কুমিল্লা প্রতিনিধি : কোনো ভাবেই ঠেকানো যাচ্ছে না কুমিল্লায় গ্যাসের অবৈধ সংযোগ। বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডর কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে জেলার বিভিন্ন স্থানে অবৈধ সংযোগ দেয়া অব্যাহত রয়েছে। অবৈধ উপায়ে দেয়া সংযোগ থেকে এককালীন টাকা বাবদ প্রতি মাসে চক্রটি হাতিয়ে নিচ্ছে কয়েক কোটি টাকা। এতে বিপুল অঙ্কের রাজস্ব থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে সরকার। তবে মাঝে মাঝে সংশ্লিষ্ট এসব সংযোগ বিচ্ছিন্নকরণে অভিযান চালানো হলেও অদৃশ্য কারণে জড়িতদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
সূত্রমতে, ২০১০ সালের ১০ এপ্রিল থেকেই সংযোগ দেয়া বন্ধ ছিল। পরে ২০১৩ সালে আবারো নতুন করে সংযোগ দেয়া শুরু হয়। এসময় প্রায় ৮৮ হাজার আবেদনপত্র জমা পড়েছিল। নতুন সংযোগ চালুর পর ইতোমধ্যে প্রায় ১৩ হাজার সংযোগ দেয়া হয়েছে। তবে সংযোগ বন্ধ থাকাকালে কিছু দুর্নীতিপরায়ণ কর্মকর্তা-কর্মচারী বিভিন্ন স্থানে হাজার হাজার গ্রাহকদের কাছ থেকে এককালীন টাকা নিয়ে অবৈধ সংযোগ প্রদান করে।
এদিকে, অবৈধ গ্যাস সংযোগের মহোৎসব চলছে জেলার মুরাদনগর উপজেলায়। দিন দিন যেন আরো গতিশীল হয়ে উঠেছে সংযোগ প্রদানকারী চক্রটি। এরা একসময় রাতের আঁধারে কর্মকাণ্ড পরিচালনা করলেও এখন প্রকাশ্য দিবালোকেই চালাচ্ছে গ্যাসের অবৈধ সংযোগে রমরমা বাণিজ্য। আবার বৈধ গ্রাহক না হয়েও বিল বই ছাড়াই গ্যাস ব্যবহার করছেন হাজার হাজার গ্রাহক। যা থেকে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার।
অনুসন্ধানে জানা যায়, কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও দালাল চক্র বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন দেবিদ্বার জোনাল অফিস ও কুমিল্লার বাখরাবাদ গ্যাসের হেড অফিসের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজসে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে উপজেলার বিভিন্ন স্থানে অবৈধভাবে গ্যাসের আবাসিক সংযোগ দেয়ার মাধ্যমে সাধারণ গ্রাহকদের কাছ থেকে হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা ।
বাখরাবাদ গ্যাসের কুমিল্লা হেড অফিস ও দেবিদ্বার জোনাল অফিসের পক্ষ থেকে সাংবাদিকদের সাথে এসব লাইনকে মুখে অবৈধ বললেও, বিপুল অর্থের বিনিময়ে তারাই এ অবৈধ গ্যাস সংযোগের সুযোগ করে দিচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
অন্যদিকে সড়ক ও জনপথ বিভাগের পাকা সড়ক কেটে সম্পূর্ণ অবৈধ ভাবে গ্যাস লাইন নির্মাণ হলেও কর্মকর্তারা কোন প্রকার ব্যবস্থা না নেয়ায় জনমনে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে।
সড়ক ও জনপথের মুরাদনগর উপজেলার মুরাদনগর-রামচন্দ্রপুর সড়কের প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের সামনে থেকে সড়ক কেটে দুই ইঞ্চি ব্যাসের পাইপের মাধ্যমে কামাল্লা গ্রাম পর্যন্ত সম্পূর্ণ অবৈধ ভাবে টানা হচ্ছে প্রায় ২০ হাজার ফুট লম্বা লাইন। যেখানে দু’ইঞ্চি ব্যাসের পাইপের মাধ্যমে গ্যাস সংযোগের কোনো প্রকার বৈধ্যতা না থাকলেও বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশনের কুমিল্লা হেড অফিস ও দেবিদ্বার জোনাল অফিসের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তাদের এসব লাইন নির্মাণে সহযোগিতা করার অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়া ও সড়ক ও জনপথ বিভাগের সড়ক কেটে অবৈধ ভাবে পাইপ লাইন নেয়া হলেও দোষীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নিয়ে এ বিষয়ে নীরব ভুমিকায় জনমনে বিরুপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে।
উপজেলার আলোচিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স মোল্লা এন্টার প্রাইজের মালিক মজিবুর রহমান খোকন বেশ কিছুদিন ধরে রাতের-অন্ধকারে অবৈধ গ্যাস সংযোগ কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে এলেও এখন দিনের বেলাতেই অবৈধ এ লাইন নির্মাণ ও সংযোগ কার্যক্রম চালাচ্ছেন।
এ অবৈধ গ্যাস সংযোগের মহোৎসবের বিষয়ে স্থানীয় সংবাদিকরা সোচ্চার হলে গত ১৫ আগস্ট মুরাদনগর থানায় অবৈধ গ্যাস সংযোগ প্রদানকারী সিন্ডিকেটের সদস্য মজিবুর রহমান খোকন বাদী হয়ে বাংলাভিশন টিভির কুমিল্লা উত্তর জেলা প্রতিনিধি দেলোয়ার হোসেন ও দৈনিক ইত্তেফাকের মুরাদনগর উপজেলা সংবাদদাতা মোশাররফ হোসেন মনিরের বিরুদ্ধে চাদাঁবাজির মিথ্যা মামলা দায়ের করেন। এতে করে গ্যাস চোরাই সিন্ডিকেটগুলো আরো বেপরোয়া হয়ে ওঠে। এ সিন্ডিকেটগুলোর বিরুদ্ধে কেউ প্রতিবাদ করারও সাহস পাচ্ছে না।
সূত্রমতে, নির্মাণাধীন এ লাইন থেকে প্রায় ৩ হাজার গ্রাহককে অবৈধভাবে গ্যাস সংযোগ দেয়ার পাঁয়তারা চালাচ্ছে এ চক্রটি। এজন্য প্রতি গ্রাহক থেকে নেয়া হচ্ছে ৮০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা। যা থেকে সরকার হারাচ্ছে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব। অন্যদিকে সিন্ডিকেট ও দালাল চক্রগুলো কোটিপতি বনে যাচ্ছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার ধামঘর, করিমপুর, রহিমপুর, নগরপাড়, বাখরনগর, ছালিয়াকান্দি, গকুলনগর, ত্রিশসহ অর্ধশতাধিক গ্রাম এবং বোড়ারচর থেকে জাহাপুর পর্যন্ত ৩০ হাজার ফুট এবং ভুবনঘর থেকে দরিকান্দি হয়ে দুলারামপুর পর্যন্ত ১১ হাজার ফুট পাইপলাইন নির্মাণ কাজ চালিয়ে যাচ্ছে এ চক্র।
বাখরাবাদে অনুমোদনহীন পাইপলাইন স্থাপন করে অবৈধভাবে গ্যাস সংযোগ দিচ্ছে ঠিকাদার ও দালাল চক্র। এ বিষয়টি এলাকায় অনেকটা ওপেন সিক্রেট হলেও জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রশাসন থেকে কোনো ব্যবস্থাই নিতে দেখা যায়নি।
পালাসূতা গ্রামের জনপ্রতিনিধি কবির মেম্বার জানান, শুধুমাত্র তার গ্রামেই প্রায় ৮শ রাইজার বসানোর টার্গেটে ইতিমধ্যেই প্রায় দুইশতাধিক রাইজার লাগিয়েছে দালাল চক্র। প্রতি রাইজার থেকে এক লাখ করে টাকা নিলে অংক দাঁড়ায় মোট ৮ কোটি টাকা। এই অবৈধ লাইনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় কবির মেম্বারকে মেরে ফেলার হুমকি দেয় চক্রটি। পরে মারধর করে জীবন্ত মাটি চাপা দেয়ার চেষ্টাকালে স্থানীয় জনগণ তাকে উদ্ধার করে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করে। এ বিষয়ে কুমিল্লা আদালতে দায়ের করা একটি মামলা তদন্তাধীন ।
সর্বশেষ গত ৮ সেপ্টেম্বর মুরাদনগর উপজেলার কামাল্লা গ্রামে প্রায় ৩ হাজার গ্রাহক থেকে কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে চক্রটি দিনের বেলায় বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিডেটের (বিজিডিসিএল) নিজস্ব পাইপলাইন থেকে অবৈধ প্রায় ২০ হাজার ফুট গ্যাস লাইন সংযোগের মাধ্যমে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
বিষয়টি স্থানীয় কর্তৃপক্ষের জানা থাকলেও অদৃশ্য কারণে কোনো পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে না।
বিজিডিসিএলের দেবিদ্বার জোনাল অফিসের আওতাধীন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স মোল্লা এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী ও উপজেলার ধামঘর গ্রামের আব্দুর রহমান মোল্লার ছেলে মজিবুর রহমান খোকনের স্থানীয় এজেন্টরা কামাল্লা গ্রামে গ্যাস সংযোগ দেয়ার কথা বলে কিছু স্থানীয় দালাল চক্রের মাধ্যেমে প্রতি গ্রাহকের কাছ থেকে ৮০ থেকে ৯০ হাজার টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। চক্রটি বাখরাবাদ গ্যাস সিস্টেমের কতিপয় কর্মকর্তাও যোগসাজোশে নিম্নমানের পাইপ ব্যবহার করে ও বিদ্যুৎ লাইনে ওয়েল্ডিং করে ঝুঁকিপুর্ণভাবে বেশকিছু গ্রাহককে গ্যাস সংযোগ দেয়াসহ লাইন নির্মাণের কাজ দ্রুতগতিতে চালিয়ে যাচ্ছে।
এদিকে, জেলার বড়ুরা, দাউদকান্দি, ময়নামতি সেনানীবাসের আশপাশের এলাকাসহ চান্দিনা উপজেলার বিভিন্ন স্থানেও চলছে অবৈধ সংযোগের হিড়িক। চান্দিনার মাধাইয়া ইউনিয়নের নাওতলা গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল কাইয়ুম ২ রাইজার বাবদ ১ লাখ ১০ হাজার টাকা, আবুল কালাম আজাদ (আবু) ২ রাইজার বাবদ ৮০ হাজার টাকা দিয়েছেন ।
তাদের মত নাওতলা গ্রামের প্রায় ৬ শত গ্রাহক গ্যাস সংযোগের জন্য স্থানীয় ৫ রাজনৈতিক ব্যক্তিদের কাছে টাকা দিয়েছিলেন। তারা অবৈধভাবে গ্যাস সংযোগ পাওয়ার পর কয়েকদিন ব্যবহার করার পরই তাদের বাখরাবাদ কর্তৃপক্ষ জানিয়ে দেয় তাদের সংযোগ খুব শিগগিরই কেটে দেয়া হবে। এ খবর পাওয়ার পর থেকে হতাশ হয়ে পড়েছেন এলাকাবাসী।
এ ব্যাপারে জানতে বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন অফিসে যোগাযোগ করা হলেও কর্মকর্তাদের চরম ব্যস্ততার দরুণ কেউ কথা বলতে রাজি হননি।
এ বিষয়ে কথা বলতে বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কার্যালয়ে গেলেও প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কক্ষে প্রবেশের সুযোগ দেননি ব্যবস্থাপক (সমন্বয়ক) নেয়ামুল আলম খান। বরং তিনি রীতিমতো দুর্ব্যবহার করেন।
এদিকে সেলফোনে যোগাযোগ করা হলে বক্তব্য দেয়ার আশ্বাসে দুই ঘণ্টারও বেশি সময় বসিয়ে রাখেন প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মানিক মোহাম্মদ নিজামুল হাসান শরীফ। পরে সেলফোনে তার সাথে পুনরায় যোগাযোগ করা হলে তিনি সাফ জানিয়ে দেন ‘তিনি কথা বলবেন না’।

