বিনোদন ডেস্ক : জালালের কিশোর বয়স। জন্ম-পরিচয়, জাত-কূল নেই। ড্যাগে ভেসে আসে এক অজপাড়াগাঁওয়ে। আশ্রয় হয় চেয়্যারমান বাড়িতে। চেয়ারম্যান সাহেবকে ‘আব্বা’ ডাকেন। কিন্তু ‘আব্বা’ তাকে টিকিটিরও মূল্য দেয়না। জালালের একলা জীবন। কবুতর আর কুকুরের সঙ্গে তার ভাব জমে। না বলা কথাগুলো কাউকে বলতে পারে না। সবাই যখন মুখ ফিরিয়ে নেয়। কিন্তু একজন একদম আলাদা। তিনি চেয়্যারম্যানের স্ত্রী, শর্মীমালা। বাচ্চা-কাচ্চা নেই। মায়া লাগে ছেলেটাকে। কাছে এসে মাথায় হাত বুলান। পরম মমতায় আগলে রাখেন বুকে। জালালকে পেটে না ধরেও তিনি ‘মা’ হয়ে উঠেন। হঠাৎ একদিন ওঝার ষড়যন্ত্রে হাত-পা বেধে নদীতে ফেলা হয় জালালকে। সেদিন প্রতিবাদী হয়ে উঠেছিল জালালের সাদাসিধে মা। সে প্রতিবাদে ভালোবাসা ছিল, বারুদ ছিল। বারুদমাখা গল্পের শুরুটা ২০১৩ সালে। জালালের মা চরিত্রে অভিনয়ের জন্য সম্প্রতি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার প্রাপ্ত অভিনেত্রী শর্মীমালাকে বেছে নেন নির্মাতা আবু শাহেদ ইমন। গাজীপুর থেকে টাঙ্গাইল চষে বেড়িয়েছেন শর্মী। ক্যামেরার সামনে ঢেলে দিয়েছেন নিজের সেরাটা। দৃশ্যধারণ থেকে ডাবিং, এডিটিং সবই শেষ হয়েছিল সে বছর। এর মাঝে দুটা বছর কেটে গেল। বিদেশে বিভিন্ন ফেস্টিভালে নাম কুড়ালো ‘জালালের গল্প’। গর্বে উজ্জ্বল হল জালালের মায়ের মুখ। সন্তানের এমন সাফল্যে কে না আনন্দ পায়! বিশ্ব ঘুরে দেশে ছবিটি মুক্তি পেল ৪ সেপ্টেম্বর।
কাছের বন্ধু, পাশের বসা বন্ধু, দুরের বন্ধুদের অভিনন্দন বন্যায় ভাসছেন। ফেসবুকের দেয়ালে দেয়ালে ভাসছে ‘জালালের গল্প’র শ্রুতি। জালালের মার সাবলিল অভিনয় দর্শকদের মনে দাগ কেটেছে। তবে প্রশংসার চেয়ে সমালোচনাটাকেই প্রাধ্যান্য দিচ্ছেন তিনি। বললেন, ‘আমার ক্যারেক্টারটা নিয়ে যতো সমালোচনা করবে ততোই ভালো।
সিনেমায় তার স্বামীর চরিত্র করেছেন তৌকির আহমেদ। এছাড়া জালালের আরো একজোড়া বাবা-মা আছে, মোশাররফ করিম-মৌসুমী হামিদ। সবমিলিয়ে জালালের যৌথ পরিবার। সবার সঙ্গে অভিনয়টা বেশ উপভোগ করেছেন তিনি। বললেন, ‘শুটিংয়ে মোশাররফ ভাইয়ের সঙ্গে আমার দেখাই হয়নি। তৌকির ভাইয়ের সঙ্গে শুটিং করেছি। অনেক কিছু শিখেছি। আর ইমন ভাইয়ের কাজগুলো খুব গোছানো। মনেই হবে না উনি ফিল্মে নতুন। পরিকল্পনায় অনেক ম্যাচিউরড’।
জালালের গল্পের আগে হাতে গোনা দু-তিনটা সিনেমায় কাজ করেছেন তিনি। গৎবাধা গল্পের পেছনে তিনি ছোটেননা। বছরে চারটা পাঁচটা সিনেমায় বিশ্বাসী নয়। একটা ছবির কাজ করার পর প্রয়োজনের বছরের পর বছর অপেক্ষা করেন। তবুও ভালো চরিত্র না পেলে কাজ করেননা। জানালেন, ‘মনের মানুষ করার পর তিন বছর গ্যাপ দিয়েছি। এরপর নাম লেখালাম মৃত্তিকা মায়ায়।’ মৃত্তিকা মায়া কাজ করার পর আর তাকে পেছনে ফেরে তাকাতে হয়নি। সর্বোচ্চ রাস্ট্রীয় সন্মাননা জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন।
তার সিনেমার লিস্টটা দেখে সহজেই অনুমেয়, নাচে-গানে ভরপুর কোন সিনেমায় এখনো কাজ করেননি। সব সিনেমায় ফরমুলা ছাড়া। কারণটাও বাখ্যা করলেন তিনি, ‘একজন আর্টিষ্ট সব ক্যারেক্টার পারবে না। কিন্তু সব ক্যারেক্টারে ঢুকে ঢুকে দেখবে, কোনটাতে সে পারফেক্ট। ‘নদীজন’-এর জেলের বউ, ‘মনের মানুষ’র সাধনসঙ্গী, ‘মৃত্তিকা মায়া’র কুমার পাড়ার জীবনের গল্প নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করেছি। সব চরিত্রের মধ্যেই কিন্তু ভেরিয়েশন আছে।’
তাহলে কি নাচে-গানে ভরপুর সিনেমায় দেখা যাবে না? ‘এই ধরনের সিনেমায় আমার তো কোন সমস্যা নেই। কিন্তু আমাকে কনভিন্স হতে হবে। একটা নাচ করতে বললে রাজি হবো না। স্টোরি লাইনের প্রয়োজনে যদি নাচ করতে হয় সেটা করবো।’–জানালেন শর্মীমালা।
আপাতত ‘জালালের গল্পেই বুঁদ হয়ে আছেন তিনি। কোন সিনেমায় নাম লেখাননি। তবে একটা সিনেমায় কাজের প্রাথমিক কথাবার্তা নাকি চলছে। ব্যাটে বলে মিললে কাজ করবেন। সিনেমার পাশাপাশি মঞ্চেও কাজ করছেন। মাস তিনেক আগে ‘বাংলার মাটি বাংলায় জল’-এর শো করেছেন। আর ছোটপর্দায় আফসানা মিমির ‘ডলস হাউস’, এনটিভির ‘পাগলা হাওয়ার দিন’-এ কাজ করেছেন।
‘সাধ্য থাকলে শুধু থিয়েটার আর ফিল্মই করতাম। কিন্তু প্রয়োজনের তাগিদেই ছোটপর্দায় কাজ করি।’ জানিয়ে রাখলেন শর্মীমালা।

