটকের ৬৪ দিন পর তাকে বৃহস্পতিবার বেলা ২টা ৫৭ মিনিটে বাংলাদেশ বিমানের বিজি ০৪০ বিমানে কামরুলকে নিয়ে ঢাকা পৌঁছান তিন পুলিশ কর্মকর্তা।
পরে সেখান থেকে রাত ১০টা ১ মিনিটে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ কার্যালয়ে নিয়ে আসা হয়। এখন শুধু অপেক্ষা আদালতে হাজিরের। তবে সিলেট পৌঁছার পর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আদালতের তুলে দেয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
গত ৮ জুলাই এই সিলেটেই শিশু সামিউল আলম রাজনকে ভ্যান চুরির অপবাদ দিয়ে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে নির্মম নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করা হয়। এর পর পালিয়ে সৌদি আরব চলে যান ওই হত্যাকাণ্ডের প্রধান আসামি কামরুল ইসলাম। কিন্তু সেখানে গিয়েও শেষ রক্ষা হয়নি তার। ১৩ জুলাই রাতে প্রাবাসীরা আটক করে সেই দেশের পুলিশের কাছে তুলে দেয় কামরুলকে।
এরপর কামরুলকে দেশে ফিরিয়ে আনা নিয়ে নানা জটিলতার দেখা দেয়। তবে পুলিশ সময়ই বলে আসছিল যে কোনোভাবে হোক তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা হবে। অবশেষে বৃহস্পতিবার রাত ১০টা ১ মিনিটে ঘাতক কামরুলকে সিলেটে আনা হয়।
সিলেট মেট্রোপলিটন কার্যালয়ে নিয়ে আসার পর পুলিশ কমিশনার কামরুল আহসান উপস্থিত সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। এ তিনি বলেছেন তাকে কিভাবে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে।
কামরুল আহসান বলেন, ‘এ ঘটনা সংগঠিত হওয়ার পরে আমরা দ্রুততার সঙ্গে আসামিগুলোকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হই। আমরা ১০ জন আসামিকে গ্রেপ্তার করি। আমরা খবর পেয়েছিলাম যে হত্যাকাণ্ডের প্রধান আসামি তিনি সৌদি আরবে পালিয়ে গিয়েছেন এবং সেখানে গিয়ে আটক হন। এই খবর পাওয়ার পর তাকে ফেরত আনার জন্য ইন্টারপোলের মাধ্যমে যোগাযোগ শুরু করি। আমাদের এই প্রচেষ্টার সঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয় এবং পরাষ্ট্রমন্ত্রাণালয় সার্বিক সহযোগিতা করেছে। আমাদের এই দীর্ঘ প্রচেষ্টার ফসল আজকে সেই আসামিকে ফেরত আনা হয়েছে।’
মামলাটির বিচার কাজ চলছে জানিয়ে কামরুল আহসান বলেন, ‘আমরা অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে এই মামলার তদন্ত শেষ করে চার্জশিট দিয়েছি এবং বিজ্ঞ আদালত দ্রুততার সঙ্গেই বিচার কাজ শুরু করে। আসামি যেহেতু পালাত ছিল, আসামি যেহেতু পেয়ে গেছি সেহেতু আসামি তামিল হবে।’
এক প্রশ্নের জাবাবে তিনি বলেন, ‘এখন থেকে ( বৃহস্পতিবার রাত ১০টা) আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে যেকোন সময়ে আদালতে হাজির করা হবে কামরুলকে।’
প্রসঙ্গত, গত ১৬ আগস্ট রাজন হত্যায় ১৩ জনকে অভিযুক্ত করে পুলিশ যে অভিযোগপত্র আদালতে দাখিল করেছে তাকে কামরুলকে পলাতক দেখানো হয়। অবশ্য কামরুল তখন সৌদি পুলিশের জিম্মায় ছিল। আদালতে হাজির করে এই মামলায় পুলিশ এখন কামরুলকে গ্রেপ্তার দেখাবে।
তবে কামরুলের ভাই শামীম আহমদ এবং হত্যাকাণ্ডের আরেক হোতা পাভেল এখনো পলাতক রয়েছেন।
প্রসঙ্গত, কামরুলকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করতে গত ১২ অক্টোবর সৌদি আরব গিয়েছিলেন পুলিশের তিন কর্মকর্তা-পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মাহবুবুল করিম, সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশানর রহমত উল্লাহ ও বিমানবন্দর থানার সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার আ ফ ম নিজাম উদ্দিন।
কামরুলকে নিয়ে দুপুরে ঢাকা পৌঁছানোর পর পুলিশ সদর দপ্তরে এক সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) নজরুল ইসলাম বলেন, ‘যেখানে বন্দিবিনিময় চুক্তি ছিল না সেই আইনগত সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে আমরা ইন্টারপোলের মাধ্যমে রাজন হত্যার প্রধান আসামি কামরুলকে দেশে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছি। সৌদির সঙ্গে আমাদের বন্দিবিনিময় চুক্তি নেই, বন্দি আসামিদের যে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় ফিরিয়ে আনা হয়, সেই পথটি আমাদের সামনে খোলা ছিল না। কিন্তু ইন্টারপোলের সহযোগিতার সুযোগটি কাজে লাগিয়ে আমরা তাকে দেশে ফিরিয়ে নিয়ে এসেছি। ইন্টারপোলের সব বিষয়ে আমরা কথা বলতে পারি না। কিছু বাধ্যবাধকতা আছে। তবে ইন্টারপোল এ ব্যাপারে আমাদের সর্বোচ্চ সহযোগিতা করেছে।’
তিনি আরো জানান, সৌদিকে তাকে (কামরুল) ধরার পর একটি কনস্যুলেটে রাখা হয়েছিল। পরে কনস্যুলেট থেকে তাকে জেদ্দার একটি থানায় ও পরে ১২ জুলাই রিয়াদের হাজতে রাখা হয়েছিল। সেখান থেকে তাকে বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয়েছে।
প্রসঙ্গত, গত ৮ জুলাই সিলেট নগরীর কুমারগাঁওয়ে শিশু সামিউল আলম রাজনকে ভ্যান চুরির অভিযোগে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে নির্মমভাবে নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করা হয়। রাজনকে পিটিয়ে হত্যার পর সৌদি আরব পালিয়ে গিয়ে গত ১৩ জুলাই আটক হন কামরুল।
কামরুল ছাড়াও রাজন হত্যা মামলার বাকি আসামিরা হলেন-মুহিদ আলম, আলী হায়দার, শামীম আহমদ, পাভেল আহমদ, ময়না চৌকিদার, রুহুল আমিন, তাজউদ্দিন আহমদ বাদল, দুলাল আহমদ, নুর মিয়া, ফিরোজ মিয়া, আছমত উল্লাহ ও আয়াজ আলী।
রাজনকে পেটানোর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ও গণমাধ্যমগুলো বিষয়টি নিয়ে সরব হলে দেশব্যাপী তোলপাড় শুরু হয়।
এদিকে, ইতোমধ্যে বহুল আলোচিত এই হত্যা মামলার বিচারকাজও শুরু হয়েছে। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত এ মামলায় ৩৫ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন।

