নিজস্ব প্রতিবেদক : পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল পরিবহনের পরিকল্পনা করছে সরকার। খরচ, সময়, অপচয়, ঝুঁকি ও পরিবেশ দূষণ কমাতে এ উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে জ্বালানি বিভাগ। তবে তেল পরিবহনের সঙ্গে জড়িত নৌযান শ্রমিকেরা এর বিরোধিতা করছেন। তারা বলছেন, পাইপে তেল পরিবহন বরং ব্যয় বাড়াবে। তেল সরবরাহে বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করবে।
জ্বালানি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গভীর সমুদ্রে অবস্থানরত বড় জাহাজ (মাদার ভেসেল) থেকে ইস্টার্ন রিফাইনারিতে সরাসরি জ্বালানি তেল সরবরাহে পাইপলাইন নির্মাণের পরিকল্পনা চলছে। চট্টগ্রাম থেকে নারায়ণগঞ্জ, সেখান থেকে শাহজালাল আর্ন্তজাতিক বিমানবন্দর পর্যন্ত জ্বালানি সরবরাহে পাইপলাইন বসানো হবে। এছাড়া ভারত থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে ডিজেল আনার উদ্যোগও নেয়া হয়েছে।
দেশের জ্বালানি তেল আমদানি ও বিপণন পুরো ব্যবস্থাটির দায়িত্বে রয়েছে সরকরি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। সংস্থাটির চেয়ারম্যান এএম বদরুদ্দোজা বলেন, ‘পাইপলাইনের মূল লক্ষ্য হলো কম সময়ে কম খরচে তেল সরবরাহ করা। এছাড়াও তেল চুরি রোধ ও অপচয় কামনোও অন্যতম উদ্দেশ্য।’
তবে বাংলাদেশ নৌ-যান শ্রমিক ফেডারেশন গত মাসে প্রধানমন্ত্রী বরাবর পাঠানো এক চিঠিতে পাইপলাইন স্থাপনের বিরোধিতা করেছে। তারা বলছে, পাইপলাইনে জ্বালানি তেল সরবরাহ অতিরিক্ত ঝুঁকির সৃষ্টি করবে। পাইপলাইন ব্যবস্থাপনায় অধিক ব্যয় করতে হবে। বাংলাদেশের মতো রাজনৈতিক অস্থিতিশীল দেশে পাইপলাইন স্থাপন অধিক ঝুঁকিপূর্ণ মনে করছেন তারা।
ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক চৌধুরী আশিকুল আলম স্বাক্ষরিত এ পত্রের অনুলিপি বিভিন্ন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, জ্বালানি বিভাগ, পেট্রোবাংলা, বিপিসিসহ সরকারে বিভিন্ন সংস্থায় পাঠানো হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে আশিকুল আলম সোমবার সন্ধ্যায় বলেন, ‘বাংলাদেশে নৌপথে জ্বালানি তেল পরিবহন তুলনামূলক সাশ্রয়ী ও কম ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু একটি স্বার্থান্বেষী মহল সরকারকে ভুল বুঝাচ্ছে। দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতায় সব কিছু বন্ধ হলেও নৌপথে তেল পরিবহন চালু থাকে।’
তবে সম্প্রতি সুন্দরবনে শ্যালা নদীতে দুর্ঘটনার কথা স্মরণ করিয়ে দিলে আশিকুল আলম বলেন, ‘ওই জাহাজ তেল পরিবহনের জন্য উপযুক্ত ছিল না। এটা একটা দুর্ঘটনা।’ তিনি বলেন, ‘পাইপ লাইনের চেয়ে বরং নৌ পথ ও সড়ক পথ তেল পরিবহনে ঝুঁকি কম।’
চিঠিতে বলা হয়, তেলবাহী জাহাজের সঙ্গে জড়িত ৭ হাজার শ্রমিকসহ তেল পরিবহনে নিয়োজিত লক্ষাধিক মানুষ সরকারের এ পরিকল্পনায় ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এছাড়া তেল পরিবহনে শতাধিক জাহাজ নির্মাণে বর্তমানে কয়েক হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ হয়েছে। পাইপলাইন হলে সম্ভবনাময় জাহাজ শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
এ বিষয়ে খাত সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র বলছে, আসলে তেল চুরির রমরমা বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যাবে বলেই একটি মহল পাইপলাইন স্থাপনের বিরোধিতা করছে।
জানা গেছে, দেশের জ্বালানি তলের চাহিদার প্রায় পুরোটাই আমদানি করা হয়। গভীর সমুদ্রের মাদার ভেসেল (বড় জাহাজ) থেকে ছোটো ছোট লাইটার জাহাজে চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় অবস্থিত ইস্টার্ন রিফাইনারির ডিপোতে তেল আনা হয়। এর পর নদী, সড়ক ও রেল পথে দেশের বিভিন্ন ডিপোতে তেল পাঠানো। হয়। তবে তেল পরিবহনের প্রধান রুট নৌপথ। প্রায় ৯০ শতাংশ তেল নৌপথে পরিবহন হয় ।
গভীর সমুদ্রে অবস্থানরত বড় জাহাজ থেকে ইস্টার্ন রিফাইনারিতে সরাসরি জ্বালানি তেল সরবরাহে নির্মাণ করা হবে সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং টার্মিনাল। এ টার্মিনাল থেকে পাইপলাইনে তেল যানে ইআরএলের ডিপোতে। চায়না পেট্রোলিয়াম পাইপলাইন ব্যুরো (সিপিপি) এটি নির্মাণ করবে। আর্থিক সহায়তা দেবে চীনের এক্সিম ব্যাংক।
বর্তমানে ২০ হাজার টনের একটি জাহাজ বাংলাদেশে আসার পর তেল খালাস করতে ২১ দিন সময় লাগে। টার্মিনাল নির্মিত হলে এ কাজে সময় লাগবে ১২ দিন। বিপিসি ধারণা করছে, টার্মিনাল হলে টন প্রতি তেল হ্যান্ডলিংয়ে পাঁচ ডলার সাশ্রয় হবে। ফলে বছরে বিপিসির ২৫০-৩০০ কোটি টাকা সাশ্রয় হবে। একই সঙ্গে তেল খালাসের সময় তেল চুরিও রোধ করা সম্ভব হবে।
বর্তমানে দেশে জ্বালানি তেলের গড় চাহিদা বছরে ৫৫ লাখ টন। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগের চাহিদা অর্ধেক। এ তেলে নদী পথে নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল ও ফতুল্লা ডিপোতে নেয়া হয়। পাইপলাইন হলে জ্বালানি তেল সরাসরি চট্টগ্রাম থেকে নারায়ণগঞ্জে পৌঁছাবে।
উল্লেখ্য, চলতি বছরের ৯ এপ্রিল জ্বালানি মন্ত্রণালযয়ে অফিস করে প্রধানমন্ত্রী চট্টগ্রাম থেকে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত পাইপলাইন স্থাপনের কাজ শুরুর নির্দেশনা দেন। এই সঙ্গে তিনি বিমানবন্দরে তেল সরবারহে পাইপলাইন বসাতে বলেন।
বিপিসি সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম থেকে নারায়ণগঞ্জে তেল আনতে ২৫০ কিলোমিটার পাইপলাইন বসাতে হবে। এতে ১২শ কোটি টাকার মতো খরচ হতে পারে। এর ফলে বছরে ৫০ কোটি টাকার মতো পরিবহন খরচ বাঁচতে পারে।
এদিকে উড়োজাহাজের জন্য নারায়ণগঞ্জের গোদলাইন ডিপো থেকে প্রতিদিন গড়ে ১২০ থেকে ১২৫টি ট্যাংক লরির মাধ্যমে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ডিপোতে তেল দেয়া হয়। এ তেল পরিবহনে চার থেকে থেকে পাঁচ ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লাগে। বিপিসি পাইপলাইনে এ তেল সরবরাহের পরিকল্পনা নিয়েছে। তবে নারায়ণগঞ্জের গোদলাইনের পরিবর্তে রূপগঞ্জের পিতলগঞ্জ থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত ১৫ থেকে ১৬ কিলোমিটার পাইপলাইন তৈরি করা হবে। এতে সরকারের ৮কোটি টাকা সাশ্রয় হবে।
এছাড়া, ভারতের আসাম রাজ্যের গোলাহাট জেলায় অবস্থিত দেশটির নুমলীগড় রিফাইনারি থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে ডিজেল আমদানি করবে বাংলাদেশ। এ জন্য ১৩০ কিলোমিটার পাইপলাইন স্থাপনের রুট নির্ধারণের কাজ চলছে।

