সাভার প্রতিনিধি : উদ্ধার কাজ শেষে বাড়ি ফিরে গেছে প্রশিক্ষিত উদ্ধারকারীরা। রানা প্লাজাকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করে টিন আর কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে চলে গেছে সরকারের প্রশাসনিক কর্তারা। কেউ কোনো দিন আর দেখতেও আসেনি। কাঁটাতারের বেড়ায় এতো দিনে মরিচা ধরে গেছে। ফেলে দেয়া কাপড়ের বান্ডিলের উপর গজিয়েছে ছোট ছোট আগাছা। তবুও পরিত্যক্ত জিনিসপত্র উল্টে-পাল্টে এখনো মাঝে মধ্যেই লাশ খুঁজে বেড়ায় এক ‘পাগল’। যিনি সে সময় ছিলেন দিনমজুর। ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়াদের উদ্ধার করতে গিয়ে এক পর্যায়ে হয়ে গেছেন ‘পাগল’। বিনিময়ে তিনি পেয়েছেন শুধু ‘নায়ক’ খেতাব।
সাভারের রানা প্লাজার ভবন ধসে নিহত শ্রমিকের লাশের পচা গন্ধ মিলিয়ে গেছে অনেক আগেই। পচা বীভৎস আর বিকৃত লাশের সেসব দৃশ্য কেবল মাত্র মহৎ মনের উদ্ধারকর্মীদের চোখেই আটকে আছে। অর্ধ গলিত মরদেহের গন্ধ সহ্য করে দিনের পর দিন, রাতের পর রাত কাজ করে গেছেন তারা। নায়ক খেতাব পাওয়া এই উদ্ধারকর্মীদের একজন মারা গেছেন তীব্র মানসিক যন্ত্রণায়। অনেকেই হারিয়েছেন মানসিক ভারসাম্য। ঘটনার দুই বছর পার হয়ে গেলেও সরকারের পক্ষ থেকে কোনো খোঁজই নেয়া হয়নি উদ্যোমী ও সাহসী এই মানুষগুলোর।
ভবন ধসের পর দক্ষ জনবল ও প্রয়োজনীয় উপকরণের অভাবে উদ্ধার কাজ ব্যাহত হতে থাকে। উদ্ধার তৎপরতায় ধীরগতি দেখে, কোনো কিছু না ভেবেই উদ্ধার কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ে সাধারণ মানুষ। উদ্ধারকাজের নন্যুতম অভিজ্ঞতা ছিল না কারো। তবুও ভবনের নিচে আটকে পড়া মানুষের জীবন বাঁচানোর তাগিদেই ঝুঁকি নিয়ে তারা ঢুকে পড়েছেন ধ্বসস্তূপের ভেতরে। হাত-পা কেটে হলেও বের করে এনেছেন একেকটি জীবন্ত প্রাণ। বিকৃত হয়ে যাওয়া পচা লাশের গন্ধ উপেক্ষা করে তারা সন্ধান করেছেন জীবিত কোনো প্রাণের স্পন্দন।
রফিক মিয়ার বয়স পঁয়ত্রিশের কাছাকাছি। হেংলা-পাতলা দেহের গড়ন। পেশায় রাজমিস্ত্রী। দৈনিক মজুরিতে কাজ করে যা আয় হতো তা দিয়েই খেয়ে পরে দিন চলে যেত রফিকের। ঘরে বৃদ্ধ মা, তিন সন্তান আর স্ত্রী নিয়েই ছিল তার যত চিন্তা। যেদিন কাজ পেতেন না সেদিন রিকশা চালাতেন।
২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সকালে সাভারের চাপাইন মহল্লার একটি বাড়িতে দৈনিক মজুরিতে কাজ করছিলেন। লোক মুখে শুনতে পারেন রানা প্লাজা ভেঙে পড়েছে। খবর শোনার পর থেকেই কাজে মনোযোগ দিতে পারছিলেন না। দুপুরের পর কাজ ফেলে ছুটে যান রানা প্লাজার সামনে। কোনো কিছু চিন্তা না করেই আর সবার সঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়েন আহতদের উদ্ধারে।
রফিকের পরিবারের সদস্যরা জানায়, ১৪ মে উদ্ধারকাজ পুরোপুরি শেষ হওয়ার পর বাড়িতে আসেন রফিক। কিন্তু রাতে ঘুমাতে পারেন না। হঠাৎ ঘুমিয়ে পড়লেও ঘুমের ঘোরে চিৎকার করে উঠেন, ‘এই জায়গায় লাশ আছে, ব্যাগ আনেন, কাপড় আনেন। দিনে ঘুরে ফিরে আবার চলে যেতেন রানা প্লাজার সামনে। কিছুদিন এভাবে চলার পর পুরোপুরি অসুস্থ হয়ে পড়েন। সব সময় শুধু লাশ খোঁজেন। এক পর্যায়ে তাকে ঢাকার শেরে বাংলানগরের জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়। দীর্ঘদিন তাকে সেখানে চিকিৎসা দেয়া হয়।
ফুয়াজ আলী (৪০) ইট-বালুর ব্যবসা করতেন। স্ত্রী সন্তান নিয়ে সুখের সংসার ছিল তার। ভবন ধসের খবর পেয়ে দেখতে ছুটে যান তিনি। আহত মানুষের আহাজারি ও বিভৎসতা দেখে কোনো কিছু না ভেবেই উদ্ধার কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন। রানা প্লাজার পাশের ভবনের একটি সুরঙ্গ দিয়ে প্রবেশ করেন ভেতরে। মুহূর্তের মধ্যে অর্ধমৃত এক শ্রমিককে কাঁধে তুলে নিয়ে বেরিয়ে আসেন আলোতে। দেহের মধ্যে অন্যরকম এক আলোড়ন জাগে তার। জীবন্ত মানুষ উদ্ধারের নেশায় পেয়ে বসে তাকে। শুরু থেকে শেষ দিন পর্যন্ত এক টানা কাজ করে গেছেন। দুই হাতে উদ্ধার করেছেন শতাধিক জীবিত ও মৃত মানুষ। এরপর ফিরে গেছেন নিজের সংসারে।
কিন্তু ততদিনে উদ্ধার কাজের বিভৎস স্মৃতি তার বুকের মাঝে শিকড় গেড়ে বসে গেছে। দিন-রাত ঘুমাতে পারন না। খাওয়া দাওয়া ছেড়ে দেন এক পর্যায়ে। পুরোপুরি অসুস্থ হয়ে পড়েন। সারা দেহে ফোসকা পড়ে যায়। এখনো তার সারা দেহে অসংখ্য কালো-কালো দাগ হয়ে রয়ে গেছে। অনেক চিকিৎসা করেও তা সারানো যাচ্ছে না। হয়তো সারা জীবন বয়ে বেড়াতে হবে এই দাগ।
নিজের দীর্ঘদিনের চিকিৎসা ও সংসারের ব্যয় বহন করতে গিয়ে একদিন বন্ধ হয়ে যায় ছোট ব্যবসাটিও। এরপর থেকে বেকার হয়ে পড়েন তিনি। অসুস্থ শরীরে ছোট-খাট কাজ করেই এখন জীবিকা নির্বাহ করতে হচ্ছে তাকে। তবুও শত কষ্টের মাঝেও সময় পেলেই মানুষকে শোনান জীবনের অসামান্য গল্প।
আব্দুর রহমান (তোতা মিয়া) (৩০) সাভারের একটি এনজিওতে মাঠকর্মী হিসেবে কাজ করতেন। ভবন ধসের খবর পেয়ে দেখতে যান ঘটনাস্থলে। সেখানে গিয়ে দর্শকের কাতারে থাকতে পারেন নি। আহতদের উদ্ধারে ঝাঁপিয়ে পড়েন। এরপর উদ্ধার কাজ শেষ হওয়ার পর বাড়ি ফেরেন। তবে বাড়ি ফিরে ভুগতে থাকেন মানসিক সমস্যায়। ঠিক ভাবে কাজ করতে না পারার কারণে এনজিওর চাকরিটিও চলে যায় একদিন। এর পর থেকে বেকার হয়ে পড়েন।
ঠিক এভাবেই ভবন ধসের দিন থেকে শুরু করে শেষ পর্যন্ত মাহবুবা পারভীন, মোহাম্মদ সামছুল হক বাবু, আবুল কালাম আজাদ, হাসান মাহমুদ ফোরকান, জিন্নাতুল ইসলাম, দারোগা আলী, আলম রাসেল রেজা, রফিক মিয়াসহ শত শত সাধারণ উদ্ধার কর্মীরা কাজ করেছেন। সরকারিভাবে দেড়শ জন উদ্ধারকর্মীর নাম সংগ্রহ করে একটি তালিকা তৈরি করা হয়। যাদের জন্য নিশ্চিত মৃত্যুকুপ থেকে বেঁচে গিয়েছে প্রায় আড়াই হাজার শ্রমিক। ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে বের করে নিয়ে এসেছেন শত শত মৃতদেহ।
মানবসৃষ্ট বিপর্যয়ে মানুষের পাশে উদারহস্তে উদ্ধারকর্মী রূপে দাঁড়িয়েছিল যে মানুষগুলো, সেই মহৎ মনের নায়ক খেতাব পাওয়া উদ্ধারকর্মীরাই এখন মানসিক বিপর্যয়ের দারপ্রান্তে। বেশির ভাগই হারিয়ে ফেলেছেন মানষিক ভারসাম্য। দুই বছর হয়ে গেলেও সরকারের পক্ষ থেকে কোনো খোঁজই নেয়া হয়নি উদ্যোমী ও সাহসী এই মানুষগুলোর। অবহেলিত ওইসব মহামানুষের পরিবার তাদের জীবনে ভালোভাবে বেঁচে থাকার জন্য সরকারের কাছ থেকে কোনা আর্থিক সহায়তাও পায়নি। হয়তো সরকার তাদের সহায়তা করে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সুযোগ করে দেবে এমন প্রত্যাশা নিয়েই দিন গুণছেন তারা।

