নিজস্ব প্রতিবেদক : দেশে নিরক্ষতা ও সাক্ষরতার হার নিয়ে বিভ্রান্তি চরমে। ২০১৪ সালের মধ্যে দেশ নিরক্ষরমুক্ত করার ঘোষণা দিয়েও ব্যর্থ হয়েছে সরকার। এরপর বিষয়টি পুরোপুরি ছেড়ে দেয়া হয় প্রকল্পের উপর। অথচ দেড় বছর আগে হাতে নেওয়া প্রকল্পের কাজ এখনো শুরু হয়নি। এ অবস্থায় দেশে নিরক্ষরতা দূরীকরণ আন্দোলনে গোঁজামিল অবস্থা বিরাজ করছে।
ডেডলাইন নির্দিষ্ট করে একবার সরকার বলছে, কয়েক বছরের মধ্যে দেশ নিরক্ষরমুক্ত করা হবে। আবার ডেডলাইনে ব্যর্থ হচ্ছে। সরকারের দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানগুলো একেকবার একেক ধরনের তথ্য দিচ্ছে। গত কয়েক বছর ভিন্ন ভিন্ন সাক্ষরতা হারের পরিসংখ্যান পাওয়া গেছে। আবার সরকারের হিসেবের সাথে বেসরকারি হিসেবে অনেক ফারাক থেকে যাচ্ছে। সব মিলিয়ে নিরক্ষতা দূরীকরণ আন্দোলনের ধোঁয়াশার মধ্যে রয়েছে।
এমনকি ষষ্ঠ এবং সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাতেও নিরক্ষরতা দূরীকরণের বিষয়টির উল্লেখ রয়েছে। তাতেও ব্যর্থ হচ্ছে সরকার। এই অবস্থায় আজ পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস। এবছর দিবসটির প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘সাক্ষরতা আর দক্ষতা, টেকসই সমাজের মূলকথা’। দিবসটি উপলক্ষে ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আলোচনা সভা, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শোভাযাত্রাসহ বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে।
২০০৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে আওয়ামী লীগ ২০১৪ সালের মধ্যে শতভাগ সাক্ষরতা অর্জনের ঘোষণা করেছিল। শিক্ষানীতি ২০১০ এবং সরকারের ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাতেও এ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হয়।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা বিষয়ক মন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান ফিজার গতবছর আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, ‘বর্তমানে সাক্ষরতার হার ৬৫ থেকে ৬৭ শতাংশ।’ যদিও তখন মন্ত্রণালয়ের সচিব কাজী আখতার হোসেন সংবাদ সম্মেলনে ভিন্ন তথ্য উপস্থাপন করেন। তিনি দাবি করেন, ‘দেশে সাক্ষরতার হার ৭০ শতাংশ।’ তিনি দাবি করেন, ‘বিভিন্ন সংস্থার করা হিসেবের চেয়ে দেশে বেশি হবে সাক্ষরতার হার। দেশে আড়াই কোটি মানুষ নিরক্ষর বলে আমাদের কাছে তথ্য রয়েছে।’
কিন্তু ২০১৩ সালের ৫ সেপ্টেম্বর তৎকালীন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা বিষয়ক মন্ত্রী আফসারুল আমীন বলেছিলেন, সাক্ষরতার হার ৭১ শতাংশ। অর্থ্যাৎ মন্ত্রীদের তথ্যানুসারে, সাক্ষরতার বেশি থেকে কমেছে। আবার চলতি বছরের সাক্ষরতা দিবস আয়োজন উপলক্ষে রোববার এক সংবাদ সম্মেলনে বর্তমান মন্ত্রী বলেন, ‘সাক্ষরতার হার ৭১ শতাংশ।’
অথচ ইউএনডিডির মানব উন্নয়ন সূচক ২০১৪ এর তালিকায় বাংলাদেশে ১৫ বছরোর্ধ্ব শিক্ষিত মানুষের হার ৫৭ দশমিক ৭ শতাংশ।
২০১৪ সালের পরিসংখ্যানে দেখানো হয়েছিল, দেশের ১৫ কোটি ৬৯ লাখ মানুষের মধ্যে নিরক্ষর ৫ কোটি ৫০ লাখ। নিরক্ষর মানুষের হার ৩৫ শতাংশ। সর্বশেষ সরকারি হিসাবে, দেশে এখনো ১৫ থেকে ৪৫ বছর বয়সী ৩ কোটি ৭৩ লাখ মানুষ নিরক্ষর। কিন্তু বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, দেশে সাক্ষরতার হার এখন ৬১ শতাংশ। অর্থাৎ ৩৯ শতাংশ নিরক্ষর। চিত্রটা এমন হলেও এই মুহূর্তে নিরক্ষরতা দূরীকরণে দেশে কোনো কার্যক্রম নেই। দেড় বছর আগে একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হলেও সেটির বাস্তবায়ন শুরু হয়নি।
জানা গেছে, ১৯৯১ সাল থেকে প্রতিটি সরকারই শিক্ষা খাতকে গুরুত্ব দিয়ে আসছে এবং বাজেটে বড় ধরণের বরাদ্দ দিয়েছে। কিন্তু কোনও সরকারই নিরক্ষরতা দূরীকরণে তাদের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারেনি। যদিও প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা নিরক্ষরতা দূরীকরণে সরকারের ব্যর্থতার পেছনে বাজেটে কম বরাদ্দ দেওয়ার পাশাপাশি প্রকল্প বাস্তবায়নে নিম্নমানের পরিকল্পনাকে দায়ী করেন।
নিরক্ষরতা দূরীকরণের জন্য ১৯৯১-২০১৪ পর্যন্ত বিভিন্ন সরকার বেশ কিছু প্রকল্প গ্রহণ করেছে। ব্যয় হয়েছে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে একহাজার কোটি টাকা সরকার দিয়েছে। বাকি অর্থ এসেছে বিদেশি সহযোগিতা থেকে।
মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানান, দুর্নীতি এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রকল্পগুলোতে অব্যবস্থাপনার কারণে বিদেশি দাতারা এখন আর অর্থ দিতে আগ্রহী নয়। কর্মকর্তারা আরও বলেন, প্রাথমিক শিক্ষায় সরকারের প্রধান মনোযোগ থাকার ফলে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা অনেকাংশে উপেক্ষিত। ফলে প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হচ্ছে না।
উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো সূত্র জানা গেছে, দেশের ৪৫ লাখ নিরক্ষরমুক্ত করে তোলার জন্য সরকার একটি প্রকল্প হাতে নেয়। প্রকল্প অনুযায়ী ২৫০টি উপজেলার প্রতিটিতে ১৮ হাজার নিরক্ষরকে সাক্ষরতার পাশাপাশি এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জীবন দক্ষতাভিত্তিক প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথা। প্রশিক্ষণকেন্দ্র গড়ে তুলে ছয় মাসের কোর্সে সাক্ষরতা দেওয়ার কথা। প্রতি প্রশিক্ষণকেন্দ্রে ৩০ জন পুরুষ ও ৩০ জন নারী থাকবেন। নারী-পুরুষের জন্য আলাদা পালা করে কোর্সটি চলবে।
সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে ৪৫২ কোটি টাকা ব্যয়ে মৌলিক সাক্ষরতা প্রকল্পটি ২০১৪ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদন পায়। ৬৪টি জেলার ২৫০টি উপজেলায় প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কথা থাকলেও এই প্রকল্পের বাস্তবায়ন শুরু করতে পারছে না উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো। অথচটি প্রকল্প শেষ হবে ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে।
এদিকে শিক্ষার প্রচারকাজে নিয়োজিত এবং পর্যবেক্ষকরা জানান, প্রাপ্ত বয়স্কদের শিক্ষা এবং উপানুষ্ঠানিক কর্মসূচি দ্রুত এগোনো যাচ্ছে না নিম্মমানের পরিকল্পনা এবং প্রকল্পের কারণে। ক্যাম্পেইন ফর পপুলার এডুকেশন সংস্থার ডেপুটি পরিচালক কেএম এনামুল হক বলেন, ‘২০০২ সালে সরকার উপানুষ্ঠানিক শিক্ষার জন্য দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প গ্রহণ না করায় সাক্ষরতার হার দ্রুত বৃদ্ধি করা যাচ্ছে না। ২০০২ সালের এ ধরণের প্রকল্প নিলে বর্তমানে নিরক্ষরতার আরও কম থাকতো। সরকার প্রকল্প বাস্তবায়ন পদ্ধতি পরিবর্তন না করা ও দাতাদের সহযোগিতা কমে আসায় কর্মসূচি খুব ধীর গতিতে আগাচ্ছে।’
সাক্ষরতার লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোকে শক্তিশালী এবং সার্বিক শিক্ষা আন্দোলন প্রক্রিয়াকে ছড়িতে দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
প্রসঙ্গত, বিশ্ব থেকে নিরক্ষরতা দূরীকরণের লক্ষ্যকে সামনে রেখে ১৯৬৫ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কো থেকে ৮ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। প্রতিবছর আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবসে নানা কর্মসূচি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা হয়।
ইউনেস্কোর মতে, সাক্ষরতা হচ্ছে মাতৃভাষায় পড়ে বুঝতে পারা। লেখার মাধ্যমে তা প্রকাশ করতে এবং দৈনন্দিন গৃহস্থালীর আয়-ব্যয়ের হিসাব রাখতে পারা।

