নিজস্ব প্রতিবেদক : ধর্ম অবমাননাকর মন্তব্য করায় আওয়ামী লীগের বহিস্কৃত নেতা আবদুল লতিফ সিদ্দিকী মন্ত্রীত্ব হারানোর পর এবার জাতীয় সংসদ সদস্যপদও হারাতে যাচ্ছেন। আগামী সপ্তাহের সোম বা মঙ্গলবার শুনানি করেই তার ভাগ্য নির্ধারণ করবে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
লতিফ সিদ্দিকীর সংসদ সদস্য পদ বাতিলের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে স্পিকারের চিঠি পাওয়া পর নড়েচড়ে বসে কমিশন। ইসি পরবর্তীতে আইন অনুসারে আওয়ামী লীগের দলীয় বক্তব্য নিতে বিরোধ উত্থাপনকারী হিসেবে দলের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ও অভিযুক্ত হিসেবে লতিফ সিদ্দিকীকে এ বিষয়ে নিজ নিজ অবস্থান ব্যাখ্যা করার জন্য চিঠি প্রদান করেন।
গত ২ আগস্ট (রোববার) আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের পক্ষে দলের উপ-দপ্তর সম্পাদক মৃণাল কান্তি দাশ ও লতিফ সিদ্দিকীর পক্ষে তার একান্ত সচিব মো রুবেল ইসিতে তাদের লিখিত জবাব জমা দেন।
লতিফ সিদ্দিকী তার জবাবে নিজের অবস্থান তুলে ধরে জানান, নিউইর্য়াকে বসে তিনি যে বক্তব্য প্রদান করেছেন তা একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে, আওয়ামী লীগের দলীয় নেতা হিসেবে নয়। এজন্য তাকে দল থেকে বহিস্কারের সিদ্ধান্ত আওয়ামী লীগের সম্পূর্ণ ভুল সিদ্ধান্ত। তাকে বহিস্কারের এখতিয়ার আওয়ামী লীগের নেই। ফলে পরবর্তীতে এর সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে নেয়া অন্য সিদ্ধান্তগুলোও আইনীভাবে ভুল হবে। এজেন্য তিনি ইসিকে বির্তকে না জড়িয়ে শুনানি থেকে দুরে থাকার অনুরোধ করেন।
অন্যদিকে সৈয়দ আশরাফও দলীয় জবাবে উল্লেখ করেন, সংবিধান, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ও নির্বাচনী আইন অনুসারে কোনো ব্যক্তি যদি কোনো একটি দল থেকে মনোনীত সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়ে থাকেন এবং তাকে যদি সেই দল থেকে বহিস্কার করা হয় তাহলে, আইন অনুসারে তার সংসদ সদস্য পদও বাতিল হয়ে যায়। লতিফ সিদ্দিকী আওয়ামী লীগের কেউ নন, তাই তার সংসদ সদস্য পদে থাকারও আইনগত কোনো অধিকার নেই। এজন্য তার সদস্যপদ আইনগতভাবে বাতিল করতে সিইসিকে অনুরোধও করা হয় চিঠিতে।
ইসির আইন শাখা কর্মকর্তা সূত্রে জানা যায়, দুই একদিনের মধ্যে দু’পক্ষকে শুনানিতে অংশ নেয়ার জন্য চিঠি পাঠানো হবে। বিধি অনুসারে ইসির চাওয়া নিজ নিজ অবস্থান ব্যাখ্যার জানানোর পরবর্তী ১৫ দিনের মধ্যে শুনানি করার বিধান রয়েছে। সে হিসেবে আগামী সপ্তাহে দুপক্ষের শুনানি অনুষ্ঠিত হবে। এছাড়া শুনানির দিনই রায় ঘোষণা করা হবে বলে কর্মকর্তারা জানান।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশন সচিব মো. সিরাজুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘পূর্বের নজির ও আইনের বিধান মেনে লতিফ সিদ্দিকীর বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে কমিশন। এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে আইন শাখাকে ‘কমিশন সূত্রে জানা যায়, লতিফ সিদ্দিকীর বিষয়টি নিষ্পত্তি করতে অতীত রেফারেন্স অনুসরণ করছে ইসি। সে হিসেবে ২০০০ সালে বিএনপি থেকে নির্বাচিত কিশোরগঞ্জ-২ আসনের তৎকালীন এমপি মো. আখতারুজ্জামানকে শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে দল থেকে বহিস্কার করা হয়েছিলো। এরপর তার সংসদ সদস্যপদ শূন্য ঘোষণার জন্য স্পিকার হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীকে অনুরোধ করেছিলো তৎকালীন বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ এডভোকেট খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন। সে সময়ও আখতারুজ্জামানের বিষয়টির সুরাহা করার জন্য সিইসিকে পদক্ষেপ নিতে বলেছিলেন স্পিকার।পরবর্তীতে শুনানি করেই তার সংসদ সদস্যপদ শূন্য ঘোষণা করার রায় দেয় ইসি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানান, এবারও একই পথে হাঁটছে ইসি। সে সময় বিএনপির অনুরোধে আখতারুজ্জামানের সংসদ সদস্যপদ শূন্য ঘোষণা রায় দিয়েছিলো ইসি। এবারো আওয়ামী লীগের অনুরোধের বাইরে যাবে না কমিশন। কেননা, আগের নজির আমলে নেয়া হচ্ছে এবারও।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার মো. শাহ নেওয়াজ বাংলামেইলকে বলেন, ‘আইন অনুযায়ী বিরোধ উত্থাপনকারী ও অভিযুক্তকে শুনানিতে ডাকার সুযোগ রয়েছে। তার আগে দু’পক্ষেকে তাদের অবস্থান তুলে ধরারও সুযোগ দেয়া হয়েছে। আইন অনুসারে ১৫ দিনের মধ্যেই শুনানি করতে, তাই অচিরেই তাদের শুনানিতে ডাকা হবে।’
সংসদ সদস্য (বিরোধ নিষ্পত্তি) আইন ১৯৮০ অনুযায়ী, স্পিকার কোনো সংসদ সদস্যের আসন শূন্য ঘোষণার কোনো বিতর্ক সম্পর্কিত কোনো বিবৃতি ইসিকে পাঠালে এর চৌদ্দ দিনের মধ্যে তা বিরোধ উপস্থাপনকারী ও যার বিরুদ্ধে বিরোধ উপস্থাপন করা হয়েছে উভয়পক্ষকে জানাতে হয়। এবং তাদের কোনো বক্তব্য থাকলে তা ইসি নির্ধারিত সময়ে মধ্যে প্রদান করতে হয়। এরপর ১৫ দিনের মধ্যে শুনানি করে রায় ঘোষণা বিধান রয়েছে।
ইসির আইন শাখা সূত্রে জানা যায়,সংবিধানের ৬৬ ধারা, ৭০ ধারা অথবা সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধি মোতাবেক লতিফ সিদ্দিকীর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিবে ইসি। এছাড়া শুনানিতে উভয়পক্ষই সাক্ষ্য উপস্থাপন ও জেরা করার সুযোগ পাবে। ব্যক্তিগতভাবে অথবা অ্যাডভোকেট কর্তৃক প্রতিনিধির মাধ্যমে ইসির শুনানিতে উপস্থিত থাকার অধিকারও পাবে। তবে এসব পদ্ধতি ছাড়াও ইসি যে পদ্ধতি সঠিক মনে করবে সেভাবে বিরোধ নিষ্পত্তি করতে পারবে এ অধিকারও আইনে ইসিকে দেয়া রয়েছে।
উল্লেখ্য, গত বছরের ২৮ সেপ্টেম্বর আমেরিকার নিউইয়র্কে টাঙ্গাইল সমিতির সঙ্গে মতবিনিময় সভায় লতিফ সিদ্দিকী হজ, তাবলিগ জামাত, প্রধানমন্ত্রীর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় ও সাংবাদিকদের সম্পর্কে বিতর্কিত মন্তব্য করেন।
এরপর প্রথমে মন্ত্রিসভা থেকে এবং পরে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও প্রাথমিক সদস্য পদ থেকে বহিষ্কার করা হয় তাকে। ওই সময়ে দেশের বিভিন্ন আদালতে তার নামে একাধিক মামলাও হয়। ২৫ নভেম্বর ধানমন্ডি থানায় আত্মসমর্পণ করলে তাকে জেলহাজতে পাঠান আদালত। গত ২৯ জুন জামিনে মুক্তি পান।

