নিজস্ব প্রতিবেদক : সন্তান ভূমিষ্ট হওয়ার আগে থেকেই বাবা প্রার্থনা করে রেখেছেন ‘ছেলে সন্তান হলে তাকে হাফেজি’ পড়াবেন। ছেলে জন্মগ্রহণ করার পর বাবা তার নাম দিলেন মোবারক হোসেন (প্রতীকী নাম)। তার বয়স প্রায় চার বছর, মানত পূরণের উপযুক্ত সময় এটি। আর তাই গ্রামের বাড়ি থেকে মাইল ৪০ দূরের শহরের একটি হেফজখানায় ভর্তি করা হয় তাকে।
যে বয়সে নিজেকে জানতে পারেনি সে বয়স থেকেই শিশুটি হেফজখানার হুজুরকে নিজের একমাত্র অবিভাবক মানতে শেখে। হুজুরের কথা-আদর্শে নিয়ে শিশুটির জীবন গড়ে ওঠে। হুজুরের অবর্তমানে হেফজখানার সহপাঠীরা তার একান্ত বন্ধু-প্রিয়জন ও খেলার সাথী।
এলাকা ভেদে এখানে-ওখানে অসংখ্য পরিবারের সন্তানরা পড়াশুনা করছেন। একেকজনের মানসিকতা একেক রকম হওয়াটা তাই অস্বাভাবিক নয়। বড় কোনো ভুল না করলেও ছোট ছোট ভুলে শিশুদের জীবন গড়ে উঠছে। এই যেমন মাদরাসার গাছ থেকে ডাব বা অন্য ফল না বলে পেড়ে খাওয়া, বাড়ি থেকে পাঠানো সহপাঠীর খাবারের প্রতি নজর দেয়া, মাদরাসা বা সহপাঠীর দামি কোনো বস্তু চুরি করে নেয়া বা বিক্রি করা প্রভৃতি। তবে স্থান-কাল-পাত্র ভেদে এসব ছোট ছোট ভুলের মাঝেও রয়েছে ভিন্নতা।
কয়েক বছরের ব্যবধানে মোবারক শহর সম্পর্কে অনেকটাই পরিচিত হয়ে উঠেছে। এখন হেফজখানা তার কাছে বন্দী কারাগার মনে হয়। তার এখন টিভিতে বাংলা-হিন্দি সিনেমা, মারামারির সিনেমা দেখতে আর শিশুপার্কে ঘুরতে যেতে ইচ্ছে হয়। হুজুরের বকা এমনকি বেত্রাঘাতের পরও সুযোগ পেলেই সে মাদরাসা থেকে দূরে ঘুরতে চায়। পরিবারের বাবা-মা বা ভাই-বোনের সঙ্গে দেখা হয় বছরে ২/৩ বার।
জীবনের অনেক চাওয়া-পাওয়া অপূর্ণ থেকে যায় হুজুরের রক্তচক্ষু দেখে। চার দেয়ালের মাঝে নিয়ম করে ফজরের সময় উঠে নামাজ পড়া আর এশার নামাজ পড়ে ঘুমিয়ে যাওয়া রুটিনের মধ্যে মোবারকের হাফেজি পড়া শেষ হয়। পড়া শেষ করে বাড়ি ফিরে গেলেও সে তার অন্য ভাই-বোনদের মতো সবার সাথে স্বাভাবিক চলাফেরা করা, কথা বলা, মেলামেশা করতে পারে না। ৫/৬ বছরে হাফেজি শেষ করে কিশোর বয়সেও জীবন সম্পর্কে অনেক অভিমান-অভিযোগ থেকে যায় তার। এভাবে চলতে থাকে আরো কিছু বছর। একরকম অপূর্ণ থেকেই বেড়ে ওঠে শিশুটি।
উপরের ঘটনাটি ঘটে থাকে হাফেজি পড়তে আসা একভাগ শিশুদের ক্ষেত্রে। আর অন্য শিশুরা বড় হয় এর চেয়েও ভয়ানক সব শৈশবের অভিজ্ঞতা নিয়ে।
ঘটনা-১
গত ১১ আগস্টের ঘটনা। কক্সবাজারের চকরিয়া মাদরাসার দুই শিশু ছাত্রকে বলাৎকারের দায়ে এক শিক্ষক মুফতি শামসুদ্দিনকে গণধোলাইয়ের পর গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাদের বয়স প্রায় ১০ বছর। পরে বলাৎকারের শিকার দুই শিশুকে ডাক্তারি পরীক্ষার জন্য হেফাজতে নেয় পুলিশ।
পুলিশের সূত্র থেকে জানা যায়, গ্রেপ্তারকৃত শামসুদ্দিনের বাড়ি চকরিয়া উপজেলার ডুলাহাজারা ইউনিয়নের পাগলির বিল এলাকায়। শুক্রবার (৭ আগস্ট) ফজরের নামাজের পর শিক্ষক মুফতি শামসুদ্দিন তার কক্ষে ডেকে নিয়ে যায় শিশুদেরকে। এরপর দরজা আটকে দিয়ে পরপর দুই শিশুকেই বলাৎকার করে। পরে ঘটনাটি কাউকে জানালে প্রাণে মেরে ফেলারও হুমকি দেয় মুফতি শামসুদ্দিন।
কিন্তু তাদের একজন তার বাবাকে ফোন করে ঘটনাটি জানায়। শিশুটির বাবা ১১ আগস্ট ছেলেকে নিয়ে যাওয়ার সময় ঘটনাটি জানাজানি হয়ে যায়।
ঘটনা-২
২০১৩ সালের ৬ জুলাইয়ের ঘটনা। চট্টগ্রামের হাটহাজারী পৌরসভার ফটিকা আবু হুরাইরা আদর্শ হেফজখানার এক শিক্ষক ওই মাদরাসার প্রথম শ্রেণীর এক ছাত্রকে বলৎকার করেছে বলে খবর পাওয়া যায়। ঘটনার পর ছাত্রটিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল হাসপাতালের মানসিক বিভাগে ভর্তি করানো হয়। মাদরাসা কর্তৃপক্ষ স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তিদের টাকার বিনিময়ে বিষয়টি সালিশের মাধ্যমে ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।
মাদরাসার পরিচালক, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের থেকে জানা যায়, আবু হুরাইরা আদর্শ হেফজখানায় ২০১৩ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি ভর্তি করানো হয় ৯ বছরের এক ছেলেকে (নাম প্রকাশ করা হলো না)। ওই শিশুর বাবা পেশায় জাহাজের সারেং। ছেলের জন্মের পূর্ব থেকে বাবার ইচ্ছা ছিল ছেলেকে হাফেজ হিসাবে গড়ে তুলবেন। মাদরাসায় প্রত্যেক মাসে তিনি ছেলের খোরপোষ বাবদ দুই হাজার আটশ টাকা করে দিতেন।
চলতি বছরের ৬ জুলাই একই মাদরাসার শিক্ষক ও মাদরাসার পরিচালকের আপন সহোদর মওলানা মো. শফিক শিফাতুর রহমান ওই শিশুকে ভয় দেখিয়ে যৌন নির্যাতন চালায়। নির্যাতনের একপর্যায়ে শিশুটি অসুস্থ হয়ে পড়লে মাদরাসার পরিচালক হাফেজ মওলানা মো. রফিক আহমদ ও মওলানা মো. শফিক হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা করান। এরপর থেকে শিশুটি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। এ অবস্থা দেখে মাদরাসার বাবুর্চি তার মাকে খবর দেন। পরে তার মা দ্রুত মাদরাসায় এসে ছেলেকে নিয়ে প্রথমে হাটহাজারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করান। কিন্তু অবস্থা অপরিবর্তিত দেখে চমেক হাসপাতালের মানসিক বিভাগে ভর্তি করান।
ঘটনা-৩
২০১২ সালের ২ মে কক্সবাজার শহরের বাস টার্মিনালের পার্শ্ববর্তী একটি মাদরাসার ছাত্রকে বলৎকার করায় দুই শিক্ষকের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়।
পুলিশ ও মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, দারুল কোরআন হেফজখানা ও এতিমখানার হোস্টেলে ভর্তি হয়ে ইসলাম শিক্ষা গ্রহণ শুরু করে শহরের দক্ষিণ রুমালিয়ার ছড়ার এক শিশু। মাদরাসার দুই শিক্ষক মো. মোস্তাফা ও মোবারক শিশুটিকে হোস্টেলে তার কক্ষে গিয়ে বেশ কয়েকবার বলৎকারের চেষ্টা করে। পরে বিষয়টি তার বাবাকে অবগত করে শিশুটি। তার বাবা ওই ঘটনাটি মাদরাসা সুপারসহ সবাইকে জানালে ক্ষিপ্ত হয়ে চলতি বছরের ২৬ এপ্রিল শিশুটির গলায় পা দিয়ে শ্বাসরুদ্ধ করে নির্যাতন চালানো হয়। সর্বশেষ ৩০ এপ্রিল রাত ১২টার দিকে হোস্টেলে ঢুকে শিশুটিকে বলৎকার করা হয়।
এ বিষয়টি পুলিশকে জানালে শিক্ষক মোবারককে গ্রেপ্তার করলেও অপর শিক্ষক মোস্তাফা পালিয়ে যান। পরে শিশুর বাবা থানায় একটি মামলা দায়ের করেন।
এভাবে জানা-অজানা অনেক শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েই বড় হচ্ছে। শুধু এখানেই শেষ নয়। বিশ্বনাথে মাদরাসা হোস্টেল সুপারের দ্বারা যৌন নির্যাতন, কুষ্টিয়ায় কওমি শিক্ষক গ্রেপ্তারসহ মাদরাসার সমকামী শিক্ষকের যৌন নির্যাতনে ছাত্রের মৃত্যুর খবর পর্যন্ত প্রকাশ পেয়েছে দেশের সংবাদ মাধ্যমগুলোতে।
হুজুরের রক্তচক্ষু আর কখনো তার যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে শিশুদের মানসিকতা আরো বিকারগ্রস্ত হয়ে পড়ছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শারীরিক বৃদ্ধি ঘটলেও মানসিক প্রবৃদ্ধিতে তারা পিছিয়ে পড়ছে। অন্তরে কুরআন শিক্ষা ধারণ করলেও বাস্তব জীবনে তারা এক সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়েই বেড়ে উঠছে।
প্রশাসন, উদ্যোক্তা বা মানবাধিকার কর্মীদের আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে স্কুলের বা সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের ভাগ্যের কিছু পরিবর্তন ঘটলেও হেফজখানার শিশুরা পড়ে যাচ্ছে নৈতিকতার আড়ালে। শুধু ধর্মীয় অনুশাসন আর শিক্ষা দিয়ে সমাজে বিকশিত হওয়ার মনোভাব তৈরি হচ্ছে এসব শিশুর মাঝে।
অভিভাবকদের অভিযোগ রয়েছে, শিশুদের উপর যৌন নির্যাতন ও তাদেরকে মানসিকভাবে গড়ে তোলায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির পেছনে কওমি মাদরাসাগুলোর শিক্ষকদের উপযুক্ত শিক্ষার অভাব, ছাত্রদেরকে মানিয়ে চলার মানসিকতার অভাব, শিক্ষকদের ওপর প্রশাসনের তদারকির অভাবেই এ ধরনের সমস্যা দিন দিন বাড়ছে।
কওমি মাদরাসা বোর্ডের (বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ) যুগ্ম-মহাসচিব মাহফুজুল হক এ বিষয়ে বলেন, ‘হেফজখানার শিশুদেরকে মানসিকভাবে আরো দক্ষ করে গড়ে তুলতে তাদেরকে হামদ-নাত, কুইজ প্রতিযোগিতাসহ বিভিন্ন শিক্ষামূলক বিনোদনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হয়। বোর্ডের সঙ্গে যুক্ত মাদরাসাগুলোর ছাত্রদের মাঝে মাঝে তদারকি করা হয়।’
তিনি বলেন, ‘হেফজখানার শিশুরা শিক্ষক দ্বারা মানসিক, শারীরিক নির্যাতনের শিকার হওয়াটা অনেকটাই কমে এসেছে। শিক্ষকদেরকে প্রতিবছর ট্রেনিং করিয়ে শিক্ষার্থীদেরকে মানিয়ে চলার পরামর্শ দেয়া হয়। তবুও সমস্যার কথা কানে এলে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করছি। দেশের সকল কওমি মাদরাসা তদারকি করা সম্ভব হচ্ছে না, কারণ সবাই এ বোর্ডের আওতায় নয়।’
তবে কওমি মাদরাসার হেফজখানার শিক্ষার্থীদেরকে মানসিকভাবে আরো দক্ষ করে গড়ে তোলা দরকার। এজন্য আরো কিছু উদ্যোগের প্রয়োজন আছে বলে তিনি জানান।

