নিজস্ব প্রতিবেদক : রাজধানীর লোকাল কিংবা সিটিং, বাস কিংবা মিনিবাস, সব ধরনের গণপরিবহণে চলছে ইচ্ছেমতো ভাড়া আদায়ের মহোৎসব।
যাত্রীদের জিম্মি করে যে যার মতো করে ভাড়া আদায় করছে। এক্ষেত্রে ট্রাম্পকার্ড হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে বর্ধিত ভাড়া আদায় সংক্রান্ত সরকারের নতুন নির্দেশনাকে।
রোববার রাজধানীর প্রতিটি রুটে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এই বাড়তি ভাড়া আদায় করা হচ্ছে সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী ১ অক্টোবর থেকে বর্ধিত ভাড়া কার্যকর হওয়ার পর থেকে। এক্ষেত্রে প্রতিনিয়তই বাগবিতন্ডা হচ্ছে চালক-হেলপার ও যাত্রীদের মধ্যে।
রাজধানীতে চলাচল করা বিভিন্ন পরিবহনের ভাড়া আদায়, যাত্রীদের অভিযোগ এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।
চালকরা সরাসরি সরকারি নির্দেশনা বলে চালিয়ে দিচ্ছে বাড়তি ভাড়া আদায়ের বিষয়টি। কিন্তু যাত্রীদের অভিযোগ, প্রতি কিলোমিটার ১০ পয়সা হিসেবে যেখানে সাত কিলোমিটারের ভাড়া ৭০ পয়সা বাড়ার কথা সেখানে দুই থেকে চার টাকা বাড়তি ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে গণপরিবহন কর্মীদের যুক্তি, বর্ধিত ভাড়ার কারণে কোনো স্থানের ভাড়া ২৩ বা ২৩ টাকা ৫০ পয়সা অথবা ২৮ টাকা বা ২৮ টাকা ৫০ পয়সা হচ্ছে ভাঙতি না থাকায় ২৫ থেকে ২৬ টাকা নেয়া হচ্ছে।
ভুক্তভোগিরা বলছেন, সরকার বাড়তি ভাড়া আদায়ের যে নির্দেশনা দিয়েছে সে সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বাসমালিকরা তার থেকে অতিরিক্ত ভাড়া নিচ্ছেন। কিন্তু সরকার এর বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না।
নতুন মূল্য তালিকা অনুযায়ী, বাস ও মিনিবাসের ক্ষেত্রে প্রতি কিলোমিটারে ১০ পয়সা করে ভাড়া বাড়ানো হয়েছে। সে হিসেবে ঢাকার মতিঝিল শাপলা চত্বর থেকে মিরপুর-১ নম্বর পর্যন্ত ১১ দশমিক ৮ কিলোমিটার দূরত্বের জন্য ১ টাকা ১৮ পয়সা; মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর থেকে মতিঝিল শাপলা চত্বর পর্যন্ত ১১ দশমিক ১ কিলোমিটার দূরত্বে ১ টাকা ১১ পয়সা এবং ফার্মগেট থেকে মতিঝিল শাপলা চত্বর পর্যন্ত ৫ দশমিক ৫ কিলোমিটার দূরত্বের জন্য মাত্র ৫৫ পয়সা ভাড়া বাড়ানোর কথা।
খিলগাঁও থেকে মীরপুর-১৪ পর্যন্ত চলাচল করা বাহন পরিবহন আগে নিতো ৩০ টাকা। কিন্তু ১ অক্টোবর থেকে এই ভাড়া বাড়িয়ে নেয়া হচ্ছে ৪০ টাকা। কিন্তু কিলোমিটার হিসেবে এই ভাড়া হওয়ার কথা ছিল ৩৪ টাকা। একই রুটে চলাচল করা মিডওয়ে পরিবহনেও একই হারে ভাড়া আদায় করা হচ্ছে।
মিরপুর-১০ গোলচত্বর থেকে মতিঝিল শাপলা চত্বর পর্যন্ত ১ টাকা ১১ পয়সা ভাড়া বাড়ানোর কথা থাকলেও ওই রুটেও জনপ্রতি ৪ টাকা করে বাড়তি ভাড়া আদায় করা হচ্ছে; যা বর্ধিত ভাড়ার চেয়ে ২ টাকা ৮৯ পয়সা বেশি।
মিরপুর মিশন পরিবহনের বাসে আগে মিরপুর-১ থেকে মতিঝিল শাপলা চত্বরের ভাড়া ছিল ২৩ টাকা। বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) থেকে এই ভাড়া বাড়িয়ে ২৭ টাকা আদায় করা হয়েছে। এটি বর্ধিত ভাড়ার চেয়ে ২ টাকা ৮২ পয়সা বেশি। আবার একই গাড়িতে ফার্মগেট থেকে মতিঝিল রুটে ৫৫ পয়সার পরিবর্তে ২ টাকা বাড়তি ভাড়া আদায় করা হচ্ছে।
একই ভাবে ৪ থেকে ৫ টাকা ভাড়া বাড়িয়েছে মিরপুর ইউনাইটেড, নিউ ভিশন লিমিটেড, বিকল্প পরিবহন, বিহঙ্গ পরিবহন, হাজী পরিবহনও। এসব সিটিং সার্ভিস পরিবহনে ২৪ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৮ টাকা করে ভাড়া নেয়া হচ্ছে।
মিরপুর ইউনাইটেড পরিবহনের আক্কাস নামে এক হেলপার বলেন, আমরা মালিকের নির্দেশে ভাড়া নিচ্ছি। মালিকপক্ষ যে ভাড়া নিতে বলেছেন, তা-ই নিচ্ছি। কারণ আমাদের তো তাদের কাছে দিনশেষে ভাড়া বুঝিয়ে দিতে হয়।
বাড়তি ভাড়া আদায় করা হচ্ছে গুলিস্তান থেকে ঢাকার আশপাশের এলাকায় ছেড়ে যাওয়া বাসেও। মেঘলা ট্রান্সপোর্ট পরিবহনে আগে কাঁচপুর থেকে গুলিস্তান পর্যন্ত ২০ টাকা (টিকেট) রাখা হতো। ১ অক্টোবর থেকে এই ভাড়া বাড়িয়ে ৩০ টাকা করা হয়েছে।
জানতে চাইলে বাড়তি ভাড়া আদায়ের যুক্তি দেখিয়ে এই পরিবহনের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘আগে আমরা যাত্রাবাড়ি-গুলিস্তান ফ্লাইওভারের চার্জ রাখতাম না। এখন এই চার্জসহ সরকারি নির্দেশের বর্ধিত ভাড়া নেয়া হচ্ছে।
কিন্তু এক্ষেত্রে যাত্রীদের অভিযোগ, সরকারের নির্দেশনার ফায়দা লুটে একজন যাত্রীর কাছ থেকে ১০ টাকা করে বাড়তি ভাড়া নেওয়া কোনো ভাবেই যুক্তিসঙ্গত হতে পারে না।
একই অবস্থা এই রুটে চলাচল করা অন্যান্য পরিবহনেরও।
বাস-মিনিবাসগুলোতে সর্বনিম্ন ভাড়া ৭ টাকা ও ৫ টাকা নির্ধারিত থাকলেও তা মানছে না পরিবহন শ্রমিকেরা।
রাজধানীর মিনিবাসগুলোতে সর্বনিম্ন ভাড়া ৭ টাকা করে আদায় করা হচ্ছে। মতিঝিল থেকে পল্টন পর্যন্ত ১ কিলোমিটার দূরত্বে ২ টাকা বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ করেছেন যাত্রীরা। খিলগাঁও থেকে দৈনিক বাংলা পর্যন্ত ভাড়া ১০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১২ টাকা করা হয়েছে। আর ১২ টাকার ভাড়া বাড়িয়ে করা হয়েছে ১৫ টাকা।
প্রসঙ্গত, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির পর ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ এর আশপাশের বিভিন্ন সড়কে সিএনজিচালিত গণপরিবহনের ভাড়া বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। ১ অক্টোবর থেকে বাস ও মিনিবাসের নতুন ভাড়া কার্যকর হয়।

