নিজস্ব প্রতিবেদক : রাজধানী ঢাকার সড়কগুলোতে দিনের বেলায়ও জ্বলছে ঢাকা সিটি করপোরেশনের সড়কবাতি। সূর্যাস্তের আগ মুহূর্তে বাতি জ্বালানো এবং সূর্যোদয়ের পরপরই নেভানোর নিয়ম থাকলে তা মানা হচ্ছে না। সুইচম্যান সঙ্কট ও তাদের অবহেলার কারণে অনেক সময় দিনের পুরো সময় জ্বলতে দেখা যায় এই সড়কবাতিগুলো। এতে প্রতিমাসে কমপক্ষে ৩৪ লাখ টাকার বিদ্যুৎ অপচয় হচ্ছে। যা দিয়ে জেলা শহরের প্রায় ৪ হাজার পরিবারের বিদ্যুতের চাহিদা মেটানো সম্ভব।
নিয়ম অনুযায়ী সিটি করপোরেশনের বাতিগুলো সূর্যাস্তের কিছু আগে জ্বালানো এবং সূর্যোদয়ের পরপরই বন্ধ করার কথা। কিন্তু প্রতিদিন সড়কবাতিগুলো সূর্যোদয়ের দেড় থেকে দুই ঘণ্টা আগে জ্বালানো এবং সূর্যাস্তের দেড়-দুই ঘণ্টা পরে বন্ধ করা হয়। আবার অনেক সময় দিনের পুরো অংশ জ্বলতে দেখা যায় এই সড়কবাতিগুলো। এতে প্রতিমাসে কমপক্ষ্যে ২৪০ মেগাওয়ার্ট বিদ্যুৎ অপচয় হচ্ছে। আর অপচয় হওয়া এ বিদ্যুৎতের পরিমাণ প্রায় ৩৪ লাখ টাকা। অথচ অর্থের অভাবে সড়কবাতিতে খরচ হওয়া বিদ্যুতের কোটি কোটি টাকা বিল পরিশোধ করতে পারছে না দুই সিটি করপোরেশন।
সূত্র জনায়, প্রতি ১ ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ হয় সাড়ে ৬ টাকা। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের ৯৩টি ওয়ার্ড এলাকায় ভিআইপি সড়ক, ছোট-বড় সড়ক, গলি, উপ-গলিসহ নগরজুড়ে ৭১ হাজার ২৭৬ সড়কবাতির জন্য প্রতি ঘণ্টায় কমপক্ষে ৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ খরচ হয়। রাতের পরিমাণ গড়ে ১২ ঘণ্টা করে ধরে হলে বিদ্যুৎ ব্যয় হয় ৮৪ মেগাওয়াট। আর মাসে ২ হাজার ৫২০ মেগাওয়াট। যার বিলের পরিমাণ ২ কোটি ৪ লাখ ৪০ হাজার ৪৭৬ টাকা। এ হিসেবে প্রতিদিন গড়ে দুই ঘণ্টার বেশি বাতি জ্বালিয়ে রাখলে অতিরিক্ত খরচ হয় ১৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। মাসে ৪২০ মেগাওয়াট। যার বিলের পরিমাণ মাসে প্রায় ৩৪ লাখ টাকা। যা দিয়ে জেলা শহরের প্রায় ৪ হাজার পরিবারের বিদ্যুতের চাহিদা মেটানো সম্ভব।
এ খাতে দুই সিটির বাৎসরিক বরাদ্দ প্রায় ৪০ কোটি টাকা। এর পরেও গত মে মাস পর্যন্ত দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ডিপিডিস ও ডেসকোর প্রায় ১৫ কোটি বকেয়া রয়েছে।
ডিএসসিসির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (বিদ্যুৎ) জাফর আহমেদ বলেন, ‘বর্তমানে একজন সুইচম্যান প্রতিদিন গড়ে ৩০-৪০ টি পয়েন্টে গিয়ে সুইচ অফ অন করেন। একটি সুইচ পয়েন্ট অন্যটিতে যেতে কমপক্ষে ৫ মিনিট সময় লাগে। তাছাড়া রাস্তায় যানজট তো লেগেই থাকে। এ হিসেবে প্রতিটি সুইস পয়েন্টে সুইচম্যানদের ৩ মিনিট করে সময় দিলেও প্রায় দেড় থেকে দুই ঘণ্টা সময় লাগে। সেজন্যই বাতি জ্বালানো ও বন্ধে নির্ধারিত সময়ের আগ পর হচ্ছে।
এমনিতেই অর্থের অভাবে গত মে পর্যন্ত বিদ্যুৎ সরবরাহকারী ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ডিপিডিসি) এবং ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেডের (ডেসকো) বকেয়া থাকা প্রায় ১৫ কোটি টাকার নিয়মিত বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করতে পারছে না দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। এর উপরে প্রতিমাসে অতিরিক্ত আরো ৩৪ লাখ টাকার বিল ঋণের বোঝাকে আরো ভারী করে তুলছে। তবে বিদ্যুৎ বিলের বিষয়ে কোনো তথ্য জানাতে পারেননি সংস্থার সংশ্লিষ্ট বিভাগের দায়িত্বে থাকা তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (বিদ্যুৎ) জাফর আহমেদ।
সিটি করপোরেশন সূত্র জানায়, রাজধানীর ২২৮৯ দশমিক ৬৯ কিলোমিটার সড়কের বাতিতে বিদ্যুৎ সাশ্রয় আনতে ২৫০ ওয়াটের হাইপ্রেসার বাতির পরিবর্তে ৯০ ওয়াটের সোডিয়াম বাতির লাগানোর কাযক্রম শুরু করা হয়। কিন্তু এখনো দুই সিটিতে প্রায় ১২ হাজারেরও বেশি হাইপ্রেসার বাতি রয়েছে। যেগুলো সোডিয়াম বাতির তিনগুণ বিদ্যুৎ খরচ করে সমপরিমাণের আলো দিয়ে থাকে। একে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ খরচ হচ্ছে। এসব বাতির বেশির ভাগই প্রচলিত ফ্লোরেসেন্ট, হ্যালোজেন এবং সোডিয়াম বাল্ব। এর মধ্যে খুব অল্প সংখ্যকই বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী বাল্ব (এনার্জি সেভিং)।
সরকারের জ্বালানি বিভাগের সাম্প্রতিক এক জরিপ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দুই সিটি করপোরেশনের এক হাজার ১২৩টি মিটারিং পয়েন্ট এবং এক হাজার ২৪৭টি সুইচিং পয়েন্ট রয়েছে। প্রতিটি মিটারিং পয়েন্টের জন্য এক বা একাধিক সুইচিং পয়েন্ট থাকার কথা। প্রতিটি সুইচিং পয়েন্টে এক বা একাধিক বাতি জ্বালানো ও বন্ধ করতে ব্যবহার করা হয়। মিটারিং পয়েন্ট ব্যবহার করা হয় রাস্তার বাতির জন্য কী পরিমাণ বিদ্যুৎ খরচ তার হিসাব রাখার জন্য। তবে বিদ্যুৎ বিভাগের সমীক্ষাকারীরা বাস্তবে যথেষ্ট পরিমাণ মিটারিং কিংবা সুইচিং পয়েন্ট পায়নি। এছাড়াও নির্দিষ্ট স্থানে সুইচিং পয়েন্ট না বসানোর ফলে ভোল্টেজের ওঠানামা হচ্ছে। ফলে অনেক স্থানে বাতি নিভু নিভু জ্বললেও কিছু কিছু স্থানে বাতি জ্বলে অতিরিক্ত উজ্জ্বলভাবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আনসার আলী খান বলেন, ‘এমটা হওয়ার কথা নয়। যদি হয়ে থাকে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
তিনি বলেন, আমরা সূর্যাস্তের আগ মুহূর্তে বাতি জ্বালানো এবং সূর্যোদয়ের পরপরই নেভানোর জন্য সুইসম্যানদের নির্দেশ দিয়েছে।’
জানতে চাইলে ডিএসসিসি মেয়র সাঈদ খোকন বলেন, ‘নগরীর সড়ক বাতিগুলোর ২০ শতাংশও আগে জ্বলতো না। এখন ৯০ থেকে ৯৫ ভাগে উন্নীত করেছি। তবে বিদ্যুতের যাতে অপচয় না হয় সে জন্য নির্ধারিত সময়ে সড়কবাতির সুইচ অফ ও অন করতে নির্দেশ দিয়েছি।’


