ঢাকাThursday , 7 May 2015
  1. অর্থনীতি
  2. আইন-আদালত
  3. আন্তর্জাতিক
  4. আবহাওয়া
  5. কৃষি ও অন্যান্য
  6. খেলাধুলা
  7. গল্প ও কবিতা
  8. জাতীয়
  9. তথ্যপ্রযুক্তি
  10. দেশজুড়ে
  11. ধর্ম ও জীবন
  12. প্রবাস
  13. বানিজ্য
  14. বিনোদন
  15. বিশেষ প্রতিবেদন
আজকের সর্বশেষ সবখবর

ধানের বাম্পার ফলনেও কৃষকের কান্না

Link Copied!

paddyপাঞ্জেরী ডেস্ক : রোদে পুড়ে আর বৃষ্টিতে ভিজে কৃষকের হাড়ভাঙা পরিশ্রমের পর ক্ষেতের ধানে সোনালী রঙ হয়েছে। তাই পাকা ধান কাটতে এখন ব্যস্ত উত্তরাঞ্চলের কৃষকরা। কিন্তু এবার ধানের বাম্পার ফলন হলেও কৃষকের মুখে যেন হাসি নেই। উৎপাদন খরচের তুলনায় বাজারে ধানের দাম অনেক কম হওয়ায় আনন্দের পরিবর্তে তাদের চোখে-মুখে যেন কান্নার ছাপ।
একদিকে বাজারে ধানের দাম কম অন্যদিকে কাটা-মাড়াইয়ে শ্রমিকের চরম সঙ্কট হওয়ায় পুরো উত্তরাঞ্চলজুড়ে মজুরি বাড়িয়ে ‍দিয়েছে শ্রমিকরা। এতে বাড়তি টাকা গুণতে হচ্ছে চাষীদের। অনেক জেলায় বেশি মজুরি দিয়েও শ্রমিক পাচ্ছে না কৃষকরা। এছাড়া ধান কাটা-মাড়াইয়ের পর ধান কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে বিধায় কৃষকরা পড়েছেন চরম বিপাকে। এতে তাদের লোকসান হচ্ছে এলাকাভেদে বিঘাপ্রতি ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা।
আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-
বগুড়া প্রতিনিধি :  উত্তরাঞ্চলে পুরোদমে শুরু হয়েছে বোরো ধান কাটা-মাড়াই। এ অঞ্চলে একসঙ্গে ১ কোটি ৩৬ লাখ বিঘা জমির ধান পেকেছে। তাই তীব্র সঙ্কট দেখা দিয়েছে ধানকাটা শ্রমিকের। চাহিদার এক তৃতীয়াংশ শ্রমিকও পাওয়া যাচ্ছে না ধান কাটার জন্য। এতে শ্রমিকদের মজুরি বেড়েছে দুই গুণেরও বেশি। ফলে ধান লাগানো, পরিচর্যা, অন্যান্য খরচসহ কাটা-মাড়াইয়ে যে পরিমান খরচ হচ্ছে সে তুলনায় ধানের দাম অনেক কম হওয়ায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন কৃষকরা। তাদের বিঘা প্রতি লোকসান হচ্ছে গড়ে অন্তত ৪ হাজার টাকা।
বগুড়াসহ উত্তরাঞ্চলের কৃষি অফিস ও কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, উত্তরের বিভিন্ন জেলার হাট-বাজারে চিকন ধান মণপ্রতি ৫৫০ টাকা ও মোটা ধান ৩৫০-৪০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। ধানের বর্তমান বাজার দর ও কাটা-মাড়াইয়ে অন্য বছরের তুলনায় ২-৩ গুণ বেশি খরচ হওয়ায় বোরো চাষীদের বিঘা প্রতি ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা করে লোকসান গুনতে হচ্ছে। যাদের ফলন কম হয়েছে তাদের লোকসানের অংক আরও বাড়বে বলে জানিয়েছেন কৃষকরা।
কৃষকরা জানান, এক বিঘা জমির ভাড়া ৬ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা, সেচ ১ থেকে দেড় হাজার টাকা, হাল চাষ-রোপনে কৃষাণ খরচ ২ হাজার টাকা, সার-বীজ-নিড়ানি-কীটনাশক ২ হাজার টাকা, কাটা-মাড়াই ৩ থেকে সাড়ে ৪ হাজার টাকা লাগছে এ বছর। অন্যদিকে গেলো বছর এক বিঘা জমির ধান কাটা মাড়াইয়ে দেড় থেকে ২ হাজার টাকা খরচ হয়েছিল।
তবে এবার শ্রমিকরা ধান মাঠ থেকে ভারে করে ও মাথায় করে নিয়ে আসছে এবং মাড়াইকলে দিয়ে মাড়াই করা হচ্ছে। মাড়াইকলের টাকাও চাষীদের দিতে হচ্ছে। এবার ঝড়-বৃষ্টিতে ধান এলোমেলো হয়ে গেছে। জমিতে পানি জমে থাকায় ধান কাটতে বেশি সময় ও পরিশ্রম হচ্ছে। এজন্য এবারে কাটা-মাড়াইয়ে গত বারের চেয়ে মজুরি বেশি দিতে হচ্ছে শ্রমিকদের। এতে লোকসানের পরিমান বাড়ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ বগুড়া আঞ্চলিক অফিসের অতিরিক্ত পরিচালক ড. এস এম আবুল হোসেন জানান, এবার উত্তরাঞ্চলের ১৬ জেলায় প্রায় ১৮ লাখ ১৫ হেক্টর বা ১ কোটি ৩৬ লাখ বিঘা জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূল ও নিরবিচ্ছিন্ন সেচ সুবিধা থাকায় বোরোর বাম্পার ফলন আশা করছে কৃষি বিভাগ।
এদিকে রাজশাহী বিভাগ ও রংপুর বিভাগের আঞ্চলিক কৃষি অফিস থেকে জানা গেছে, ১৬ জেলায় ১৮ লাখ ১৫ হাজার হেক্টরে বোরো আবাদ হয়েছে। সম্ভাব্য উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৮১ লাখ ৬৭ হাজার ৫০০ টন ধান অথবা ৪৯ লাখ ৫০০ টন চাল। ধানের হেক্টর প্রতি গড় ফলন ধরা হয়েছিল ৪.৫ টন। চালের হেক্টর প্রতি ২.৭ টন।
নড়াইল প্রতিনিধি : নতুন ধান ঘরে উঠবে এ আশায় কৃষকের মনে আনন্দ থাকার কথা থাকলেও বিষাদে ভরে যাচ্ছে তাদের মন। ধানের বাম্পার ফলন হলেও উৎপাদন খরচেন তুলনায় বাজারে দাম কম হওয়ায় কৃষকরা হতাশা হয়ে পড়েছেন। তাদের তাবি কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ধান ক্রয় করলে তাদের লাভ হবে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২০১৪-১৫ মওসুমে ৪০ হাজার ৭২২ হেক্টর জমিতে বোরোধানের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলে আবাদ হয়েছে ৪১ হাজার ৭৩০ হেক্টরে। এর মধ্যে হাইব্রিড ১৫ হাজার ৭২০ হেক্টর, উচ্চ ফলনশীল (উফশী) ২৫ হাজার ৯৫০ হেক্টর ও স্থানীয় ৬০ হেক্টরে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। গত মুসুমে (২০১৩-১৪) আবাদ হয়েছিল ৪১ হাজার ৫০৫ হেক্টরে। গত মওসুমের চেয়ে চলতি মওসুমে বোরোর আবাদ যেমন বেড়েছে, তেমনি ফলনও ভালো হয়েছে জানায় কৃষি অফিস।
ধানের দাম কমের ব্যাপারে সদর উপজেলার সীমাখালী গ্রামের আতাউর রহমান  বলেন, ‘বর্তমানে প্রতিমণ ধান সাড়ে ৫ থেকে ৬০০ টাকা বিক্রি হচ্ছে। এতে কৃষকের লাভ হচ্ছে না। ধানের দাম কমপক্ষে প্রতিমণ ৭৫০ থেকে ৮০০ টাকা দরে বিক্রি হলে কৃষকদের জন্য ভাল হতো।’
একই গ্রামের ইশারত শেখ জানান, বোরো আবাদের শুরু থেকে কেটে ঘরে তোলা পর্যন্ত সকল খরচ বাদে লাভতো দূরের কথা আসলই উঠছেনা। সরকার সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে ধান কিনলে হয়তো খরচ বাঁচবে।
বালিয়াডাঙ্গী (ঠাকুরগাঁও) প্রতিনিধি : অন্যান্য জেলার মতো ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গীতেও ধানের দাম পাচ্ছেনা কৃষকরা। সেইসঙ্গে রয়েছে শ্রমিক সঙ্কটও। ফলে গত বছরের তুলনায় শ্রমিকদের দিগুন মজুরি দিয়ে কৃষকরা তাদের ধান কেটে বাড়িতে তুলছে।
উৎপাদন খরচের তুলনায় দাম কম হওয়ায় বাজারে ধান বিক্রি করতে গিয়ে তারা হতাশ হয়ে পড়েছে। মণপ্রতি যে দাম পাওয়ার যাচ্ছে তা দিয়ে লাভতো দূরের কথা প্রতি বিঘায় আড়াই হাজার টাকা লোকসানের আশঙ্কা করছে কৃষকরা।
উৎপাদন খরচের সঙ্গে বেশি মজুরি দিয়ে ধান কাটা-মাড়াই করতে হচ্ছে বিধায় উৎপাদন খরচ আরও বেড়ে যাচ্ছে। এর বিপরীতে বাজারে ধানের দাম কম। এতে লোকসানের পরিমান বেড়ে যাচ্ছে। তবে ধান ব্যবসায়ীরা বলছেন, চাতাল মিল মালিকরা পুরোদমে ধান ক্রয় না করা-ই দর পতনের মূল কারণ।
বালিয়াডাঙ্গী উপজেলা বাদমেছিল গ্রামের কৃষক আব্দুল খালেক বলেন, ‘ধানের ন্যায্য মূল্য না পাওয়ায় আমাদের চরম ক্ষতি হচ্ছে। সরকার যদি মওসুমের শুরুতেই কৃষক পর্যায় থেকে সরকারি খাদ্য গুদামে ধান ক্রয় করে তাহলে আমরা উপকৃত হবো। দাম ভালো পাবো।
উপজেলার সবচেয়ে বড় ধানের মোকাম লাহিড়ী হাটের ধান ব্যবসায়ী সিরাজুল ইসলাম বাদল বলেন, ‘কৃষকরা প্রতিদিন প্রচুর পরিমাণ ধান হাটে বিক্রি করতে নিয়ে আসছেন। ২৮ বিড়ি জাতের ধান ৫৬০ থেকে মানভেদে ৫৯০ টাকা পর্যন্ত আমরা ধান কিনছি।’
বালিয়াডাঙ্গী উপজেলা কৃষি অফিসার আনিসুর রহমান জানান, ধানের বাজার কম হওয়ায় কৃষকদের এবার লাভের পরিবর্তে লোকসানের কবলে পড়তে হবে।
উত্তরাঞ্চলের প্রধান ফসল বোরো ধান। প্রায় ৫৬ লাখ কৃষক পরিবার এই ফসলের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। বোরো চাষে লোকসান হওয়ায় কৃষি অর্থনীতির উপরে বড় ধরণের আঘাত আসবে। বোরো ফসলে লোকসানের কারণে আগামী আউশসহ বিভিন্ন ধান চাষ কৃষকরা কমিয়ে দিতে পারে বলেও ধারণা করা হচ্ছে। তাই এ ব্যাপারে পয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন কৃষকসহ সংশ্লিষ্টরা।