নিজস্ব প্রতিবেদক : ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের দিন তারিখের ঘোষণা না এলেও সারাদেশে বইছে নির্বাচনী হাওয়া। চায়ের দোকান, হাট-বাজার, উঠান বৈঠকসহ গ্রাম-গঞ্জের সর্বত্রই এখন চলছে নির্বাচন নিয়ে আলোচনা। নির্বাচনে প্রার্থী হতে ইচ্ছুক সম্ভাব্য চেয়ারম্যান ও সদস্যপদ প্রার্থীরা নিজ নিজ পাড়া-মহাল্লায় নিজেদের প্রচারে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন।
আসন্ন ইউপি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশের বেশিরভাগ গ্রাম ও ইউনিয়নে বিরাজ করছে এমন দৃশ্য। এই প্রতিবেদকের অনুসন্ধান ও জেলা প্রতিনিধির পাঠানো তথ্যই এমন চিত্র পাওয়া যায়।
কয়েকটি এলাকার স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আসন্ন ইউপি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য প্রার্থীরা নিজ নিজ এলাকায় প্রায় এক বছর থেকেই প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। সম্ভাব্য প্রার্থীরা কোরবানির ঈদকে প্রচারণায় কাজে লাগিয়েছেন।
এ সময় অনেকেই ঈদগায়ে নামাজ শেষে এলাকাবাসীর সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ করে জানান দেন আসন্ন নির্বাচনের প্রার্থীতার। অনেক প্রার্থীই বাড়িতে বিশেষ দাওয়াতের ব্যবস্থা রেখেছিলেন। কেউ কেউ ঈদ উপলক্ষে এলাকাবাসীর মধ্যে উপহার হিসেবে শাড়ি লুঙ্গিও বিতরণ করেন।
প্রচারণা অংশ হিসেবে প্রার্থীরা এলাকার অলি-গলি দখল করে পোস্টার লাগানো শুরু করে দিয়েছেন। সেই সঙ্গে চলছে স্থানীয় চায়ের দোকানে ভোটারদের চা-পান, বিড়ি সিগারেট খাওয়ানোর প্রতিযোগিতা।
সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন জেলার গ্রামের চিত্রে দেখা গেছে, সম্ভাব্য প্রার্থীরা নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকায় বিভিন্ন কৌশলে নির্বাচনের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নজরে আসার চেষ্টা করেছেন। এজন্য কেউ কেউ নিজ গ্রামের মসজিদ রেখে ওয়ার্ডের অন্য মহল্লার মসজিদে গিয়ে নামাজ আদায় করছেন। এই সুবাদে এলাকাবাসী ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করছেন প্রার্থীরা।
এছাড়া সম্ভাব্য প্রার্থীর অনেকেই স্থানীয় দৈনিকে ছবিসহ বিজ্ঞাপন দিয়েও ভোটারদের শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন। আবার কেউ কেউ গ্রামের অলিতে-গলিতে ব্যানার, ফেস্টুন সাঁটাছেন। প্রার্থীদের অনেকেই আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করতে দেখা গেছে। ফেসবুকে প্রচারণা চালানোর সঙ্গে ভোট ও দোয়া চাচ্ছেন তারা।
মৌলভীবাজার জেলার হাজিপুর ইউনিয়নের সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থী আব্দুল বাছিত বাচ্চু বলেন, ‘আমি সব সময় ইউনিয়নবাসীর সঙ্গে ছিলাম। মানুষের সেবাই আমার কাজ। বেশি করে মানুষের সেবা করতে আমি আগামী ইউপি নির্বাচনে অংশ নিতে চাই।’
নির্বাচনী প্রচারণায় চেয়ারম্যান প্রার্থীদের পাশাপাশি ওয়ার্ডের সম্ভাব্য সদস্য প্রার্থীদেরও দেখা গেছে। এমনই একজন হাজীপুর ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ডের কটারকোনা গ্রামের বাসিন্দা গিয়াস উদ্দিন।
এলাকাবাসীর উন্নয়নের কথা চিন্তা করে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি মানুষের সেবা করতে পছন্দ করি। দীর্ঘদিন ধরেই মানুষের সেবা করে যাচ্ছি। নির্বাচনে বিজয়ী হলে মানুষের আরো সেবা করার সুযোগ তৈরি হবে।’
ইউপি নির্বাচনের হাওয়া শুধু সম্ভাব্য প্রার্থীদের মাঝে লাগেনি। গ্রামে-গঞ্জের সাধারণ মানুষের মধ্যেও বিরাজ করছে নির্বাচনী আমেজ। তারা গ্রামের বাজারের মাঠে-ঘাটে চায়ে দোকানে নিজ নিজ এলাকার সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়েও নানা আলোচনা-সমালোচনায় মেতে উঠেছেন।
জলঢাকা উপজেলার বালাগ্রাম ইউনিয়নে বালাগ্রাম বাজার, ডাবলব্রিজ, কাঁকড়ার চৌপুতি, গুলমুণ্ডা ইউনিয়নের ভাবুনচুর বাজার, সিও বাজারসহ বেশ কয়েকটি বাজারে হরহামেশা এমন দৃশ্য দেখা যাচ্ছে।
বালাগ্রাম বাজারের চায়ের দোকানদার রুস্তম জানান, এদিকে বেশ আগে থেকেই ইউপি নির্বাচনের প্রচারণা শুরু হয়েছে। ইউনিয়নের সম্ভাব্য প্রার্থীরা মসজিদ ও ঈদের নামাজে এলাকাবাসীর সামনে এলাকার উন্নয়নের ফিরিস্তি তুলে ধরেছেন। এবারের নির্বাচন জমাবে বলে আশা করছে এই দোকানদার।
কুড়িগ্রামের ভুরুঙ্গামারি ইউনিয়নের স্থানীয় বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের ইউনিয়নে এখানো নির্বাচনের দিন বা সময় নির্ধারণ করা হয়নি। তবু সম্ভাব্য প্রার্থীরা নির্বাচনকে টাগের্ট করে মাঠে নেমে গেছেন।’
ইউপি নির্বাচনের প্রাথমিক প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে নির্বাচন কমিশন। এ প্রেক্ষিতে কমিশনের তাগদায় স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে সারাদেশের ইউনিয়ন পরিষদের তালিকা পাঠানো হয়েছে ইসিতে।
কমিশন দেশজুড়ে বিস্তৃত এসব ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন ধাপে ধাপে করার কথা ভাবছে। ফলে আগামী বছরের মার্চ থেকে শুরু করে জুলাইয়ের মধ্যে দেশের ৪ হাজার ৫৫৩টি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের পরিকল্পনা করছে ইসি বলে সূত্র জানায়।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সহকারি সচিব আশফাকুর রহমান বলেন, ‘নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে ইসি। এরই অংশ হিসেবে স্থানীয় সরকার বিভাগকে একটি চিঠি ও সম্প্রতি তাগিদপত্র পাঠানো হয়েছিল। এরই প্রেক্ষিতে স্থানীয় সরকার বিভাগ সারাদেশের ইউনিয়ন পরিষদের সংখ্যা ও সেই সব ইউপি চেয়ারম্যান ও সদস্যদের শপথ গ্রহণের তারিখসহ একটি তালিকা পাঠিয়ে দিয়েছে।’
ইউপি নির্বাচন প্রসঙ্গে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার ব্রি. জে. (অব.) মো. জাবেদ আলী বলেন, ‘স্থানীয় সরকারের যতো নির্বাচন হয় তার মধ্যে সংখ্যা ও বিস্তৃতির দিক থেকে এগিয়ে ইউনিয়ন পরিষদ। সারাদেশে মোট সাড়ে চার হাজার ইউনিয়ন পরিষদ রয়েছে। এগুলোর নির্বাচন আগামী বছরের মার্চ থেকে শুরু করে ধাপে ধাপে সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে।’
সারাদেশে ৪ হাজার ৫৫৩টি ইউপি রয়েছে। স্বাধীনতা পর কখনোই একত্রে ইউপি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। জনবল এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর স্বল্পতার কারণে ধাপে ধাপে এ নির্বাচন হয়ে থাকে। তাই কমিশন এবারও চাইছে আগের পথেই হাঁটতে।
সর্বশেষ ২০১১ সালের অনুষ্ঠিত হয়েছিল অষ্টম ইউপির নির্বাচন। ওই বছরের ২৯ মার্চ থেকে ৫ জুলাই প্রায় পাঁচমাস ধরে হয়েছিল এ নির্বাচন।
স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন, ২০০৯ এর ২৯ ধারা অনুযায়ী ইউপি নির্বাচনের পাঁচ বছর পূর্ণ হওয়ার আগের ১৮০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করার বিধান রয়েছে। এ হিসাবে আগামী জানুয়ারি থেকে জুলাইয়ের মধ্যে নির্বাচনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

