অর্থনৈতিক প্রতিবেদক : ব্যাংক ঋণের গড় সুদহার বা স্প্রেড ৫ শতাংশের নিচে থাকলেও ২১টি ব্যাংকের স্প্রেড এখনো রয়েছে সীমা-অতিরিক্ত। যেসব ব্যাংকগুলোকে বারবার স্প্রেড ৫ শতাংশের নীচে নামিয়ে আনতে নির্দেশনা দেয়া হলেও তা তারা মানছে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা যায়।
জানা যায়, বিনিয়োগ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে প্রধান প্রতিবন্ধকতা ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহার। সেই বাধা ক্রমেই শিথিল হচ্ছে। সর্বশেষ জুলাই মাসে ঋণের ক্ষেত্রে সুদহার কমে দাঁড়িয়েছে ১১ দশমিক ৫৭ শতাংশ। আগের মাসেও যা ছিল ১১ দশমিক ৬৭ শতাংশ। সুদহারে নিম্নমুখী প্রবণতা ঋণ আমানত ও সুদহারের ব্যবধান (স্প্রেড) আরও কমেছে। জুলাই মাস শেষে ঋণ ও আমনতের গড় সুদহার ৪ দশমিক ৭৯ শতাংশ দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে ঋণের সুদহার ‘সিঙ্গেল ডিজিটে’ নামিয়ে আনার দাবি জানিয়ে আসছেন ব্যবসায়ীরা। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো ঋণের সুদহার আরও কমানোর লক্ষ্যে আমানতের বিপরীতে সুদহার কমিয়েছে। কিন্তু বেসরকারি ও বিদেশি ব্যাংকগুলো ঋণ-আমানতের সুদহার কমাতে পারছে না। যদিও এই হার ৫ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কঠোর নির্দেশনা রয়েছে।
গত কয়েক মাস ধরে আমানত ও ঋণ উভয় ক্ষেত্রে সুদ হার কমছে। ফলে গত মার্চে আমানত ও ঋণের সুদ হারের ব্যবধান (স্প্রেড) রেকর্ড পরিমাণ কমে ৫ শতাংশীয় পয়েন্টের নিচে নেমে এসে দাঁড়ায় ৪ দশমিক ৮৭ পয়েন্টে। গত এপ্রিলে স্প্রেড আরও কমে ৪ দশমিক ৮৮ শতাংশীয় পয়েন্টে নেমে এসেছে। মে মাসে স্প্রেড আরও কমে ৪ দশমিক ৮৩ শতাংশীয় পয়েন্টে নেমে আসে। তবে জুন মাস শেষে স্প্রেড একটু বেড়ে দাঁড়ায় ৪ দশমিক ৮৭ শতাংশ। জুলাই মাস শেষে স্প্রেড কমে আসে ৪ দশমিক ৭৯ শতাংশে। এটি বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রদর্শিত তথ্যের মধ্যে ২০১৩ সালের পরে সর্বনিম্ন। এর আগে স্প্রেড ৫ শতাংশের নিচে ছিল ২০১৩ সালের এপ্রিলে ৪ দশমিক ৯৯, মে ৪ দশমিক ৯৮ এবং ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে ৪ দশমিক ৯৯ শতাংশীয় পয়েন্ট।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত জুলাই মাসে রাষ্ট্রায়ত্ত্ব ব্যাংকগুলো ঋণের ক্ষেত্রে ১০ দশমিক ৩১ শতাংশ হারে সুদ আদায় করেছে। আমানতের বিপরীতে দিয়েছে ৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ সুদ। স্প্রেড দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৬৪ শতাংশীয় পয়েন্ট। বিশেষায়িত ব্যাংকের স্প্রেড সবচেয়ে কম মাত্র ১ দশমিক ৯৫ শতাংশীয় পয়েন্ট। আমানতের বিপরীতে দিয়েছে ৭ দশমিক ৮৬ শতাংশ সুদ। এই খাতের ব্যাংকগুলোর ঋণের ক্ষেত্রে ভারিত গড় সুদহার ৯ দশমিক ৭১ শতাংশ দাঁড়িয়েছে। তবে বিদেশি ও বেসরকারি ব্যাংকগুলো স্প্রেড এখনো ৫ শতাংশীয় পয়েন্টের উপরে রয়েছে। বিদেশি ব্যাংকগুলো আমানতের বিপরীতে ৩ দশমিক ০২ শতাংশ সুদ দিয়ে ঋণের বিপরীত আদায় করছে ১০ দশমিক ৭৯ শতাংশ সুদ। এ খাতের ব্যাংকগুলোর স্প্রেড সবচেয়ে বেশি ৭ দশমিক ৭৭ শতাংশীয় পয়েন্ট।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঋণের সুদের হার কমানোর বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা মানছে না ২১ বাণিজ্যিক ব্যাংক। এর মধ্যে ১৬টিই বেসরকারি ও ৫টি বিদেশি ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণের সুদের হার কমাতে ঋণ ও আমানতের সুদের হারের ব্যবধান (স্প্রেড) ৫ শতাংশের মধ্যে রাখার নির্দেশ রয়েছে। যেসব ব্যাংকে বেশি ব্যবধান রয়েছে তাদেরকে নামিয়ে আনার জন্য একাধিকবার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য মতে, সবচেয়ে বেশি স্প্রেড রয়েছে বিদেশি খাতের স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের। ব্যাংকটির স্প্রেড ৯ দশমিক ৯৪ শতাংশ। এরপরে রয়েছে বেসরকারি খাতের ব্র্যাক ব্যাংকের। ব্যাংকটির স্প্রেড ৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ। প্রতিষ্ঠানটির ঋণের একটি বড় অংশই হচ্ছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা (এসএমই) খাতের। এই খাতের ঋণের সুদের হার বেশি। এছাড়া তাদের ভোক্তা ঋণের সুদের হারও বেশি। যে কারণে তাদের ঋণের গড় সুদের হার বেশি। এদিকে তারা আমানতের বিপরীতে খুব কম সুদ দেয়। যে কারণে তাদের স্প্রেড বেশি। ঋণ ও আমানতের সুদের হারের ব্যবধানের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অবস্থানে রয়েছে বেসরকারি খাতের ডাচ্ বাংলা ব্যাংক। তাদের এই ব্যবধান ৭ দশমিক ৫১ শতাংশ। এই ব্যাংকটিও খুব কম সুদে আমানত সংগ্রহ করে। আবার ঋণের সুদের হার বেশি। যে কারণে তাদের স্প্রেডও বেশি। তৃতীয় অবস্থানে থাকা ওয়ান ব্যাংকের স্প্রেড ৬ দশমিক ৩৪ শতাংশ। চতুর্থ অবস্থানে থাকা উত্তরা ব্যাংকের স্প্রেড ৬ দশমিক ৭ শতাংশ। পঞ্চম অবস্থানে থাকা এবি ব্যাংকের স্প্রেড ৫ দশমিক ৪৭ শতাংশ।
অন্য ব্যাংকগুলোর মধ্যে ব্যাংক এশিয়ার স্প্রেড ৫ দশমিক ৪৬ শতাংশ, আইএফআইসি ব্যাংকের ৫ দশমিক ২৮ শতাংশ, প্রাইম ব্যাংকের ৫ দশমিক ১৮ শতাংশ, যমুনা ব্যাংকের ৫ দশমিক ১২ শতাংশ, পূবালী ব্যাংকের ৫ দশমিক ৭ শতাংশ, দি সিটি ব্যাংকের ৫ দশমিক ৬ শতাংশ, এক্সিম ব্যাংকের ৫ দশমিক ২ শতাংশ, ঢাকা ব্যাংকের ৫ দশমিক ১ শতাংশ। নতুন ব্যাংকগুলোর মধ্যে ইউনিয়ন ব্যাংকের স্প্রেড সবচেয়ে বেশি। এ ব্যাংকের স্প্রেড ৫ দশমিক ৪৬ শতাংশ, মিডল্যান্ড ব্যাংকের ৫ দশমিক ২৪ শতাংশ, মেঘনা ব্যাংকের ৫ দশমিক ১৮ শতাংশ। নির্দিষ্ট পরিমাণ জমার অজুহাত দেখিয়ে বিদেশি ব্যাংকগুলো সঞ্চয়ী হিসাবে সুদ দেয় না। এছাড়া নির্ধারিত ছকের বাইরে টাকা তোলার কারণেও সুদ দেয় না। এসব কারণে বিদেশি ব্যাংক থেকে গ্রাহকরা সঞ্চয়ী হিসাবের বিপরীতে কোনো সুদ পায় না। বিদেশি ব্যাংকগুলোর মধ্যে বর্তমানে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের স্প্রেড ৯ দশমিক ৯৪ শতাংশ, সিটি ব্যাংক এন, এ‘র ৭ দশমিক ৮৩ শতাংশ, উড়ি ব্যাংকের ৭ দশমিক ৯৯ শতাংশ, কমার্শিয়াল ব্যাংক অব সিলনের ৭ দশমিক ৯৯ শতাংশ ও এইচএসবিসি ব্যাংকের ৬ দশমিক ৮৯ শতাংশ স্প্রেড রয়েছে।

