নিজস্ব প্রতিবেদক : দেশে ক্রমাগত হারে বাড়ছে আত্মহত্যার প্রবণতা। পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাবে, গত ছয় বছরে সারা দেশে ৫৯ হাজার ৭৬০টি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে। সে হিসাবে, প্রতিদিন গড়ে ২৮ জন আত্মহত্যা করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুসায়ী, গত বছর (২০১৪) আত্মহত্যায় বিশ্বে বাংলাদেশের স্থান ছিল দশম, ২০১১ সালে ছিল ৩৮তম।
বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, আত্মহত্যাকারীদের মধ্যে বেশিরভাগই ২১ থেকে ৩০ বছর বয়সী। বাংলাদেশে প্রতি এক লাখে ৭ দশমিক ৮ জন আত্মহত্যা করে। আত্মহত্যায় পুরুষের চেয়ে নারীর সংখ্যাই বেশি, ৭৮ শতাংশ।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পারিবারিক অশান্তি, মানসিক সমস্যা, হতাশা, বেকারত্ব, প্রেম, পরকীয়া ও মাদকাসক্তির কারণেই বেশি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে। এছাড়া নারীকে উত্ত্যক্ত করা, পড়ালেখা নিয়ে শাসন, মা-বাবার বিচ্ছেদ, পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়াসহ বেশ কিছু কারণে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে।
দেশে ক্রমবর্ধমান আত্মহত্যার প্রবণতারোধে পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রকে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে বলেও মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এমনই পরিস্থিতির মধ্যে আজ ১০ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস পালিত হচ্ছে। ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন ফর সুইসাইড প্রিভেনশন (আইএএসপি) বা আত্মহত্যা প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক সংস্থার উদ্যোগে প্রতি বছর এই দিবসটি পালিত হয়। ২০০৩ সাল থেকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সহায়তায় দিবসটি পালিত হচ্ছে। এ বছর প্রতিপাদ্য বিষয়- আত্মহত্যা প্রতিরোধে ভূমিকা রাখা ও জীবন রক্ষা। যেখানে বলা হচ্ছে, আত্মহত্যাপ্রবণ ব্যক্তিকে সহায়তা ও তার জীবন রক্ষা করতে এগিয়ে আসা। বিগত বছরগুলোয় বিশ্বের ৭০টি দেশে দিবসটি পালিত হয়েছে। তবে বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবসটি পালিত হচ্ছে না।
এবার বাংলাদেশে আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবসটি আনুষ্ঠানিকভাবে পালন করছে কয়েকটি বেসরকারি সংগঠন। এসব সংগঠনের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা বলছেন, বাংলাদেশের আত্মহত্যার ক্রমবর্ধমান প্রবণতার কারণে এখানেও আন্তর্জাতিকভাবে দিবসটি পালনের গুরুত্ব বেড়েছে। তাই সরকারিভাবে আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস পালনের দাবি জানিয়েছেন তারা।
পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাবে, গত ছয় বছরে দেশে ৫৯ হাজার ৭৬০টি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে। এ সময়ে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে ৩৩ হাজার ৪২৩টি। এর মধ্যে ২০০৯ সালে ৪ হাজার ৬২২, ২০১০ সালে ৪ হাজার ৬৭৯, ২০১১ সালে ৫ হাজার ৯৬, ২০১২ সালে ৫ হাজার ৯০৩, ২০১৩ সালে ৬ হাজার ৪১৭ এবং ২০১৪ সালে ৬ হাজার ৭০৬টি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে। অন্যদিকে বিষপানে গত ৬ বছরে ২৬ হাজার ৩৭৭টি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ২০০৯ সালে ৫ হাজার ৩৮৮, ২০১০ সালে ৪ হাজার ৯৮৬, ২০১১ সালে ৪ হাজার ৫৪৬, ২০১২ সালে ৪ হাজার ২০৫, ২০১৩ সালে ৩ হাজার ৭১২ এবং ২০১৪ সালে ৩ হাজার ৫০০টি ঘটনা ঘটে।
ঘটনা বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৬৪টি জেলার মধ্যে ঝিনাইদহ জেলায় আত্মহত্যার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। গলায় ফাঁস লাগিয়ে, বিষপানে, চলন্ত ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিয়ে, ঘুমের বড়ি খেয়ে, শরীরে আগুন লাগিয়ে এবং নদীতে ঝাঁপিয়ে আত্মহত্যা করছে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশারর মানুষ। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে পরিবার, সমাজ, এমনকি রাষ্ট্রেও। বিভিন্ন বয়সের নারী-পুরুষ থেকে তরুণ এমনকি শিশুও আত্মহত্যা করছে।
ন্যাশনাল সার্ভে এবং জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য সংস্থ্যার জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে গত সাত বছরে ৭৩ হাজার ৩শ ৮৯ মানুষ আত্মহত্যা করেছে। ২০১৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে আত্মহত্যার সংখ্যা মোট ৬৫ লাখ। অর্থাৎ, মোট জনসংখ্যার ৪ দশমিক ৬ শতাংশ আত্মহত্যায় মারা গেছে।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. হেলালউদ্দিন জানান, দেশে ১৫ থেকে ৩০ বছর বয়সী মানুষের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। প্রতি লাখে ৭ দশমিক ৮ জন আত্মহত্যায় মারা যায়। আত্মহত্যাকারীদের প্রায় ৭৮ শতাংশ নারী। পারিবারিক অশান্তি, মানসিক সমস্যা, হতাশা, বেকারত্ব, প্রেম, পরকীয়া ও মাদকাসক্তির কারণেই বেশি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে।
তিনি আরও বলেন, আত্মহত্যা প্রতিরোধে সরকারি পর্যায়ে কোনো জনসচেতনতামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। আত্মহত্যা প্রতিরোধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। এ ছাড়া সামাজিক বন্ধনকে দৃঢ় করতে হবে।
হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিক্যাল কলেজের মনরোগবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. ফারজানা রহমান বলেন, অতিমাত্রায় বিষণ্ণতায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা আত্মহত্যার দিকে ধাবিত হন। নারী ও তরুণ প্রজন্ম সবচেয়ে বেশি আত্মহত্যার ঝুঁকিতে রয়েছে। তরুণ-তরুণীরা তাৎক্ষণিক আবেগতাড়িত হয়ে আত্মহত্যা করে। এ ধরনের প্রবণতা কারও মধ্যে দেখা দিলে দেরি না করে যতো দ্রুত সম্ভব মনোরোগ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে আত্মহত্যার ঘটনাগুলোতে পারিবারিক ও সামাজিক অশান্তির চিত্রই দেখা যায়। আকাশ সংস্কৃতির প্রভাবে দাম্পত্য কলহ ও আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে। এসব প্রতিরোধে দরকার সামাজিক সচেতনতা।’
গত বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর রাজধানীর উত্তরায় সাংবাদিক আলিমুল হক টিপু ও জয়শ্রী জামান দম্পতির দুই সন্তান একইসঙ্গে গলায় ফাঁস দেয়। ইংরেজি মাধ্যমের নবম শ্রেণির ছাত্র মুহাম্মদ বিন আলিম ও ও লেবেলের ছাত্রী চিরশ্রী জামান মুনমুন তাদের লেখার খাতায় ‘দ্য ডিপারচার’ নামে সুইডেনের একটি ব্যান্ড দলের গান লিখে যায়।
মা-বাবার দূরত্ব তাদের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলেছিল। সেই দুই সন্তানদের হারিয়ে আত্মহত্যা প্রতিরোধে সক্রিয় হয়ে উঠেছেন তাদের মা জয়শ্রী জামান। সচেতনতার জন্য ‘ব্রাইটার টুমরো’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন তিনি। জয়শ্যী জামান বলেন, ‘বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস পালন করলেও আমাদের দেশে এ দিবস পালন করা হয় না। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলাদেশেও এ দিবস পালন করা উচিৎ।’
তিনি জানান, আগামী ২০২০ সাল নাগাদ প্রতি বছর সাড়ে ১৫ লাখ মানুষ আত্মহত্যা করবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। আর আত্মহত্যার চেষ্টা করবে এর চেয়েও ১০ থেকে ২০ গুণ বেশি মানুষ। তাই সচেতনতা জন্য আজ জাতীয় প্রেসক্লাবে আলোচনা সভা, মানববন্ধন ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে ব্রাইটার টুমরো।
এদিকে ‘ইন্দ্রীয়’ নামে আরেকটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন দিবসটি উপলক্ষে নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। বৃহস্পতিবার সকালে ঢাকা শহরে সাইকেল ও মোটর সাইকেল র্যালী এবং প্রচারপত্র বিতরণ করা হয়। প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধনও করে আয়োজকরা।

