নিজস্ব প্রতিবেদক : দিন যতোই যাচ্ছে কোরবানির ঈদ ততোই ঘনিয়ে আসছে। ভারত গরু দেবে না, এ কারণে দেশে গরুর সঙ্কট হতে পারে। এ নিয়ে শঙ্কিত দেশের জনগণ ও ব্যবসায়ীরা। কিন্তু বাণিজ্যমন্ত্রী আশ্বস্ত করেছেন ভারত থেকে না আসলেও কোরবানির গরুর সঙ্কট হবে না। গরু ব্যবসায়িরা জানিয়েছেন, ভারত সীমান্তে গরু পাচারে নজরদারি বাড়ানোর কথা বলা মানে ঘুষের পরিমান বেড়ে যাওয়া। ভারতের সীমান্ত দিয়ে গরু আসলেও দেশের বাজারে দাম বাড়ার আশঙ্কা করছেন তারা।
গরু ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মজিবুর রহমান বলেন, ‘গরুর সঙ্কট হবে না বলে মন্ত্রী আশ্বস্ত করেছেন এটা ভালো। আমরাও চাই গরুর সঙ্কট না হোক। কিন্তু ভারতের গরু এলেই সঙ্কট থাকবে না। সে দেশের গরু আসার কারণেই দেশের বাজারে দাম কমে। কিন্তু ভারত থেকে গরু আসা বন্ধ থাকলে দাম বাড়ে। সীমান্ত দিয়ে গরু আনা নেয়ার বিষয়ে আমাদের জানা মতে সরকারের কোনো চুক্তি নাই। তাই গরু বেচাকেনা বা পাচারে নজরদারী বাড়ার কারণে বিভিন্ন স্তরে ঘুষ বেশি দিতে হচ্ছে। আর এ কারণে আমাদের দেশে মাংসের দাম বেড়েছে।’
তিনি বলেন, ‘কোরবানি ঈদের আগে সীমান্তে ভারত নজরদারী বাড়ানোর কথা বলছে মানে হলো এখন ঘুষ লেনদেন আরো বেড়েছে। একেবারে যে ভারতের গরু আসছে না সেটা নয়। সীমান্তে ঘুষ বেশি দিয়েই ভারতীয় গরু আনা হচ্ছে। তবে আগের চেয়ে তুলনামূলকভাবে কম গরু আসছে। এ কারণে গরুর দাম বেশি পড়বে। সীমান্ত থেকে বেশি দামে কিনলে তো স্বাভাবিকভাবে প্রতিটি গরু বাড়িয়ে বিক্রি করতে হবে। তাছাড়া যেসব গরু ব্যবসায়ী ২ থেকে ৩ কোটি টাকা বিনিয়োগ করছে তারা লোকসানে পড়বে।’
সমিতির সভাপতি আনোয়ার মণ্ডলও একইমত পোষণ করে বলেন, ‘মন্ত্রী সাহেব বলেছেন মিয়ানমার থেকে গরু এনে চাহিদা পূরণ করবেন। ধরুন, মিয়ানমার থেকে গরু আসলো, সেখান থেকে তো সরাসরি ঢাকা বা সারাদেশে আসবে না। সেখান থেকে টেকনাফ সীমান্তে আনতে হবে। কিন্তু সেখানে তো বদির (স্থানীয় এমপি) লোকদের চাঁদাবাজি থেকে রেহাই পাওয়া যাবে না। তখনো গরুর দাম বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।’
এদিকে বাংলাদেশ মাংস ব্যবসায়ী সমিতির মহাসচিব রবিউল আলম গরু ব্যবসায়ী সমিতি নেতাদের সঙ্গে একমত পোষণ করে বলেন, ‘সীমান্ত এলাকায় সব সময়ই ঘুষ বাণিজ্য হয়। আগে এক লাখ টাকা মূল্যের একটি গরু আনতে ঘুষ দিতে হতো ২ হাজার টাকা থেকে ৫ হাজার টাকা। এখন সেই গরু আনতে ঘুষের হার পড়বে ১৫ হাজার টাকা থেকে ২৫ হাজার টাকা। ঘুষ বেশি দিয়ে আনলে তো তার সামান্য প্রভাব হলেও বাজারে পড়বে।’
তিনি বলেন, ‘স্বাধীনতার পর থেকে আমরা ভারত নির্ভরশীল হয়ে আছি। কিন্তু অতীতের চেয়ে দেশে গরুর উৎপাদন বেড়েছে। আর এ কারণে ভারত নির্ভরশীলতা কমছে। এবারই প্রথম চারটি দেশ থেকে গরু আনা হচ্ছে। তার মধ্যে রয়েছে- ভুটান, নেপাল, মিয়ানমার, পাকিস্তান। দেশের গরু ব্যবসায়ী ও জনগণের হতাশ হওয়ার কিছু নেই। একদিনে তো সবাই গরু কিনতে বাজারে যাবে না। পর্যায়ক্রমে চারটি দেশ থেকে গরু আসবে। এর সঙ্গে দেশে যে সংখ্যক পশু মজুদ আছে তা দিয়ে কোরবানি ঈদে কোনো ধরনের সঙ্কট হবে না বলে আমি মনে করি।’
সূত্র জানায়, এবারের ঈদে কোরবানির জন্য ৪০ লাখ গরুর প্রয়োজন হতে পারে। এর মধ্যে দেশে ৩০ লাখ গরু-মহিষ, ৬৯ লাখ ছাগল রয়েছে। তাই কোরবানির ঈদে গরুর সঙ্কট কিছুটা থাকছে।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অজয় কুমার রায় বলেন, ‘আমাদের দেশে ভারত থেকে গরু না এলে এ খাত সংশ্লিষ্টরা লাভবান হবে। অনেকেই গরু পালনের উদ্যোগ নেবেন। একই সঙ্গে উৎপাদন বাড়তে অধিদপ্তর বিভিন্ন পদক্ষেপ হাতে নিয়েছে এবং নেবে।’
তিনি বলেন, ‘এর আগে ভারতের গরু সরবরাহ কমে যাওয়ায় মাংসের দাম বেড়ে গেছে। দেশে বছরে মোট গরুর চাহিদার ৭০ শতাংশের যোগান দেয় দেশীয় খামারিরা। বাকি মাত্র ৩০ শতাংশ আসে ভারত থেকে। এবার ভারত থেকে গরু না এলেও অন্যান্য দেশ থেকে গরু আসছে। ফলে বাজারগুলোতে কোরবানি ঈদ উপলক্ষে চাহিদানুযায়ী গরু সরবরাহ থাকবে।’
সীমান্ত এলাকার গরু ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলাপকালে তারা জানান, কোরবানি উপলক্ষে কয়েকদিন ধরেই ভারতসহ মিয়ানমার, নেপাল, ভুটান ও পাকিস্তান থেকে গরু আসছে। দিন দিন সীমান্ত এলাকায় অন্যান্য দেশের গরুর সংখ্যা বাড়ছে। এতে কোরবানির গরু সঙ্কট নিয়ে যে চিন্তা ছিল তা কেটে যাচ্ছে। তবে সীমান্ত এলাকায় আগের চেয়ে ঘুষের পরিমান বেড়েছে বলে জানিয়েছেন তারা। এতে করে গরুর দাম বাড়তি থাকার আশঙ্কা।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের গরু ব্যবসায়ী মো. মনু মিয়া জানান, জহুরপুর সীমান্ত দিয়ে আগে প্রতিদিন ৪০০-৫০০ গরু আসতো। এখন সীমান্ত এলাকায় নজরদারী বাড়ার কারণে অনেকে আতঙ্কে আছে। সেই সঙ্গে গরু প্রতি ঘুষের পরিমানও বেড়েছে। এ কারণে আগের চেয়ে এ সীমান্ত দিয়ে কম গরু আসছে। তবে ঈদের আগে সীমান্ত এলাকা দিয়ে গরু আসার পরিমান বাড়বে বলে মনে করছেন তিনি।
দেশে কোরবানির পশুর কতো চাহিদা রয়েছে তার কোনো সঠিক তথ্য উপাত্ত না থাকলেও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গত বছর দেশে কোরবানি হয়েছিল ৩৬ লাখ গরু। এবার দেশে ৪০ লাখ গরু কোরবানি হতে পারে। দেশে বর্তমানে গরু আছে ২ কোটি ৩৬ লাখ। এর একটি বড় অংশ গাভি ও কম বয়সী। তবে প্রায় ৩০ লাখ জবাই উপযোগী। এছাড়া কোরবানির জন্য ১০ লাখ গরুর ঘাটতি রয়েছে। তা পূরণে চারটি দেশ থেকে গরু আসছে।

