নিজস্ব প্রতিবেদক : দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে রাবার ড্যাম নির্মাণের মাধ্যমে কৃষির উন্নয়ন ও ফসল উৎপাদন বৃদ্ধিতে কাজ করছে সরকার। এ লক্ষ্যে ২০০৯ সালে ‘খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে ক্ষুদ্র ও মাঝারী নদীতে রাবার ড্যাম নির্মাণ প্রকল্প’ নামে একটি প্রকল্প গৃহীত হয়। এটি সরকারের তিনটি সংস্থা স্থানীয় সরকার ও প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি), বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই)’র মাধ্যমে বাস্তবায়িত হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ২০০৯ সালে শুরু হওয়া এ প্রকল্পটি ২০১২ সালে সংশোধিত হয়। সংশোধিত প্রকল্পে বিএডিসি অতিরিক্ত আরো একটি রাবার ড্যাম নির্মাণের দায়িত্ব পায় এবং প্রকল্পের মেয়াদ ২০১৬ সালের জুন পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়।
জানা গেছে, প্রকল্পের বিএডিসি অঙ্গের মাধ্যমে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলার মেনংছড়ায় এবং সুনামগঞ্জের ছাতকে সোনাই নদীতে ২০১২ সালে রাবার ড্যাম নির্মিত হয়। এ ছাড়া, সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার দক্ষিণ বাদাঘাট ইউনিয়নে মিছাখালী নদীতে, চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার পারুয়া ইউনিয়নের ইছামতি ও পদুয়া ইউনিয়নের শিলক খালে রাবার ড্যাম নির্মিত হয়েছে। এর পাশাপাশি বাংলাদেশ জলবায়ু ট্রাষ্টের অর্থায়ণে শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার চেল্লাখালী নদীতেও নির্মিত হচ্ছে আরো একটি রাবার ড্যাম।
আমাদের ময়মনসিংহ প্রতিনিধি জানিয়েছেন, জেলার হালুয়াঘাট উপজেলার মেনংছড়া রাবার ড্যাম নির্মাণের ফলে ঐ অঞ্চলের কৃষি ও কৃষকের গতি ও জীবনধারায় পরিবর্তনের ছোঁয়া লেগেছে। কৃষি সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এই রাবার ড্যাম নির্মাণের ফলে প্রতি বছর প্রায় ২ হাজার ২৫০ মেট্রিক টন অতিরিক্ত খাদ্য উৎপাদিত হচ্ছে যার আনুমানিক মূল্য প্রায় ৪.৫ কোটি টাকা। প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, ৭ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এ রাবার ড্যামের মাধ্যমে বর্তমানে প্রায় ৫শ’ হেক্টর জমিতে গ্র্যাভিটি ফ্লো পদ্ধতিতে সেচ দেয়া সম্ভব হচ্ছে। ৩০ মিটার দীর্ঘ ও ৪.৫ মিটার উচ্চতার এ ড্যামের পাশাপাশি জনসাধারণের চলাচল ও কৃষি পণ্য পরিবহনের সুবিধার্থে ৩০ মিটার দীর্ঘ ফুটব্রীজ, পানি ব্যবস্থাপনা সমবায় সমিতির (পাবসস) অফিস ভবন, সেচের পানি সংরক্ষণের জন্য ছড়ার উভয় পাড়ে ডাইক নির্মাণ এবং গ্র্যাভিটি ফ্লোতে সরবরাহকৃত পানির অপচয়রোধে ভূগর্ভস্থ সেচনালা (বারিড পাইপ) স্থাপন করা হয়েছে।
এ ছাড়া ছাতক উপজেলার সোনাই নদীতে রাবার ড্যাম প্রকল্প চালু হওয়ার পর এ এলাকার কৃষি ব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। স্থানীয় কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, এই ড্যামের মাধ্যমে পানি সংরক্ষণ করে বর্তমানে প্রায় ১ হাজার হেক্টর জমিতে গ্র্যাভিটি ফ্লো পদ্ধতিতে সেচ দেয়া সম্ভব হচ্ছে। ফলে প্রতি বছর ৪ হাজার ৫শ’ মেট্রিক টন অতিরিক্ত খাদ্য উৎপাদিত হচ্ছে যার আনুমানিক মূল্য প্রায় ৯ কোটি টাকা। এ ড্যাম নির্মাণের ফলে বোরো এবং রবি ফসলে সেচকাজে ভূপরিস্থ পানি ব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং আমন ফসলে সম্পূরক সেচ প্রদানের মাধ্যমে খরা মোকাবেলা করা যাচ্ছে বলেও জানিয়েছে কৃষি বিভাগ। ১১ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ৫০ মিটার দীর্ঘ ও ৪ মিটার উচ্চতাবিশিষ্ট এ রাবার ড্যামসহ জনসাধারণের চলাচল ও পণ্য পরিবহনের সুবিধার্থে ৫০ মিটার দীর্ঘ ফুট ব্রিজ, পানি ব্যবস্থাপনা সমবায় সমিতির (পাবসস) অফিসভবন, জলাধারের পানি নিয়ন্ত্রণের জন্য ৩টি রেগুলেটর, গ্রাভিটি ফ্লো পদ্ধতিতে জলাধারের পানি সরবরাহের জন্য ৭টি ইনলেট-আউটলেট, নদীর উভয় পাড়ে ৪কিলোমিটার ডাইক নির্মাণ এবং ২.৫ কিলোমিটার নদী পুন:খনন করা হয়েছে। এছাড়াও প্রতিটি পানি ব্যবস্থাপনা সমবায় সমিতির (পাবসস) অফিসে বিকল্প শক্তি হিসেবে সৌর বিদ্যুৎ সংযোগসহ লাইট ও ফ্যান স্থাপন করা হয়েছে।
সুনামগঞ্জ জেলার বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার দক্ষিণ বাদাঘাট ইউনিয়নে মিছাখালী নদীতে প্রায় ৩৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ৫ স্প্যানবিশিষ্ট ২শ’ ২০ মিটার দৈর্ঘ্য ও ৪ মিটার উচ্চতাসম্পন্ন রাবার ড্যাম নির্মাণ কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে বলে জানা গেছে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এই রাবার ড্যাম সেচ সুবিধা প্রদানের জন্য ব্যবহৃত হবে না; এটি উজানের দেশ হতে আগাম বন্যা ও পাহাড়ি ঢল প্রতিরোধে ব্যবহৃত হবে। এর ফলে আগাম বন্যা ও পাহাড়ি ঢল হতে বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার আঙ্গুরালী ও করচা হাওরের প্রায় ৭ হাজার হেক্টর বোরো ফসল রক্ষা করা সম্ভব হবে। ফলে ৩২ হাজার মেট্রিক টন ফসল রক্ষা পাবে যার বাজার মূল্য আনুমানিক প্রায় ৫৬ কোটি ৭০ লাখ টাকা বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ।
এ ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের আওতায় বিএডিসি ১৪ কোটি টাকা ব্যয়ে চট্টগ্রাম জেলার রাঙ্গুনিয়া উপজেলার পারুয়া ইউনিয়নের ইছামতি নদীতে ৬২ মিটার দীর্ঘ ও ৪.৫ মিটার উচ্চতাবিশিষ্ট রাবার ড্যাম, জনসাধারণের চলাচল ও পণ্য পরিবহণের সুবিধার্থে ৬২মিটার দীর্ঘ ফুট ব্রীজ, পানি ব্যবস্থাপনা সমবায় সমিতির (পাবসস) অফিস ভবন, জলাধারের পানি নিয়ন্ত্রণের জন্য ২টি রেগুলেটর নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়া পানি ব্যবস্থাপনা সমবায় সমিতির (পাবসস) অফিসে বিকল্প শক্তি হিসেবে সৌর বিদ্যুৎ সংযোগসহ লাইট ও ফ্যান স্থাপন করা হয়েছে। ফলে অতিরিক্ত ১ হাজার হেক্টর জমি সেচের আওতায় এসেছে। এতে প্রতি বছর প্রায় ৯ কোটি টাকা মূল্যের ৪ হাজার ৫শ’ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য উৎপাদিত হচ্ছে।
বিএডিসি প্রায় ৯ কোটি টাকা ব্যয়ে চট্টগ্রাম জেলার রাঙ্গুনিয়া উপজেলার পদুয়া ইউনিয়নের শিলক খালে ৪০ মিটার দীর্ঘ ও ৪.৫ মিটার উচ্চতাবিশিষ্ট রাবার ড্যাম, জনসাধারণের চলাচল ও পণ্য পরিবহণের সুবিধার্থে ৪০মিটার দীর্ঘ ফুট ব্রীজ, পানি ব্যবস্থাপনা সমবায় সমিতির (পাবসস) অফিস ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়া পানি ব্যবস্থাপনা সমবায় সমিতির (পাবসস) অফিসে বিকল্প শক্তি হিসেবে সৌর বিদ্যুৎ সংযোগসহ লাইট ও ফ্যান স্থাপন করা হয়েছে। ফলে অতিরিক্ত ৫শ’ হেক্টর জমি সেচের আওতায় এসেছে। এতে প্রতি বছর প্রায় ৪.৫ কোটি টাকা মূল্যের ২ হাজার ২শ’ ৫০ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য উৎপাদিত হচ্ছে।
এ ছাড়া ১৪ কোটি টাকা ব্যয়ে শেরপুর জেলার নালিতাবাড়ী উপজেলার চেল্লাখালী নদীতে ৩৬ মিটার দীর্ঘ ও ৪.৫ মিটার উচ্চতাবিশিষ্ট রাবার ড্যাম, পানি ব্যবস্থাপনা সমবায় সমিতির (পাবসস) অফিস ভবন নির্মাণ ও প্রায় ৮ কিলোমিটার নদী পুন:খনন কাজ করা হচ্ছে। পাশাপাশি পানি ব্যবস্থাপনা সমবায় সমিতির (পাবসস) অফিসে বিকল্প শক্তি হিসেবে সৌর বিদ্যুৎ সংযোগসহ লাইট ও ফ্যান স্থাপন করা হবে। এ ড্যামটি নির্মাণের ফলে অতিরিক্ত ৫শ’ হেক্টর জমি সেচের আওতায় এসেছে। এতে প্রতি বছর প্রায় ৪.৫ কোটি টাকা মূল্যের ২ হাজার ২শ’ ৫০ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য উৎপাদিত হবে বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ।
জানতে চাইলে বিএডিসি অঙ্গের প্রকল্প পরিচালক হাফিজুল্লাহ চৌধুরি দৈনিক পাঞ্জেরীকে বলেন, রাবার ড্যাম নির্মাণের ফলে প্রকল্প এলাকার জমিগুলোতে সারা বছর পানি ও সবুজের সমারোহ অব্যাহত থাকে। ফলশ্রুতিতে তাপমাত্রা হ্রাস পায় ও আর্দ্রতা বৃদ্ধি পায়, যা বৃষ্টিপাত বৃদ্ধিতে সহায়ক। জলাধারে সারা বছর পানি মজুদ থাকায় রিচার্জ হয়ে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর উপরে উঠে আসে। রাবার ড্যামের মাধ্যমে জলাধারে সংরক্ষিত ভূপরিস্থ পানি সেচ কার্যক্রমে ব্যবহার করে ফসল উৎপাদন আশাতীত পরিমাণে বৃদ্ধি করা সম্ভব বলে তিনি মতামত প্রদান করেন। এ ছাড়া রাবার ড্যাম জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুকি মোকাবেলা করে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় সহায়ক ভূমিকা পালন করে বলেও জানান তিনি।



