৩০ বছর ধরে এক হাসপাতালে আছেন দুর্নীতিবাজ ডাক্তার প্রভাষ কুমার দাস
নিজস্ব প্রতিবেদক : ওষুধ চুরি, ডাক্তারদের প্রাইভেট প্র্যাকটিস আর অনিয়ম-দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে ঐতিহ্যবাহী কোর্টচাঁদপুর সরকারি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও পরিকল্পনার দায়িত্বে থাকা টিএইচএ ডা. প্রভাষ কুমার দাসের নেতৃতে এই হাসপাতালে চলছে দুর্নীতি আর লুটপাটের মহা কর্মযজ্ঞ। হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগে ১৯জন ডাক্তার থাকার পরও এখানে এসে রোগীরা নানা ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। বাধ্য হয়ে রোগীদের শরনাপন্ন হতে হচ্ছে হাসপাতালের বাইরে কোর্টচাঁদপুরসহ ঝিনাইদহ, যশোর, খুলনা ও ঢাকার বিভিন্ন প্রাইভেট ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে। কোর্ট চাঁদপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সব বিভাগের মধ্যে গুরুত্বপুর্ণ বিভাগ হচ্ছে জরুরী বিভাগ। কিন্তু এই বিভাগে সার্বক্ষনিক কোন ডাক্তার থাকেন না। অভিযোগ আছে, টিএইচএ ডা. প্রভাষ কুমার দাস তার অধিনস্থ কতিপয় ডাক্তারকে দিয়ে জরুরী বিভাগ সামলাচ্ছেন। একারণে দুর দুরান্ত থেকে এখানে কোন রোগী আসলে জরুরী বিভাগে কর্মরত ডিউটি ডাক্তারগণ নানা ছলচাতুরির আশ্রয় নিয়ে থাকেন। দু’ একজন ডাক্তার ছাড়া অধিকাংশ সময় এখানে যারা ডিউটি করেন তারা রোগীদের কোন টিটমেন্ট দেন না। দীর্ঘক্ষন ফোন করার করার পর ডাক্তার আসলেও তারা ঠিক মতো রোগী দেখেন না। তড়িঘড়ি করে রোগীকে রেফার্ড করে দেন বাহিরের কোন প্রাইভেট হাসপাতালে। জানাগেছে এসবের আবার অধিকাংশই ডা. প্রভাষ কুমার দাসের কমিশনভোগী হাসপাতাল। জানাগেছে এরকম একটি হাসপাতালে একজন রোগী পাঠাতে পারলেই জনপ্রতি মোটা অংকের কমিশন পান ড. প্রাভাষ কুমার ও তার সিন্ডিকেটের সদস্য ডাক্তারগন।
জরুরী বিভাগে ডাক্তার না থাকার কারণে প্রায় হাসপাতালে রোগী-ডাক্তারদের মধ্যে নানা গোলযোগ-অসন্তোষ, মারামারি ও ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটে। এসব ক্ষেত্রে টিএইচএ ডা. প্রভাষ কুমার দাস গোপনে তড়িঘড়ি করে সেসব ঝক্কি ঝামেলাগুলোকে সমাধান করে ফেলেন যাতে বাইরে জানাজানি না হয়। বর্তমানে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে একটি অ্যাম্বুলেন্স আছে। কিন্তু প্রায় দেখা যায় অ্যাম্বুলেন্সটি বিকল হয়ে পড়ে আছে। অধিকাংশ সময় অ্যাম্বুলেন্সটিকে ডা. প্রভাষ কুমারের পরিবারের সদস্যদের বাজার ও ছেলে-মেয়েদের স্কুলে পাঠানোর কাজে ব্যবহার হতে দেখা যায়। সরকারি ভাবে হাসপাতালে দুটি মোটর সাইকেল আছে সেগুলোর ব্যবহারও কারো চোখে পড়ে না। হাসপাতালের এক্সরে মেশিনটি মাসের প্রায় ২৫দিনই নষ্ট থাকে। আর যে কটি এক্সরে করা হয় সেগুলো স্পষ্ট বোঝা যায় না। প্রতি বছর ডাক্তারদের বিভিন্ন ট্রেনিং বাবদ হাসপাতালে বড় অংকের টাকা বাজেট আসে। কিন্তু খবর নিয়ে জানাগেছে যারা ট্রেনিং করেন তারা টেনিংয়ের কোন টাকা পাননা। পুরো টাকা মেরে দেন ডা. প্রভাষ কুমার। অনুসন্ধানে জানাগেছে শুধু ট্রেনিং বাজেটই নয়, সরকার কর্তৃক বিভিন্ন খাতে উপজেলা স্ব্যাস্থ্য কমপ্লেক্সে যত টাকার বাজেট আসুক না কেন তার সবই ভক্ষন করে ফেলেন টিএইচএ ডা. প্রভাষ কুমার ও তার ডান হাত বড় বাবু নামে খ্যাত প্রধান অফিস সহকারী আক্তারুজ্জামান।
সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে প্রতিদিন সকাল হলেই দেখা যায় ডাক্তাররা ব্যস্ত থাকেন কে কোন ক্লিনিকে রোগী দেখবেন। যার বাস্তব নমুনা মেডিল্যাব ডায়াগনস্টিক সেন্টার। বর্তমানে এই প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করছেন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের টিএইচএ ডা. প্রভাষ কুমার দাস। এই অবস্থায় জনমনে প্রশ্ন উঠেছে- যার ওপর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের দায়িত্ব ন্যাস্ত তিনি নিজেই ডায়াগন্টিক সেন্টার পরিচালনা করছেন কিভাবে? শুধু তিনি নিজেই নয়, অনুসন্ধানে জানাগেছে টিএইচএ এই ডায়াগনিস্টক সেন্টার পরিচালনা করার জন্য তার অনুগত কতিপয় অসাদু ডাক্তার নিয়ে একটি সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। তাদেরকে দিন রাত ২৪ ঘন্টা ওই ডায়াগনিস্টক সেন্টারে প্রাইভেট প্র্যাকটিস করতে দেখা যাচ্ছে।
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বিগত কয়েক বছর ধরে কোন অপারেশন করা হয় না। অপারেশন থিয়েটারে সার্বিক সরঞ্জাম থাকার পরও সেগুলো ব্যবহার করা হয়না। এ বিষয়ে ঝিনাইদহের সিভিল সার্জন আব্দুস সালামের সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিষয়টির সত্যতা স্বীকার করেন। তিনি বলেন, ঝিনাইদহে অ্যানেস্থেশিয়া চিকিৎসকের খুবই অভাব। বিষয়টি তিনি উর্ধতন মহলকে জানিয়েছেন বলেও জানান।
সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, ডেলিভারীর কোন রোগী আসলে নার্স-আয়ারা আগে টাকার চুক্তি করে। টাকা দিতে না চাইলে তারা সেবা দিতে অপারগতা প্রকাশ করে। শুধু তাই নয়, ভর্তিরত রোগীদের সাথে নার্স-আয়ারা প্রতিনিয়ত খারাপ আচরণ করেন। বিশেষ করে রাতে যে সব নার্সদের ডিউটি থাকে তারা একটু রাত হলেই ঘুমিয়ে পড়ে। কারো সমস্যা হলে- ডাকতে গেলেই রোগীর আত্নীয়-স্বজনদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করে।
খোঁজ নিয়ে জানাগেছে বর্তমানে হাসপাতালে মোট ১৯জন ডাক্তার আছেন। এদের মধ্যে আবাসিক মেডিকেল অফিসার হিসাবে আছেন ডাক্তার আঞ্জুমান আরা, গাইনী ডাক্তার আছেন ডা. চলন্তিকা রানী, শিশু বিষয়ক ডাক্তার হুমায়ুন সায়েম, অ্যানেস্থেশিয়া বিষয়ক ডা. শাহ আলম, চক্ষু ও যক্ষা বিভাগে ডা. আশরাফুল আলম, ডেন্টাল সার্জন ডা. মো তানভির রহমান, মেডিসিন বিভাগে ডা. কাজল আলী, সহকারী সার্জন ডা. এসএম রফিকুল ইসলাম, মেডিকেল অফিসার ডা. বনি আমিন, আইএমও কাজী যুবায়ের হাসান, ইএমও ডা. সুলতান আহম্মেদ, প্যাথলজিস্ট ডা. শামিম রেজা, অ্যানেস্থেশিয়া ডা. নাজমুস সাকিব, সহকারী সার্জন ডা.গুলশান আরা, মেডিকেল অফিসার ডা. তাজুল ইসলাম, ডা. আজিজুর রহমান, মেডিকেল অফিসার ডা. ফারুক অন্যতম। কিন্তু এদের মধ্যে হাতে গোনা মাত্র কয়েকজন ডাক্তার ঠিকমতো চিকিৎসা সেবা দিয়ে থাকেন। চিকিৎসাসেবায় মন নেই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে টিএইচএ সহ অধিকাংশ চিকিৎসকদের। এর পরিবর্তে তারা দিনরাত ব্যস্ত থাকেন ক্লিনিক আর প্রাইভেট প্রাকটিস নিয়ে। চিকিৎসকের পরিবর্তে উপজেলার লক্ষাধিক লোকের স্বাস্থ্যসেবা দিচ্ছেন অদক্ষ আয়া আর নার্সরা। গুরুত্বপূর্ণ এ হাসপাতালে চিকিৎসকের দেখা মেলে কালেভদ্রে। ইচ্ছেমাফিক তারা বেড়াতে আসেন হাসপাতালে। হাসপাতাল কম্পাউন্ড যেন গো-চারণভূমি। মাদকসেবী আর অপরাধীদের অবাধ বিচরণে সব সময় হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষ থাকেন তটস্থ। অথচ একমাত্র এ হাসপাতাল ঘিরেই গড়ে উঠেছে সেখানে কর্মরত চিকিৎসকদের ক্লিনিক-বাণিজ্য। সব মিলিয়ে কোর্টচাঁদপুরে চিকিৎসাসেবা নিয়ে চলছে তুঘলকি কারবার।
সরেজমিন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স পরিদর্শন : রোববার বিকাল সাড়ে ৩টা। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে টিএইচএ ডা. প্রভাষ কুমার দাসের অফিস তালা লাগানো। তিনি কর্মস্থলে নেই। শুধু ২/৩জন ডাক্তার ছাড়া পুরো হাসপাতালে কোনো চিকিৎসকের দেখা মেলেনি। চিকিৎসকের পরিবর্তে হাসপাতালে রয়েছেন কয়েকজন আয়া আর নার্স। ডিউটি ডাক্তারের চেয়ারে বসে আছেন হাসপাতালের বড় বাবু নামে খ্যাত প্রধান অফিস সহকারী আক্তারুজ্জামান। এসময় জরুরী বিভাগে আসেন একজন অসুস্থ রোগী। এসময় আক্তারুজ্জামান হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসে রোগীর আত্নীয়-স্বজনদের জরুরী ভিত্তিতে এই রোগীকে মেডিল্যাব ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়ে যাওয়ার জন্য বলেন। আক্তারুজ্জামান তার মোবাইল ফোন থেকে টিএইচএ ডা. প্রভাষ কুমার দাসের সঙ্গে কথা বলেন এই তাৎক্ষনিকভাবে ওই রোগীকে মেডিল্যাব ডায়াগনিস্টক সেন্টারে পাঠিয়ে দেন। অণ্যথা এই রোগী বাচানো যাবে না বলেও তাদেরকে জানান। বাধ্য হয়ে আত্নীয়-স্বজনরা ওই রোগীকে পার্শ্ববতী মেডিল্যাব ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়ে যান। সেখানে গিয়ে তারা টিএইচএ ডা, প্রভাষ কুমার দাসকে দেখতে পান। এ ব্যাপারে মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে ডা. প্রভাষ কুমার দাস বলেন, বিএমএ‘র এক সিনিয়র নেতা ওই হাসপাতালে চিকিৎসাধিন ছিলেন। তাকে দেখতে তিনি ওই ডায়াগনিস্টক সেন্টারে গিয়েছিলেন।
অনুসন্ধানে জানাগেছে হাসপাতালের খাবার নিয়ে প্রতিদিন লাখ টাকা লুটপাট হচ্ছে। নিয়ম অনুযায়ী সপ্তাহে একদিন রোগীদের খাবারে মাছ একদিন মুরগীর মাংস ও একদিন গরুর মাংস দেয়ার কথা। কিন্তু মুরগীর মাংস ও গরুর মাংস কখনো দেয়া হয় না রোগীদের। প্রতিদিনই অখ্যাদ্য ও অস্বাস্থ্যকর খাবার পরিবেশন করে মুরগী ও গরুর মাংসের বিল করা হচ্ছে। এই খাতে প্রতিদিনই লাখ টাকা আত্নসাৎ করছে ডা. প্রভাষ কুমার দাস। অপর দিকে হাসপাতালে কর্মরত ১৯ ডাক্তারের মধ্যে অধিকাংশ ডাক্তারই কোন ধরনের ছুটি ছাড়াই মাসের পর মাস হাসপাতালে আসেন না। সপ্তাহে একদিন এসে পুরো সপ্তাহের স্বাক্ষর করে যাচ্ছেন এরকম ডাক্তারের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। এরা টিএইচএ ডা. প্রভাষ কুমারকে মাসে মোটা অংকের টাকা দিয়ে এই অনৈতিক কা- ঘটান। অভিযোগ রয়েছে ডা. প্রভাষ কুমার দাস ডাক্তার হিসাবে খুবই অদক্ষ ও অযোগ্য একজন ডাক্তার। টিএইচএ হওয়ার কোন যোগ্যতাও তার নেই। প্রভাব খাটিয়ে তদবির করে মোটা অংকের টাকা খরচ করে তিনি টিএইচএ হয়েছেন। একই সঙ্গে মোটা অংকের টাকা দিয়ে তিনি গত ৩০ বছর ধরে একই হাসপাতালে কর্মরত আছেন।

