নিজস্ব প্রতিবেদক : লাতিন আমেরিকার দেশ পেরুর রাজধানী লিমায় রেন্ট-এ কারের প্রাইভেটকার চালান জেইম বার্ডলেস গোমেজ। সম্প্রতি তার গাড়িতে ওঠেন মার্কো নামে আরেক লিমার বাসিন্দা। ভাব জমিয়ে জেইমকে কোকেন পাচারের প্রস্তাব দেন যাত্রী মার্কো। বলেন, একটি প্যাকেট বাংলাদেশে পৌঁছে দিতে পারলেই মিলবে ১০ হাজার মার্কিন (ইউএস) ডলার। টাকা পেলে ভাড়ায় গাড়ি না চালিয়ে নিজেই একটি গাড়ি কিনতে পারবেন জেইম। মার্কোর এই প্রস্তাবে রাজি হয়ে যান তিনি। কোকেনের প্যাকেট ধরিয়ে দিয়ে বাংলাদেশের একটি হোটেলে জেইমের থাকার জন্য বুকিংও দিয়ে দেয় মার্কো। বলে দেয়, তিন দিন পর দক্ষিণ আফিক্রকার নাগরিক জোসেফ এসে তার কাছ থেকে কোকেনের চালানটি নিয়ে যাবে। আর তখনই জেইমের হাতে কাঙ্ক্ষিত ১০ হাজার ইউএস ডলার দেবে জোসেফ।
এমন পরিকল্পনায় অর্থের লোভেই দুই কেজি ৩০০ গ্রাম হেরোইনের চালান নিয়ে বাংলাদেশে এসেছেন জেইম বার্ডলেস গোমেজ। বৃহস্পতিবার মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদে পেরুর এই নাগরিক ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন অকপটে। তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, দোভাষীর মাধ্যমে জেইম কোকেন চালানটির ব্যাপারে বিস্তারিত জানিয়েছেন। তবে তিনি নিজেকে নিরপরাধ বলে দাবি করেছেন। দু-একদিনের মধ্যে জেইম আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে পারে বলেও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে জেইমের সঙ্গে গ্রেপ্তার হওয়া বাংলাদেশের সিভিল এভিয়েশনের দুই কর্মী জিজ্ঞাসাবাদে দাবি করেছেন, তারা কোকেন চালানের সঙ্গে জড়িত নন। দু’জন জেইমের ভিসা সংক্রান্ত কাজে সহায়তা করেছিলেন। জেইমও একই তথ্য দিয়েছেন।
গত মঙ্গলবার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে প্রায় ৬০ কোটি টাকা মূল্যের দুই কেজি ৩০০ গ্রাম কোনেন পাউডারসহ জেইমকে গ্রেপ্তার করে ডিএনসির কর্মকর্তারা। একই সময় গ্রেপ্তার করা হয় সিভিল এভিয়েশন কর্মী সালাউদ্দিন ও আবদুল সালামকে। বুধবার আদালতের নির্দেশে তাদের তিনজনকে তিন দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছে তদন্তকারীরা।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা, ডিএনসির পরিদর্শক মোফাজ্জল হোসেন বলেন, ‘জেইম ইংরেজি জানেন না বলে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা যায়নি। বৃহস্পতিবার দোভাষীর মাধ্যমে তার সঙ্গে কথা বলেছি আমরা। সে পেরুর লিমা থেকে মার্কো নামে একজনের কাছ থেকে কোকেনের চালানটি নিয়ে আসার কথা স্বীকার করছে। আরও কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। এসব নিয়ে আমরা কাজ করছি।’
জানতে চাইলে এই তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, ‘সালাউদ্দিন ও সালাম চালানের সঙ্গে জড়িত নয় বলে দাবি করেছে। তারা জেইমের ভিসার ব্যাপারে সহায়তা করেছে। এই সতত্য যাচাই করে দেখা হচ্ছে।’
ডিএনসি সূত্র জানায়, পেরুর রাজধানীর লিমায় বসবাস করেন জেইম। তিনি ওই শহরে রেন্ট-এ কার থেকে ভাড়া নিয়ে প্রাইভেটকার চালান। সম্প্রতি তার গাড়িতে যাত্রী হয়েছিলেন মার্কো নামের এক কোকেন পাচারকারী। তিনি জেইমকে ১০ হাজার ইউএস ডলারের প্রলোভন দেখিয়ে বাংলাদেশে কোকেনের চালানটি নিয়ে আসতে বলেন। তদন্তকারীদের জিজ্ঞাসাবাদে জেইম জানিয়েছেন, বাংলাদেশে চালানটি পৌঁছে দিলে দক্ষিণ আফ্রিকার নাগরিক জোসেফ তাকে ওই অর্থ দেবে বলে জানিয়েছিল মার্কো। তবে বাংলাদেশ, কোকেনের রুট, এমনকি জোসেফকেও চিনেন না বলে দাবি জেইমের। কোকেনটি কোন দেশে যেতো তাও জানা ছিল না তার। জেইমের দাবি, তিনি এর আগে কখনো কোকেনের চালান বহন করেননি। তিনি মার্কোর নির্দেশনায় কাজ করেছেন। তিনি ৪০ ইউএস ডলার খরচ করে পেরু থেকে প্রথমে বলিভিয়ায় যান। সেখান থেকে একই খরচে বাসে চেপে যান ব্রাজিলে। বাসে দুই দেশ ভ্রমণের এই অর্থ মার্কো-ই তাকে দেয়। ব্রাজিল থেকে বিমানে দুবাই এবং সেখান থেকে ঢাকায় আসেন জেইম। এই দুই বিমানের টিকিট অনলাইনের মাধ্যমে জেইমকে সংগ্রহ করে দেয় মার্কো। জেইমের দাবি, মার্কোই ঢাকার নয়াপল্টনে হোটেল ভিক্টোরিয়ার একটি রুম অনলাইনের মাধ্যমে তার জন্য বুকিং দেয়। সেখানে অবস্থানের সময় তিন দিন পর দক্ষিণ আফ্রিকার নাগরিক জোসেফ বাংলাদেশে আসার কথা ছিল। তখন সে কোকেনের প্যাকেটটি নিয়ে যাবে এবং জেইমকে ১০ হাজার ইউএস ডলার দেবে। বিমানবন্দরে গ্রেপ্তার হওয়ায় সব পরিকল্পনা ভেস্তে গেছে বলে জিজ্ঞাসাবাদে জানান জেইম। আজ শুক্রবার তৃতীয় দিনের জিজ্ঞাসাবাদে জেইমের কাছ থেকে আরও তথ্য নেয়ার চেষ্টা করা হবে বলে জানান তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।

