দিনাজপুর প্রতিনিধি : ‘ঘটনাটা শুক্রবারের। জুমার নামাজের পর ছাত্রদের লাইনে দাঁড় করান শিক্ষকরা। সেই লাইনে আমিও ছিলাম। শিক্ষকরা আমার কাছে এসে মাথায় প্রচণ্ড চাপ প্রয়োগ করে। এরপর এক শিক্ষক আমার বুকে হাত দিয়ে বলেন, এর বুক ধড়ফড় করছে। সেই চুরি করেছে। এরপর আমার হাত পা বাঁধা হয়। নির্দয়ভাবে পেটানো হয়। চিৎকার করলেও শিক্ষকরা ছেড়ে দেয়নি। এরপর আমি আর কিছু বলতে পারিনা।’
একথাগুলো মাদরাসার শিশু শিক্ষার্থী আবু সাঈদের। তার বয়স মাত্র নয় বছর। ফুটফটে চেহারা। কিন্তু শিক্ষকদের নির্মম নির্যাতনে পাল্টে গেছে সে চেহারা। দুপায়ের গোড়ালি থেকে উপরের দিকে নির্যাতনের দাগ। কথা বলতে গিয়ে কান্নায় হাঁপিয়ে উঠছিল।
দিনাজপুর সদর উপজেলার কমলপুর ইউনিয়নে নূরানী তালিমুল কোরআন হাফিজিয়া কওমী মাদরাসার হেফজ বিভাগের ছাত্র আবু সাঈদ। সে কমলপুরের জয়রামপুর গ্রামের হাসান আলীর ছেলে।
চুরির অপবাদ দিয়ে শিক্ষকরা মাদরাসার একটি কক্ষে রেখে তিনদিন ধরে তার ওপর শারিরীক ও মানসিক নির্যাতন চালান। পরে ঘটনা জানাজানি তাকে উদ্ধার করে দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
গত শুক্রবার থেকে রোববার পর্যন্ত নূরানী তালিমুল কোরআন হাফিজিয়া কওমী মাদরাসায় এ নির্মম ঘটনা ঘটে। সোমবার ঘটনা জানাজানি হলে ক্ষোভে ফেটে পড়ে এলাকার মানুষ। নির্যাতনকারী তিন শিক্ষকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছে এলাকাবাসী।
এদিকে, এলাকাবাসীর ভয়ে মাদরাসা থেকে পালিয়ে গেছেন নির্যাতনকারী শিক্ষকরা। মাদরাসা কর্তৃপক্ষ ঘটনার দায় স্বীকার করে বিষয়টি তদন্ত করতে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করে।
স্থানীয় জানায়, দিনাজপুর সদরের কমলপুর বাজারে অবস্থিত নূরানী তালিমুল কোরআন হাফিজিয়া মাদরাসাটি প্রতিষ্ঠিত হয় ২০০০ সালে। বর্তমানে ১৬০ জন ছাত্র এখানে পড়ালেখা করছে। গত শুক্রবার হেফজ বিভাগের শিশু ছাত্র আবু সাঈদকে চুরির অপবাদ দেয়া হয়। এরপর মাদরাসার শিক্ষক হাফেজ মো. রেজাউল ইসলাম, মাও. মো. রিয়াজুল ইসলাম ও হাফেজ মাও. মো. শরিফুল ইসলাম মিলে তাকে একটি কক্ষে হাত-পা বেঁধে আটকে রাখেন। এসময় ওই তিন শিক্ষক তিনটি লাঠি একত্র করে বেদম মারপিট শুরু করে। নির্মম নির্যাতনে শিশুটি জ্ঞান হারিয়ে ফেলার পরেও অব্যাহত রাখা হয় মারধর। এভাবে গত শুক্রবার থেকে রোববার পর্যন্ত দফায় দফায় চলে নির্যাতন।
শিশুটির বাবা হাসান আলী আর মা সহিদা বানু কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘আমার শিশু সন্তানের ওপর যেভাবে অমানষিক নির্যাতন চালানো হয়েছে, এরকম নির্যাতন মানুষ কোনো পশুকেও করে না। যারা এভাবে নির্যাতন চালিয়েছে তারা কখনো মানুষ নয়।
নির্যাতিত শিশুর বাবা-মা আরো বলেন, ‘তিন শিক্ষক মিলে আমাদের সন্তানকে মারধর করার পর হুমকি দিয়েছে। ঘটনাটি কাউকে না বলার জন্য শাসানো হয়। গত সোমবার দুপুর সাঈদের সহপাঠীদের কাছ থেকে তাকে মারপিটের কথা জানতে পারি। এরপর মাদরাসায় ছুটে যাই।
মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা মুহ্তামিম হাফেজ মো. গোলাম মোস্তফা ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, এভাবে কোনো শিক্ষক ছাত্রদের নির্যাতন করতে পারে না। এ ব্যাপারে মাদরাসার কোনো শিক্ষক তাকে কিছুই জানান নি। সোমবারের আগে আমি কিছুই জানতাম না। মাদরাসায় এসে ঘটনা জানতে পারি। শিক্ষকদের এ ধরণের আচরণ গ্রহণযোগ্য নয়।
মাদরাসা পরিচালনা কমিটির সভাপতি মো. মাজিদুর রহমান জুয়েলও ঘটনার সততা স্বীকার করে বলেন, ‘বিষয়টি তদন্তের জন্য পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।’
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে দিনাজপুর কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) একেএম খালেকুজ্জামান বিকেলে জানান, লোকমুখে ঘটনা জেনে এলাকায় অভিযান চালিয়ে অভিযুক্ত তিন শিক্ষককে আটক করেছি।

