নিজস্ব প্রতিবেদক : টানা দুইদিনের বৃষ্টির পর বুধবারের গুড়িগুড়ি বৃষ্টিতে স্থায়ী জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে রাজধানী ঢাকার সড়কগুলোতে। জমে থাকা পানির কারণে যানবাহনগুলোকে চলতে হচ্ছে ধীর গতিতে। আবার কোনো কোনো এলাকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়েও ট্রাফিক সিগন্যাল অতিক্রম করা যাচ্ছে না। ভয়াবহ এ দুর্ভোগ ও জলাবদ্ধতার জন্য ঢাকা ওয়াসা ও দুই সিটি করপোরেশনকেই দায়ী করেছেন নগরপরিকল্পনাবিদ ও নগরবাসীরা।
বুধবার দুপুর পর্যন্ত ঢাকার রাজপথে গতকাল মঙ্গলবারের মতো ভয়াবহ অচলাবস্থা আর তীব্র যানজটের কারণে অসহনীয় অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।
রাজধানীর ধানমন্ডি, আজিমপুর, মোহাম্মদপুর, নতুনবাজার, গুলশান, বনানী, বারিধারা, উত্তরা, রামপুরা, বাড্ডা, গ্রিন রোড, ফার্মগেইট, বিজয় সরণী, খিলক্ষেত, মালিবাগ, শান্তিনগর, মগবাজার, কাকরাইল, ফকিরাপুল, আরামবাগ, রাজারবাগ, গুলিস্তান, দিলকুশা, বংশাল, দৈনিক বাংলা, নয়াপল্টন, পুরানা পল্টন, মোহাম্মদপুর, পান্থপথ, শেরেবাংলা নগর, শেওড়াপাড়া, রামপুরা, পরীবাগ, মিরপুরের গোলচত্বর, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, শুক্রাবাদ, রূপনগর, যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ, মীরহাজিরবাগসহ অনেক এলাকার রাস্তাঘাট তলিয়ে গেছে।
এসব রাস্তায় জমে থাকা পানির সঙ্গে কাদামাটি যুক্ত হয়ে সৃষ্টি হয়েছে এক ভয়াবহ পরিস্থিতি। গাড়ির চাকার সঙ্গে কাদামাটি ছিটকে গিয়ে পড়ে ফুটপাতে চলাচলকরা মানুষের গায়ে।
মঙ্গলবারের মতো বুধবার সকালে ফকিরাপুল এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে সড়কে গাড়ির দীর্ঘ লাইন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়েও একটি ট্রাফিক সিগন্যাল অতিক্রম করতে পারছেন কেউ। পরে বাধ্য হয়েই অনেকেই হেঁটে গন্তব্যে পৌঁছতে হচ্ছে।
নগরীর পানি নিষ্কাশনের অব্যবস্থাপনার কারণে রাজধানীর সেন্ট্রাল পুলিশ হাসপাতাল থেকে রাজারবাগ হয়ে শান্তিনগর পর্যন্ত পুরো এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। ফলে পল্টন মোড় থেকে কাকরাইল হয়ে শান্তিনগর, মালিবাগ মৌচাক, মগবাজার ও সাতরাস্তা হয়ে মহাখালী পর্যন্ত পুরো রাস্তায় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়েছে।
এর মধ্যে শান্তিনগর মোড়ে প্রায় কোমর পানি। রাস্তায় ফ্লাইওভারের কাজ চলমান থাকায় রাস্তার মাঝখানে ছোটখাট কুয়ার মতো গর্ত তৈরি করা হয়েছে। বৃষ্টির পানি আর সড়কের কাদামাটি একাকার হয়ে উঁচু-নিচু সব সমান দেখা যাওয়ায় গাড়ি চালাতে গিয়ে চরম বিড়ম্বনার শিকার হতে হচ্ছে যানবাহান চালকদের। সড়কটির বেহাল দশায় যানজটের তীব্রতা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।
এদিকে, সামান্য বৃষ্টি হলেই রাজধানীতে জলাবদ্ধতার জন্য নগরবাসী ও নগরপরিকল্পনাবিদরা দায়ী করেছেন ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন ও ঢাকা ওয়াসাকে। গত শনিবার ঢাকার দুই মেয়রের উপস্থিতিতে দক্ষিণ নগরভবনে জলাবদ্ধতা বিষয়ক এক গোলিটেবিল বৈঠকে তারা এর জন্য এই দুই সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে দায়ী করেন।
তারা বলেন, ‘এভাবে বিক্ষিপ্তভাবে পরিকল্পনা নিলে নগরীর উন্নয়ন করা যাবে না। এজন্য প্রয়োজন নগরসরকার। নগরীতে সব সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় সাধন করে একটি মেট্রোপলিটন পুলিশ গঠন করলে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ঢাকাকে পাল্টিয়ে দেয়া যাবে।’
রাজধানীর জলাবদ্ধতা ও নাগরিক ভোগান্তি নিয়ে সংসদে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সংসদ সদস্যরা। তারা এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতার কথা তুলে ধরেন। এসময় বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্য রওশন আরা মান্নান বলেন, ‘মতিঝিল থেকে ধানমণ্ডি আসতে সাড়ে ৩ ঘণ্টা সময় লেগেছে। শান্তিনগর, ফকিরাপুল, আরামবাগসহ সমগ্র রাজধানীতে ব্যাপক জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। বিষয়টি নিয়ে সিটি করপোরেশন শুধু মিটিং সিটিং করে। বাস্তবে কোনো কাজে আসে না। এরপরেও তাদের দিয়ে কাজ করানোর চিন্তা আছে কি না?’
স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য হাজী সেলিম ঢাকার সুয়ারেজ লাইন ও ড্রেনেজ ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন করেন। তিনি বলেন, ‘সুয়ারেজ লাইন ও ড্রেনেজ ব্যবস্থা ভালো না থাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দিচ্ছে। ওয়াসার পানি পাচ্ছে না নাগরিকরা। এর সমাধান কত দিনে হবে?’
তাদের এমন প্রশ্নের জবাবে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন দ্রুত জলাবদ্ধতা নিরসনে আশ্বাস দেন। তিনি বলেন, ‘এবার অনেক বৃষ্টি হয়েছে। গত ৩০ বছরেরও এতো বেশি বৃষ্টি হয়নি। আগামী ৩ বছরের মধ্যে আমরা ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নে ব্যাপক পরিকল্পনা নিয়েছি।’

