নিজস্ব প্রতিবেদক : বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) সাবেক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মুহম্মদ খিজির খাঁনের বাড়িতে প্রায় এক ঘণ্টা অবস্থান করে তাকে গলা কেটে হত্যার পর নির্বিঘ্নে পালিয়ে যায় হত্যাকারীরা। দীর্ঘ সময় বাড়িতে অবস্থানকালে তারা বাসার ভেতরে জিনিসপত্র ফেলে ও ঘরের দরজাতেও শব্দ করে। এ সময়ে খিজির খানের বাসার দরজা খোলা রেখে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখেন তারা।
খানকাহ শরীফের ভেতরের দরজার পর্দা কেটে খিজির খান ও তার গৃহকর্মীদের বেঁধে ফেলে ঘাতকের দল। একটি নতুন গামছাও ব্যবহার করে তারা। বাড়ির সবার একইভাবে এক টুকরো কাপড় পেঁচিয়ে মুখে ঢুকিয়ে ওই কাপড়ের বাকি অংশ দিয়ে বিশেষ কৌশলে মুখ বাঁধে খুনিরা। হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত নতুন চাপাতিটির রক্ত ধুয়ে সেটি ফেলে যায় তারা। ঘটনাস্থলে তারা জট বাঁধা কিছু কাটা চুল ফেলে যায়, যা খিজির খানের নয়। তৃতীয় তলায় খিজির খানের বাসায় জিনিসপত্র তছনছ করলেও সেখান থেকে কোনো জিনিসপত্র নেয়নি খুনিরা। সরেজমিনে ঘুরে এবং তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যস্ত এলাকার ওই বাড়িতে এক ঘণ্টারও বেশি সময় থেকে হত্যাকাণ্ড ঘটানো এবং বিনা বাঁধায় চলে যাওয়ার ঘটনাটি রহস্যজনক। এই হত্যাকাণ্ড কয়েকটি ঘটনার সঙ্গে মিললেও এখানে কিছু ভিন্ন আলামত পাওয়া গেছে। খুনিরা হত্যার মোটিভ গোপন করার জন্য কিছু আলামত তৈরি করেছে। তাই উগ্রবাদী গোষ্ঠীর পাশাপাশি বিভিন্ন বিষয় খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। তবে বুধবার পর্যন্ত উগ্রবাদীদের ওপর চোখ রেখেছেন গোয়েন্দারা।
মঙ্গলবার রাতে নিহতের ছোট ছেলে আশরাফুল ইসলাম বাদি হয়ে বাড্ডা থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন, যেখানে অজ্ঞাত ছয়-সাতজনকে আসামি করা হয়। মামলার এজাহারে আশরাফুল বলেন, ‘তার বাবা ৪০ বছর ধরে নকশেবন্দিয়া মোজাদ্দেদীয় তরিকতের ‘রহমতিয়া খানকা শরীফের’ ইমাম ছিলেন। তাদের বাসায় অনেক মানুষ আসা-যাওয়া করতেন। সোমবার সন্ধ্যা পৌনে ৭টার দিকে দুই অপরিচিত ব্যক্তি বাড়ির তৃতীয় তলায় তাদের বাসায় গিয়ে কলিংবেল চাপে। এ সময় তার বাবা অতিথিদের দ্বিতীয় তলায় খানকাহ শরীফে গিয়ে বসতে বলেন। পরে খিজির খান ভেতরের সিঁড়ি দিয়ে দ্বিতীয় তলায় নামেন।’
আশরাফুল ইসলাম এজাহারে লিখেছেন, ‘কিছু সময় পর তিনি বাসা থেকে বের হয়ে যাওয়ার সময় আরও চারজনকে সিঁড়ি দিয়ে উপড়ে উঠতে দেখেন। রাত ৮টা ২০ মিনিটের সময় আশরাফুলের মা তাকে মোবাইল ফোনে জানান, তার বাবা আর নেই। খবর পেয়ে তিনি দ্রুত বাসায় ফিরেন। এসময় তিনি খানকাহ শরীফের ওজুখানায় খিজির খানের গলা কাটা রক্তাক্ত লাশ দেখেন। বাসার গৃহকর্মী জামিলা তাকে জানায়, অজ্ঞাত ছয়-সাতজন যুবক বয়সের ব্যক্তি খানকাহ শরীফের ওজুখানায় গৃহকর্মী জামিলা, আমেনার নাতনি এবং তৃতীয় তলায় গাড়িচালক মোস্তফা, খিজির খানের স্ত্রী, ছেলে বউ, মেয়ে রওশন আরা, নাতি মাহি ও নাতনি সাফিয়াকে হাত-পা ও মুখ বেঁধে রাখে।এ সময় ওজুখানার মেঝেতে শুইয়ে জবাই করে। পরে খুনিরা তৃতীয় তলায় গিয়ে বাসার আসবাবপত্র তছনছ করলেও কোনো জিনিসপত্র ও টাকা নেয়নি।’
বাদির ভাষ্যমতে, সোমবার সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ৮টার মধ্যে যে কোনো সময় তার বাবাকে হত্যা করা হয়েছে। তবে কে বা কারা- খিজির খানকে খুন করতে পারে এমন কোনো সন্দেহ প্রকাশ করেনি ছেলে আশরাফুল ইসলাম।
বুধবার সকালে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা, বাড্ডা থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আমিনুল ইসলাম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। এসময় খিজির খানের বাড়ির দ্বিতীয় তলার খানকাহ শরীফে গিয়ে দেখা গেছে, সেখানে ভেতরের চিত্র স্বাভাবিক। দরজা খোলা। দুই পাশে দুইটি ছোট কক্ষ। একটি বসার ঘর, অন্যটি ওজুখানা। আছে কয়েকটি বইয়ের আলমিরা। ওজুখানার ঢোকার দরজা এবং বসার ঘরের দরজার পর্দা দু’টি কাটা। এই পর্দা কেটে টুকরো করে খিজির খান ও তার বাসার লোকজনকে বাধা হয়েছে।
জানতে চাইলে এস আই আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা লাশের পাশে একটি নতুন চাপাতি পেয়েছি। এটি প্রায় সাত ইঞ্চি লম্বা এবং তিন ইঞ্চি চওড়া। চাপাতিটির হাতল এ্যালুমেনিয়ামের। খুনিরা সেটির রক্ত ধুয়ে ফেলে গেছে।’
আমিনুল জানান, লাশের পাশে একটি নতুন গামছা এবং কয়েক টুকরো কাপড় উদ্ধার করা হয়েছে। পাশে পড়েছিল এক গুচ্ছ জটবাধা কাটা চুল। এই চুল খিজির খানের নয় নয় বলে স্বজনরা নিশ্চিত করেছেন।
তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, ‘হত্যাকারীরা বাসায় এক ঘন্টা ছিল, এটা রহস্যজনক। তারা দরজা বাড়ি দিয়ে এবং জিনিসপত্র ফেলে শব্দ করেছে। ফ্যান চালু করে রেখেছে। এসব করে বাসার লোকজন আছে এবং কাজ চলছে বলে বোঝাতে চেয়েছে হয়তো। তবে বাড়ির বাসিন্দা এবং আশপাশের লোকজনের কাছে ঘটনাটি ধরা না পড়া ছিল অস্বাভাবিক।’
খিজির খানের বাড়ির নিচের দোকান ঝুমা গিফট কর্ণারের মালিক আব্দুর রহিম বলেন, ‘আমি তখন দোকানেই ছিলাম। হঠাৎ জানালা খুলে ড্রাইভার মোস্তফা চিৎকার করে ওঠে। এরপর আমরা যাই। বাড়ির দরজা সব সময় খোলা থাকে। ওনাকে সবাই সম্মান করে। তাকে মেরে কেউ যাচ্ছে টের পেলে লোকজন আটকাতো।’
প্রতিবেশী রিপনও জানান একই রকম তথ্য। তিনি বলেন, ‘ব্যস্ত এলাকার কারণেই কেউ হয়ত শব্দ শুনে বিষয়টি খেয়াল করেনি। এলাকায় ওনার কোনো ‘শত্রু’ নেই।’
থানা পুলিশের পাশাপাশি গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) এই খুনের মামলাটির তদন্ত করছে। ডিবির অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি) মাহফুজুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা ছায়া তদন্ত করছি। এখানে উগ্রবাদী গোষ্ঠী ও ব্যক্তি জীবনসহ সব বিষয়ই গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তবে এখনো কোনো অগ্রগতি হয়নি।’
জানতে চাইলে বাড্ডা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এমএম জলিল বলেন, ‘আলামতসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত কাউকে শনাক্ত বা আটক করা যায়নি।’
গত সোমবার রাতে মধ্যবাড্ডার গুদারাঘাটে পাশে ছয়তলা মসজিদ রোডের জ-১০/১ নিজ বাসায় খুন হন পিডিবির সাবেক চেয়ারম্যান খিজির খান। তিনি ছয় তলা বাড়ির দ্বিতীয় তলায় রাহমানিয়া খানকা শরীফ গড়ে তোলে সেখানে জিকির করতেন। তার বেশ কিছু অনুসারীও রয়েছে। প্রতি বৃহস্পতিবার সেখানে মাহফিল হতো। বুধবার কুষ্টিয়ার দৌলপুরের ফিলিপনগরে গ্রামের বাড়িতে খিজির খানকে দাফন করা হয়।

