খুলনা প্রতিনিধি : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আশা ব্যাঞ্জক ঘোষণার পর এবার জাহাজ রপ্তানির হাতছানি দিচ্ছে খুলনা শিপইয়ার্ড।
তিনি বলেছেন, “বিভিন্ন দেশ থেকে খুলনা শিপইয়ার্ডের ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করে জাহাজ নেওয়ার ব্যাপারে যোগাযোগ করছে। এ প্রেক্ষিতে খুলনা শিপইয়ার্ড তার উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধিকরণের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।
‘মংলার জয়মনির গোলে শিপইয়ার্ডের স্থাবর সম্পত্তিকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশে জাহাজ নির্মাণ শিল্পকে আরো সম্প্রসারণ করে ভবিষ্যতে এ শিপইয়ার্ড থেকে জাহাজ তৈরি করে বিদেশে রপ্তানি করা হবে।
‘দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশের বাজারে প্রতিষ্ঠানটি তার সুনাম ছড়ানোর প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে। খুলনা শিপইয়ার্ড আধুনিক কনটেইনার বাহী জাহাজ তৈরির পাশাপাশি যুদ্ধজাহাজও তৈরি করছে।”
খুলনা শিপইয়ার্ড সূত্রে জানা যায়, ২০১৩ সালে পাঁচটি ছোট যুদ্ধজাহাজ (পেট্রোল ক্রাফট) তৈরি করে দেশের জাহাজ নির্মাণ শিল্পে নতুন অধ্যায় শুরু করেছিল প্রতিষ্ঠানটি। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই এবার বড় আকারের অত্যাধুনিক দু’টি যুদ্ধ জাহাজ নির্মাণ কাজ শুরু করেছে তারা। সশস্ত্র বাহিনীতে এগুলো লার্জ পেট্রোল ক্রাফট বা এলপিসি নামে পরিচিত। চীনের যুদ্ধজাহাজ বিশেষজ্ঞরা এতে প্রযুক্তিগত সহযোগিতা দিচ্ছেন।
সূত্র আরো জানায়, ১৯৯৯ সালের ৩ অক্টোবর তৎকালীন ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অলাভজনক, রুগ্ন ও ৯৩ কোটি ৩৭ লাখ টাকা দেনায় আক্রান্ত এ শিপইয়ার্ড পরিচালনার দায়িত্বভার হস্তান্তর করেন বাংলাদেশ নৌবাহিনীর হাতে। সে আস্থা ও বিশ্বাসের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করে বাংলাদেশ নৌবাহিনী গুরুত্বপূর্ণ এ ইয়ার্ডের হৃত গৌরব পূণরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে। বর্তমানে এ ইয়ার্ড আধুনিক কনটেইনার বাহী জাহাজ তৈরির পাশাপাশি তৈরি করছে যুদ্ধজাহাজও।
প্রতিষ্ঠানটির সদ্য বিদায়ী ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ ইরশাদ আহমেদ বলেন, “২০১১ সালের ৫ মার্চ প্রধানমন্ত্রী খুলনা শিপইয়ার্ডেই সর্ব প্রথম দেশের মাটিতে পাঁচটি যুদ্ধ জাহাজ তথা পেট্রোল ক্রাফট নির্মাণের কিল লেইং করেছিলেন। খুলনা শিপইয়ার্ড অত্যন্ত সফলভাবে ২০১৩ সালের মধ্যে সেই পাঁচটি পেট্রোল ক্রাফট নির্মাণ করে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করে।
‘এ সাফল্যের ধারাবাহিকতা এবং প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় খুলনা শিপইয়ার্ড এবার নির্মাণ করতে যাচ্ছে আরো বড় আকারের অত্যাধুনিক যুদ্ধ জাহাজ তথা লার্জ পেট্রোল ক্রাফট (এলপিকে)। আর্থিক দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশ শিপ বিল্ডিংয়ের ইতিহাসে এটিই সবচেয়ে বড় প্রকল্প। এর মাধ্যমে জাহাজ নির্মাণ শিল্পে নতুন এক অধ্যায়ে প্রবেশ করবে বাংলাদেশ।”
এদিকে, রোববার প্রধানমন্ত্রী অত্যাধুনিক যুদ্ধ জাহাজ নির্মাণ কাজের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বলেন, ‘নিরবচ্ছিন্ন খুলনা শিপইয়ার্ড মাঝারি ও বৃহৎ সমুদ্রগামী জাহাজসহ নৌবাহিনীর জন্য ছোট বড় নৌযান তৈরি ও মেরামত অব্যাহত রেখেছে। খুলনা শিপইয়ার্ড এক সময় দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিপইয়ার্ডে পরিণত হবে।’
তিনি বলেন, ‘আমরা বিশ্ব বাজারে জাহাজ নির্মাণের ক্রমবর্ধমান চাহিদা কাজে লাগানোর সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে শুরু করেছি। বিভিন্ন দেশ থেকে খুলনা শিপইয়ার্ডের ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করে যোগাযোগ করছে।’
এক সময়ের রুগ্ন শিপইয়ার্ড ঘুরে দাঁড়ানোয় তিনি এ প্রতিষ্ঠানটিকে ‘গর্ব ও কর্মোদ্দীপনার প্রতীক’ বলে উল্লেখ করেন।
উল্লেখ্য, জাহাজ নির্মাণের জন্য ২০১৪ সালের ৩০ জুন নৌবাহিনীর সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন করে খুলনা শিপইয়ার্ড। প্রতিটি জাহাজের নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা।
একই ধরনের দুটি এলপিসি চীন থেকে তৈরি করতে খরচ হচ্ছে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা। লার্জ পেট্রোল ক্রাফট প্রতিটির দৈর্ঘ্য ৬৪ দশমিক ২ মিটার এবং প্রস্থ ৯ মিটার। এর গভীরতা হবে ৪ মিটার।
সমুদ্রপথে ঘন্টায় ২৫ নটিক্যাল মাইল বেগে চলবে। জাহাজে এক সঙ্গে ৭০ জন নাবিক থাকতে পারবেন। চীনের যুদ্ধজাহাজ বিশেষজ্ঞরা এতে প্রযুক্তিগত সহযোগিতা দিচ্ছেন।
লার্জ পেট্রোল ক্রাফট হলেও এগুলোতে করভেটের (আরো বড় আকৃতির যুদ্ধজাহাজ) অধিকাংশ সুবিধা থাকবে। থাকবে স্বয়ংক্রিয় মিসাইলসহ অত্যাধুনিক সব যুদ্ধাস্ত্র। আরো থাকবে একটি মাল্টি রোল গান, একটি সিঙ্গেল ব্যারেল গান, দুটি ট্রিপল টুবার টর্পেডো লাঞ্চার, দুটি নেভিগেশন রাডার, একটি এয়ার অ্যান্ড সারফেস সার্চ রাডার, একটি ট্রাকিং রাডার এবং একটি হাল মাউন্টেড সোলার।
এগুলো শত্রুপক্ষের সাবমেরিন সনাক্ত এবং তার ওপর আক্রমণ করতে সক্ষম। এটি দিয়ে সমুদ্র উপকূলীয় এলাকায় টহলও দেওয়া যাবে। যুদ্ধ জাহাজের প্লেট, ইঞ্জিনসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম বিদেশ থেকে আমদানি করা হবে। শিপইয়ার্ডের ২৫০ জন শ্রমিক ও প্রকৌশলী জাহাজ নির্মাণ কাজে অংশ নিচ্ছেন। দুই বছরের মধ্যে যুদ্ধ জাহাজের নির্মাণ কাজ শেষ হবে বলে জানিয়েছে শিপইয়ার্ডের সূত্রটি।

