স্পোর্টস ডেস্ক : বিদায়টা কখনও সুখের হয় না। হয় কান্নার। ন্যু ক্যাম্পে চিত্রটা মোটেও ভিন্ন ছিল না। ১৭ বছরের সম্পর্ক ছিন্ন করা সহজ কথা নয়। তবুও নিয়তির অমোঘ বিধান সবাইকে মানতে হয়। সেটা মেনেই সম্পর্ক ছিন্ন করতে হয়।
‘বার্সেলোনার জার্সি আর কখনও পরবো না, এটা চিন্তা করাটাও যে কত কষ্টের, সেটা কিভাবে বোঝাবো!’- আবেগময় বক্তব্যটি জাভি হার্নান্দেজের। স্প্যানিশ লা লিগায় ন্যু ক্যাম্পে বার্সার জার্সি গায়ে সর্বশেষ ম্যাচ খেলার পর এভাবেই চোখের পানিতে নিজের বিদায় ঘোষণা করলেন ক্লাবের ইতিহাসে সেরা মিডফিল্ডারটি।
ন্যু ক্যাম্পে এদিন ‘৬’ নাম্বার জার্সির বন্যা। গ্যালারিতে প্রমান সাইজের ব্যানার। যেখানে আঁকা জাভির প্রতিকৃতি। গায়ে বার্সেলোনার ৬ নাম্বার জার্সি। ব্যানারের ওপরে হ্যাশ ট্যাগ দিয়ে বড় করে লেখা ‘#6RACIESCXAVI’। তার নীচে লেখা ‘17 TEMPORADES | 1998-2015′।
মেসি-নেইমার-ইনিয়েস্তারাও গায়ে জড়িয়েছিলেন ৬ নম্বর জার্সি। সে এক অভাবনীয় দৃশ্য। দেপোর্তিভো লা করুনার বিপক্ষে ম্যাচটি ছিল স্রেফ আনুষ্ঠানিকতা। ন্যু ক্যাম্পে এদিন প্রায় ৯৪ হাজার দর্শকের উপস্থিতি ঘটেছে, স্বপ্নের নায়ককে বিদায় জানাবে বলে।
ম্যাচের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পুরোটা সময় তাই হয়ে রইল শুধুই জাভিময়। মাঝে ৯০ মিনিটের ২২ জনের লড়াইটা হয়ে থাকল বিচ্ছিন্ন একটি ঘটনা হয়ে। ওখানে কী হলো না হলো- তা কেউ মনে রাখতে চাইবে না।
মাঠে নামার সময়ই অভাবনীয় গার্ড অব অনার। দু’পাশে দাঁড়িয়ে অতিথি দল দেপোর্তিভো লা করুনা খেলোয়াড়দের সারি। করতালিতে লিগ বিজয়ী বার্সা ফুটবলার, বিশেষ করে জাভি হার্নান্দেজকে অভিবাদন জানাচ্ছে তারা। গ্যালারিতে তখন শোভা পাচ্ছে জাভির ছবি সম্বলিত বিশাল বিশাল ব্যানার।
এরপর ৯০ মিনিটের ম্যাচ। জাভি খেললেন ৮৬ মিনিট। বাকি চার মিনিটের জন্য তার পরিবর্তে ইনিয়েস্তাকে মাঠে নামান কোচ এনরিকে। মাঠ ত্যাগ করার সময়ই নেতৃত্বের আর্মব্যান্ড হাতে নিয়ে দর্শক অভিবাদনের জবাব দিতে দিতে মাঠ ছাড়েন তিনি।
ম্যাচ শেষেই মূলত ৬ নাম্বার জার্সি পরে বার্সা ফুটবলাররা হাজির হয়ে গেলেন সেন্ট্রাল মিডফিল্ডে। জাভিকে শূন্যে ছুড়ে আবার লুফে নিয়ে বিদায়টাকে বিষাদে পরিণত হতে দিলেন না মেসি-নেইমার-ইনিয়েস্তারা।
এরপরই শুরু হয়ে গেলো প্রাইজ গিভিং সিরোমোনি। স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট অ্যাঞ্জেল মারিয়া ভিলারের হাত থেকে অধিনায়ক হিসেবে গ্রহণ করলেন লা লিগা শিরোপা। বার্সার হয়ে লা লিগার শেষ শিরোপাটা তুলে ধরলেন মাথার ওপর। কাতালানরা একে একে এসে ঘিরে ধরলেন জাভিকে।
এ সময় জায়ান্ট স্ক্রিনে একের পর এক ভেসে উঠতে থাকলো জাভির ১৭ বছরের ক্যারিয়ারের চুম্বক অংশগুলো। ন্যু ক্যাম্পের জায়ান্ট স্ক্রিনে চোখ তখন। আবেগময় এক ভিডিওর উপস্থাপনা। ১৯৯৮ সালে সেই তরুনটি আজ পরিণত। ১৭ বছরের অভিযাত্রাও আজ শেষ হতে চলল। নিজেকে নিংড়ে বার্সেলোনা এবং স্প্যানিশ ফুটবলকে দিয়েছেন দু’হাত ভরে। তারই ভিডিও প্রদর্শিত হচ্ছিল তখন। ওসব দেখে ৯৪ হাজার দর্শকের গগনবিদারি আওয়াজ। সঙ্গে আবেগের বিস্ফোরণও।
সবশেষে এলো সমর্থকদের উদ্দেশ্যে কিছু বলার পালা। সবার আগে মাইক্রোফোন উঠল কোচ লুইস এনরিকের হাতে। এরপর কথা বললেন আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা। জাভির দীর্ঘদিনের বন্ধু, সতীর্থ। শুধু ক্লাবই নয়, জাতীয় দলের হয়েও একই সাথে এই দু’জনের উত্থান।দীর্ঘদিনের বন্ধুকে বিদায় জানাতে যেন কষ্টে বুক ভাঙছিল ইনিয়েস্তার। বললেন, ‘আজকের দিনটি আমাদের সবার জন্যই বিশেষ একটি দিন। আমরা চাই, বন্ধু তোমার সাথে শিরোপা উদযাপন করতে। আমরা এমন একজন ফুটবলারকে বিদায় জানানোর সৌভাগ্য লাভ করেছি যিনি তার দক্ষতা এবং যোগ্যতা দিয়ে একক একটি আসনে সমাসিন হয়েছেন। তিনি একজন কিংবদন্তী। তার কাছ থেকে অনেক কিছু শিখেছি বলে নিজেদেরকে আমরা অনেক সৌভাগ্যবান মনে করছি। ভিসকা এল বার্সা, ভিসকা কাতালুনিয়া।’
সবার শেষে মাইক্রোফোন উঠল জাভির হাতে। চোখের পানি মুছতে মুছতে তিনি বললেন, ‘আজ আমার বিদায়টা এভাবে হবে, নিজেও ভাবতে পারিনি। সব দেখে আমি অভিভূত। আপনারা সত্যি আমাকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখি মানুষে পরিণত করেছেন। গত ১৭টি মৌসুম কাটানোর পর আজ নিজেকে সুখি মানুষই মনে হচ্ছে আমার। যে যাই বলুক, সত্যি আমরা পৃথিবীর সেরা একটি ক্লাবের ফুটবলার।’
পরিবারের সদস্যাদের ধন্যবাদ জানিয়ে জাভি বলেন, ‘আমি ধন্যবাদ জানাতে চাই আমার স্ত্রী, মা-বাবা, দুই ভাই, বোন, শশুর এবং আমার বন্ধুদেরকে- যে তারা আমাকে শর্তহীন সমর্থন দিয়ে গেছেন সব সময়।’
ন্যু ক্যাম্পে জাভির এটাই শেষ ম্যাচ নয়। আগামী সপ্তাহেই এই মাঠে কোপা ডেল রের ফাইনালে অ্যাথলেটিক বিলবাওয়ের মুখোমুখি হবে বার্সা। ওই ম্যাচের পর আরও একটি রয়েছে। চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনাল। ৬ জুন বার্লিনে ওই ম্যাচে বার্সা মুখোমুখি হবে জুভেন্তাসের। বার্সার জার্সি পরে ওটাই হবে জাভির শেষ ম্যাচ।
সেটা স্মরণ করিয়েই দর্শকদের উদ্দেশ্যে জাভি বলেন, ‘সমর্থকদের ধন্যবাদ, তাদের অসাধারণ সমর্থনের জন্য। তবে, এটাই তো শেষ নয়। আমি এখানে আবার আসবো। এখনও কোপা ডেল রে রয়েছে। রয়েছে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনাল। ওই দুটি শিরোপাও আমি আপনাদের উপহার দিতে চাই। আশা করি সফল হবো। ভিসকা এল বার্সা, ভিসকা কাতালুনিয়া।’
বিদায়ের সিদ্ধান্ত নেয়াটা অনেক কঠিন ছিল। সেটাই জানালেন তিনি সমর্থকদের। বললেন, ‘আসলে এই সিদ্ধান্তটা নেওয়া ছিল আমার পক্ষে অনেক কঠিন। ক্লাবের পক্ষ থেকে আরও এক মৌসুম খেলার জন্য আমাকে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু যে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি সেখান থেকে ফেরা আর সম্ভব নয়। আমি মনে করি, ক্লাব ছাড়ার জন্য এটাই আদর্শ সময়।’
৩৫ বছর বয়সী এই প্লে মেকার ১৭ বছরের ক্যারিয়ারে বার্সার হয়ে জিতেছেন ২৩টি শিরোপা। এর মধ্যে আটটি লা লিগা, তিনটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিতেছেন তিনি। সঙ্গে যোগ হওয়ার বাকি আরও দুটি। আরও একটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ শিরোপার সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে তিনি। রয়েছে কোপা ডেল রে শিরোপার হাতছানিও। এ দুটি জিতলে তার শো কেসে মোট ২৫টি ক্লাব শিরোপা দাঁড়িয়ে যাবে। একই সঙ্গে স্পেনকে একটি বিশ্বকাপ ও দুটি ইউরো চ্যাম্পিয়ন্সশিপ এনে দিয়েছেন তিনি।
বার্সার হয়ে খেলেছেন ৫০৫টি লিগ ম্যাচ। গোল ৫৮টি। সব মিলিয়ে বার্সার জার্সি গায়ে খেলেছেন ৭৬৪টি ম্যাচ এবং গোল করেছেন মোট ৮৪টি। বার্সার হয়ে সর্বকালের সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলার রেকর্ডও জাভির দখলে।
বার্সেলোনা ছেড়ে আগামী মৌসুমে কাতারের ক্লাব আল সা’দে যোগ দেবেনে জাভি। আবার ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের শুভেচ্ছাদূতও নির্বাচিত হয়েছেন তিনি।

