নিজস্ব প্রতিবেদক : নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে দেশের সকল ভোটারদের উন্নতমানের জাতীয় পরিচয়পত্র স্মার্টকার্ড সরবরাহ করা সম্ভব নয়। তাই আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম ফর এনহেন্সিং অ্যাকসেস টু সার্ভিসেস (আইডিইএ) প্রকল্পের মেয়াদ আরো ১৮ মাস বাড়ানোর প্রস্তাব জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। প্রকল্পটির মেয়াদ বৃদ্ধির বিষয়টি এখন পরিকল্পনা কমিশনে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
সম্প্রতি ইসির সিনিয়র সহকারী সচিব মো. সাইফুল হক চৌধুরী স্বাক্ষরিত এ সংক্রান্ত প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) সচিব বরাবর পাঠানো হয়েছে। সেই প্রস্তাবে নির্বাচন কমিশন সচিবালয় বাস্তবায়নাধীন আইডিইএ প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি ছাড়াই তার মেয়াদ ১৮ মাস অর্থাৎ জুন ২০১৬ এর পরিবর্তে ডিসেম্বর ২০১৭ বৃদ্ধির করার জন্য বলা হয়।
প্রকল্পের মেয়াদ বাড়াতে আইএমইডি’র চাওয়া তিনটি প্রশ্নের উত্তরও পাঠনো হয়েছে। প্রশ্নগুলো হলো- প্রকল্পের আওতায় স্মার্ট (এনআইডি) উৎপাদনের জন্য চুক্তিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বর্তমানে সমঝোতা হয়েছে কি না, প্রকল্প বাস্তবায়নে অতিরিক্ত ১৮ মাস কেন প্রয়োজন হবে তার সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রদান এবং উল্লেখিত বর্ণিত সময়ের জন্য কোনো ব্যয় বৃদ্ধি হবে না এই মর্মে নিশ্চয়তা প্রদান।
আইএমইডি’র প্রশ্নের জবাবে বলা হয়েছে যে, দাতা সংস্থাকে অবহিত করা হয়েছে- সময় বাড়ানো হলেও এতে কোনো ব্যয় বাড়বে না এবং প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর কারণ উল্লেখ করে বলা হয়েছে নির্দিষ্ট সময়ে স্মার্টকার্ড তৈরি করা গেলেও ওই সময়ের মধ্যে সাড়ে ৯ কোটি নাগরিকের হাতে তা পৌঁছে দেয়া সম্ভব হবে না। এ কারণে মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
পাঠানো প্রস্তাবে আরো বলা হয়, প্রকল্প শুরুর দিকে ফাইন্যান্সিং এগ্রিমেন্ট শর্ত সংশোধন জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন আইন (সংশোধন) ২০১৩ এবং বিধিমালা ও প্রবিধানমালা করতে প্রায় ৩০ মাস ব্যয় হয়। চুক্তিবদ্ধ প্রতিষ্ঠারে এ বছরের মধ্যেই কার্ড উৎপাদন আরম্ভ হবে। প্রতি মাসে গড়ে ৬ মিলিয়ন হারে কার্ড উৎপাদন ও উপজেলা পর্যায়ে বিতরণ করা হবে। এ হারে কার্ড উৎপাদন ও বিতরণের জন্য প্রায় ১৫ মাস সময়ের প্রয়োজন হবে। প্রকল্পের অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে দেশের সকল নাগরিদের হাতে স্মার্টকার্ড পৌঁছে দেয়া ও ডাটাবেজ ব্যবহার করে আইডি ভেরিফিকেশন সেবা নিশ্চত করা। এ কারণেই এই সেবা নিশ্চিত করার জন্য ১৮ মাস সময় বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। ১৮ মাস বৃদ্ধি করা হলে প্রকল্পের উদ্দেশ্য পূরণ করা সম্ভব হবে বলেও জানানো হয়।
এ প্রসঙ্গে প্রকল্প পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুজ্জামান মো. সালেহ উদ্দীন বলেন, ‘২০১৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। এর যৌক্তিক কারণ দেখিয়েছি আমরা, আশা করছি পরিকল্পনা কমিশন প্রকল্পটির সময় বাড়ানোর বিষয়টি অনুমোদন দেবে। আমরা ইতিমধ্যে স্মার্টকার্ড প্রস্তুতের জন্য মেশিন বসানো থেকে চূড়ান্ত প্রস্তুতি সেরে ফেলেছি। শিগগির কার্ড তৈরির কার্যক্রম শুরু হবে। মেয়াদ বাড়লে বিতরণের সময়ও বেশি পাওয়া যাবে।’ এছাড়া অল্প সময়ে মধ্যে সাড়ে ৯ কোটি নাগরিককে স্মার্টকার্ড দিতে গেলে কাজের মান নষ্ট হওয়ার সম্ভবনা আছে বলে জানান তিনি।
ইসির সূত্র জানায়, আইডিয়া প্রকল্পের আওতায় ২০১৬ সালের জুন মাসের মধ্যে সাড়ে নয় কোটি নাগরিকের হাতে স্মার্টকার্ড পৌঁছে দেয়ার কথা ছিল। এ জন্য উৎপাদন শুরুর কথা ছিল গত আগস্টেই। এ বছরের ১৪ জানুয়ারিতে স্মার্টকার্ড তৈরি ও বিতরণের বিষয়ে ফ্রান্সের একটি সংস্থার সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষার করে ইসি। সেই চুক্তি অনুযায়ী স্মার্টকার্ড উৎপাদন কার্যক্রম এখন পর্যন্ত শুরু করতে না পারায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সাড়ে ৯ কোটি নাগরিকের মাঝে স্মার্টকার্ড পৌঁছে দেয়া নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।
প্রকল্পটির মেয়াদ বাড়ানো প্রসঙ্গে আইএমইডির সচিব শহীদ উল্লাহ খন্দকার বলেন, ‘আমরা আইডিইএ প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব পেয়েছি। বিষয়টি যাছাই-বাছাই করে দেখছি। কেউ সময় চাইলে তো আর দেয়া যায় না। প্রকল্পটির বর্তমান অবস্থান পর্যালোচনা করে তারপর আমরা সিদ্ধান্ত নেব।’
প্রসঙ্গত, বিশ্বব্যাংক ও জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) সহায়তায় আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম ফর এনহ্যান্সিং একসেস টু সার্ভিসেস (আইডিইএ) প্রকল্পের কাজ শুরু হয় ২০১১ সালের জুলাইয়ে। প্রকল্প ব্যয় ধরা হয় ১ হাজার ৩৭৯ কোটি ১৯ লাখ টাকা। ২০১৬ সালের জুনের মধ্যে এ প্রকল্পটি শেষ হওয়ার কথা। এছাড়া ১৪ জানুয়ারি স্মার্টকার্ড প্রস্তুত ও বিতরণের জন্য ফ্রান্সের ওবার্থার টেকনোলজিস নামের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করে ইসি।
এরপর থেকে কমিশন বিভিন্ন সময় স্মার্টকার্ড বিতরণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে এসেছে। বিভিন্ন ব্যর্থতার কারণে বারবার কথা দিলেও এখন পর্যন্ত বহুল আকাঙ্ক্ষিত সেই স্মার্টকার্ড কোনো নাগরিককের হাতে দেয়া তো দূরে থাক তা তৈরিও করতে পারেনি। অথচ ২০১৪ সালের ১৬ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রীর মাধ্যমে এ কার্যক্রম উদ্বোধন করার কথা ছিল। কিন্তু তখনো কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি না হওয়ায় কার্যক্রম শুরু করতে পারেনি ইসি।
এরপর চুক্তি স্বাক্ষরের পর পরবর্তীতে গত ২৬ মার্চ অর্থাৎ স্বাধীনতা দিবসে আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে কার্ড বিতরণ হবে বলে জানানো হয়। এ উদ্যোগটিতে ব্যর্থ হলেও বাঙালির বর্ষবরণ উৎসব পহেলা বৈশাখে কার্ড বিতরণের সিদ্ধান্ত নেয়। তবে সে সিদ্ধান্তও আলোর মুখ দেখতে পারেনি।
স্মার্টকার্ড প্রসঙ্গে গত মঙ্গলবার সিইসি কাজী রকিব উদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘স্মার্টকার্ড উৎপাদনের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। আশা করছি এ বছর থেকে স্মার্টকার্ড বিতরণ করা হবে।’
উল্লেখ্য, বর্তমানে সারাদেশে ৯ কোটি ৬২ লাখ ২৬ হাজার ৫৪২ জন ভোটার রয়েছে। সেই সঙ্গে চলমান ভোটার তালিকা হালনাগাদে নতুন ৭২ লাখ নাগরিককে অন্তর্ভূক্ত করা হবে।

