নিজস্ব প্রতিবেদক : ইজারা প্রথা বন্ধ হলেও দাপট কমেনি সদরঘাট বন্দরের সদরঘাট, কালিগঞ্জ, সিমসনঘাট, ওয়াইজঘাট ও আগানগর ঘাটের ইজারাদারদের। নিষেধ থাকা সত্ত্বেও যাত্রী হয়রানি ও অতিরিক্ত টোল আদায় চলছেই। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, প্রভাব খাটিয়ে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার চাঁদাবাজি করে যাচ্ছে ইজারাদাররা। তাদেরকে এ কাজে সহযোগিতা করছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীন নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) এক শ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এবারের কোরবানি ঈদকে সামনে রেখে প্রতিদিন ৬ লাখ টাকার চাঁদা আদায়ের টার্গেট নিয়ে সদরঘাটে আধিপত্য বিস্তার করে চলেছে ইজারাদাররা।
এ ব্যাপারে গত ৩০ আগস্ট, ১, ৩ ও ৬ সেপ্টেম্বর নৌ-পরিবহন মন্ত্রী বরাবরে পৃথক অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। মন্ত্রীর নির্দেশে গত ১০ সেপ্টেম্বর সরেজমিনে পরিদর্শনপূর্বক প্রতিবেদন দেয়ার জন্য নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব নুরুর রহমানকে আহবায়ক করে দুই সদস্যের একটি আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়েছে।
এই কমিটিকে আগামী ৭ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। এ হিসেবে আগামীকাল রোববারে মধ্যে প্রতিবেদন দেয়ার কথা। এর আগেও গত আগস্ট মাসে চাঁদাবাজির অভিযোগ সরেজমিনে পরিদর্শন করে প্রতিবেদন দিতে বলা হয় দুই কর্মকর্তাকে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তারা প্রতিবেদন দাখিলও করেন।
বিআইডব্লিউটিএর সদরঘাট নদী বন্দর যুগ্ম-পরিচালক (বওপ) মো. গুলজার আলীর দেয়া স্বাক্ষরিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনেক দিন ধরেই সদরঘাট পয়েন্টে ইজারাদাররা সরকার কর্তৃক অনুমোদিত রেট সিডিউলের বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করেছ। কিন্তু অপরাধীদের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। যার ফলে চাঁদাবাজরা আরো বেপরোয়া হয়ে উঠে।
প্রতিবেদনে উল্লেখিত অবৈধ চাঁদা আদায়কারী ঘাট ইজারাদার হচ্ছেন আলমগীর হোসেন। আর এর পেছনে রয়েছে বিআইডব্লিউটিএর এক শ্রেণির অসাধু শীর্ষ কর্মকতাদের মদদ। এসব কর্মকর্তা ওই ইজারাদারের কাছ থেকে নিয়মিত উৎকোচ পেতেন বলে প্রমাণ মিলেছে। এ ব্যাপারে প্রতিবেদনে স্থানীয়দের নানা অভিযোগ তুলে ধরা হয়।
প্রতিবেদন বলা হয়, ওই ইজারাদারের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নেয়ায় স্থানীয় ক্ষুব্ধ এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে গত ৬ সেপ্টেম্বর নৌ-পরিবহন মন্ত্রী বরাবরে একটি অভিযোগ দায়ের করা হয়।
অভিযোগে বলা হয়েছে, প্রতিদিন হকারদের কাছ থেকে ৩০ হাজার টাকা আদায় করা হচ্ছে। টার্মিনালের ভাসমান নৌকা থেকে ৫শ’ টাকা করে চাঁদা নেয়া হচ্ছে। হকার উচ্ছেদ করতে গেলে বিআইডব্লিউটিএ কর্মকর্তাদের ইজারাদারদের হাতে নাজেহাল হতে হয় বলেও জানান এলাকাবাসী। এছাড়া পার্কিং মাঠ থেকে প্রতি সিএনজি গাড়ি থেকে চারগুণ হারে টোল নেয়া হচ্ছে। তার জানান প্রতি গাড়ি থেকে ২০ টাকা করে প্রতিদিন প্রায় ৩০ হাজার টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে ওই চাঁদাবাজ চক্র।
অভিযোগ রয়েছে, বিআইডব্লিউটিএ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তদারকি করছেন না বলে চাঁদা আদায়ের হার দিন দিন বেড়ে চলেছে। ৪টি নৌ-ঘাট থেকে প্রতিদিন একটি নৌকা থেকে ৮০ টাকা করে নেয়া হচ্ছে। ১ হাজার নৌকা থেকে নেয়া হচ্ছে ৮০ হাজার টাকা। মোবাইল চোরদের কাছ থেকে নদী বন্দরের দুই শিফটে প্রতিদিন ৪০ হাজার টাকা করে নেয়া হচ্ছে। এ ব্যাপারে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারী বৃদ্ধি করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন অভিযোগকারীরা।
খোঁজ নিয়ে জানা, গেছে, বন্দরের অভ্যন্তরে নৌ যানগুলোতে পানি বিক্রি, ফেরি করে শুকনো খাবার বিক্রিসহ প্রত্যেক ফেরিওয়ালাদের কাছ থেকে প্রতিদিন বিপুল অংকের মাসোহারা আদায় করছে ওই চাঁদাবাজ ও ইজারাদাররা। এছাড়া বিভিন্ন ব্র্যান্ডের পানি, কেক, রুটি বিক্রির জন্য আলাদা মাসোহারা দিতে হয় ইজারাদারদের। তা না হলে সে ব্র্যান্ডের পণ্য বন্দরের ভেতরে যেতে দেয়া হয় না।
জানা গেছে, মাম ও ফ্রেশ পানি বন্দরের অভ্যন্তরে বিক্রির জন্য প্রতিমাসে ১৫ হাজার টাকা করে দিতে হয় স্থানীয় পাইকারী ব্যবসায়ীদের। এ ছাড়া লঞ্চের ভেতরে বিভিন্ন ক্যান্টিনে কেক বিক্রির জন্য মাসে ১ লাখ টাকা করে দিতে হয় চাঁদাবাজ ইজারাদারদের। এছাড়া বিভিন্ন রুটির কোম্পানিকে মাসে ৮০ হাজার টাকা করে দিতে হয় বলে জানায় বিভিন্ন মালিক।
সরেজমিনে দেখা গেছে, মোটর সাইকেলের টোল নেয়ার কথা ২৫ টাকা করে। কিন্তু প্রভাব খাটিয়ে প্রতি মোটর সাইকেলে ২০০ টাকা করে টোল দিতে বাধ্য করছে অভিযুক্ত ইজারাদার। এমনি করে জুতার কার্টুনে ৫০ টাকার স্থলে ১৫০ টাকা, ঔষুদের কার্টুনে ২০ টাকার স্থলে ৭০ টাকা, পাওয়ার টিলার ৩০০ টাকার স্থলে নেয়া হচ্ছে ৮০০ টাকা, মটর পার্টস-এর কার্টুন ১৫০টাকার স্থলে নেয়া হচ্ছে ৩৫০ টাকা, বাইসাইকেলে ২০ টাকার পরিবর্তে নেয়া হচ্ছে ৮০ টাকা।
এছাড়া ঢাকা নদী বন্দরের ছোট বড় চায়ের দোকান ও টং দোকান থেকে দোকান প্রতি ৩ হাজার টাকা করে প্রায় আড়াই লাখ টাকা মাসিক চাঁদা তোলেন ইজাদার আলমগীর হোসেন। বুড়িগঙ্গা নদী পার হতে যাত্রীপ্রতি যেখানে ২৫ পয়সা নেয়ার কথা, সেখানে জনপ্রতি নেয়া হচ্ছে ২ টাকা করে। এভাবে ইজারাদার প্রতিদিন ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা করে হাতিয়ে নিচ্ছেন।
মো. ছানু নামের এক ব্যবসায়ী জানান, ঈদু-উল-আযহাকে সামনে রেখে চাঁদাবাজির পরিমাণ ও হয়রানি হার বেড়ে গেছে। ফলে সদরঘাটের সুনাম নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এ ব্যাপারে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের একটি স্পেশাল টিম গঠন করে তদন্ত হওয়া উচিত বলে তিনি মনে করেন তিনি।
জিনজিরা ফেরীঘাট বহুমুখী সমাজ কল্যাণ সমিতির সদস্য পরিচালক মো. শাহীন হোসেন স্বপন এর একটি লিখিত অভিযোগে বলেছেন, দেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের প্রায় ২০ জেলার ব্যবসায়ী নৌপথে সদরঘাট থেকে মালামাল আনা-নেয়া করা হয়। কিন্তু দুঃখ জনক হলেও সত্য ২০১৫-১৬ অর্থ বছরে লেবার হেল্ডিংয়ে ইজারা নেন মো. আলমগীর হোসেন। তিনি সরকার নির্ধারিত চার্জ না নিয়ে তার ইচ্ছে মাফিক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে জোরপূর্বক চার্জ আদার করছেন। এতে ব্যবসায়ীরা অর্থনৈতিক ও শারীরিক ভাবে নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। তিনি ইজারাদারের এ অত্যাচার বন্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার জন্য কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
এ ব্যাপারে অভিযুক্ত মো. আলমগীর হোসেন এর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘জিনজিরা ও কেরানীগঞ্জের একটি চক্র আমার বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযোগ দিচ্ছে। তারা ঘাট ইজারা না পাওয়ার কারণে মূলত এভাবে একের পর এক অভিযোগ দিয়ে আমাকে হয়রানী করছে।’
তার এই বক্তব্যের বিরোধিতা করে মো. মহিদুল ইসলাম, মো. মনির হোসেন, মো. হাছান হাওলাদার ও মো. রাজা খলিফা নামের চার ব্যবসায়ী লিখিত অভিযোগে বলেন, সদরঘাট, কালিগঞ্জ, সিমসনঘাট, ওয়াইজঘাট ও আগানগর এই ঘাটগুলোতে নানা ভাবে পেশীশক্তি জোরে সরকারের নির্ধারিত চার্জ থেকে ৪-৫ গুণ চার্জ আদায় করা হচ্ছে। যা বে-আইনী ও অন্যায়।
বিআইডব্লিউটিএর সদরঘাটের যুগ্ম-পরিচালক জয়নাল আবেদীন বলেন, ‘অনেক দিন ধরে ঘাট এলাকায় সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে সরকার নির্ধারিত চার্জ এর বাইরে অতিরিক্ত টাকা আদায় করছেন ইজাদাররা, যা আইনবিরোধী।’

