ঢাকাTuesday , 14 April 2015
  1. অর্থনীতি
  2. আইন-আদালত
  3. আন্তর্জাতিক
  4. আবহাওয়া
  5. কৃষি ও অন্যান্য
  6. খেলাধুলা
  7. গল্প ও কবিতা
  8. জাতীয়
  9. তথ্যপ্রযুক্তি
  10. দেশজুড়ে
  11. ধর্ম ও জীবন
  12. প্রবাস
  13. বানিজ্য
  14. বিনোদন
  15. বিশেষ প্রতিবেদন
আজকের সর্বশেষ সবখবর

রমনা বটমূলে নববর্ষ আবাহন

Link Copied!

romnaনিজস্ব প্রতিবেদক: সূর্য তার সময়েই উঠেছে, বাঙালি জেগেছে আগে। পরনে চাপিয়েছে লাল-সাদা বর্ণের বসন। পাড়ি দিয়েছে পথ, যেখানে বলা হচ্ছিল শান্তি-মানবতার কথা। মানুষের অধিকার আদায়ের সুরেলা আয়োজন ছিল অশ্বথ ছায়াবিথীতলে। কেউ জানে না কারণ, সবাই যাকে ডাকে- রমনা বটমূলে। দেশের ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানট এবার নিয়ে ৪৭তম বারের মতো আয়োজন করলো বর্ষবরণের আবাহনের এ অনুষ্ঠান। প্রতিবারের মতো এবারো লাখো প্রাণের সম্মিলনে পরিণত হয় রমনা উদ্যানের বটমূল থেকে শুরু করে আশেপাশের পুরো পরিধি।
বঙ্গাব্দ ১৪২২’র প্রথম সূর্যটা যখন পূর্বের আকাশ থেকে উঁকি মারছিলো, তখন থেকেই রমনা উদ্যানে প্রাণের উচ্ছ্বাস। অশ্বথমূলকে ঘিরে হাজারো মানুষ গায়ে গায়ে মিশে দাঁড়িয়ে এবং বসে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত ছিল নতুন বছরের প্রথম সকালকে। গাছের সবুজ পাতা ভেদ করে মঞ্চে উপবিষ্ট শিল্পীদের গালে নরম সাদা রোদ এসে পড়লে অন্য এক দৃশ্যের জন্ম হয়। এ সময় মঞ্চ থেকে ভেসে এলো
সেতারের সুরেলা ধ্বনি। ছায়ানট বিদ্যায়তনের শিক্ষক এবাদুল হক সৈকত ধ্যানস্ত ঋষির মতো করে পরিবেশন করেন রাগ পরমেশ্বরী। রাগের উত্থান-পতনের মাঝে তন্ময় হয়ে পড়েন শ্রোতারা। সেতারের সুর শেষে যখন চোখ মেলেন, তখন তাদের পাশের ভিড় যেন বেড়েছে আরো কয়েকগুণ।
বরাবরের মতো করেই মূল মঞ্চে বসেছিলেন ছায়ানট বিদ্যায়তনের নানা বর্ষের শিল্পীরা। বড়দের মধ্যে ছিলো চতুর্থ ও পঞ্চম সমাপনী বর্ষের বাছাই করা শিল্পীরা। আর খুদে গাইয়েরা ছিলো ছায়ানটের প্রারম্ভিক শিশু প্রথম ও দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীরা। সংখ্যা এরা ৯৫ জন। বড় মেয়েদের পরনে অফ হোয়াইট বর্ণের শাড়ি ও মেরুণ ব্লাউস। ছোট্ট মেয়েদের শাড়ির বর্ণ ছিলো হালকা হলদে। আর খোঁপায় এদের সকলেই গেঁথেছিলেন বেলি ফুলের মালা। যাতে সুরের সঙ্গে সৌরভও ছিল পুরো আয়োজন জুড়ে। আর ছেলে শিল্পীরা গায়ে চড়িয়েছিলেন সাদা রঙের পাঞ্জাবি।
প্রতিবছরের মতো এবারো ছায়ানটে একটি বিশেষ বিষয়ের উপর নিজেদের আয়োজনটি সাজায়। যার মূল প্রতিপাদ্য- ‘শান্তি, মানবতা ও মানুষের অধিকার’। এ বিষয়ের উপর ভিত্তি করে সঙ্গীত ও কবিতা পাঠের মধ্যে নতুন দিনের বাংলাদেশ গড়ার শপথ নেন সকলে।
বর্ণনা তো অনেক হলো, এবার সুরের মালায় গাঁথা হবে প্রতিবেদনটি। সেতারের সুর শেষ হতে না হতেই সবগুলো কণ্ঠ এক হয়ে গেয়ে শোনালো ‘ধ্বনিল আহ্বান মধুর গম্ভীর’। প্রায় শতকণ্ঠের সুরলহরী থামতেই লাইসা আহমেদ লিসা পরিবেশন করেলেন ‘নিশিদিন মোর প্রাণে’ গানটি। এবার খুদে কণ্ঠের পরিবেশনা- ‘ওঠো ওঠো রে’।  এরপর দুইটি একক গান; ফারহানা আক্তার শ্যার্লি গাইলেন ‘ভোরের হাওয়ায় এসে’
আর ছায়ানটের সাধারণ সম্পাদক খায়রুল আনাম শাকিলের কণ্ঠে শোনা গেলো আলোকিত সকালের জাগ্রত হওয়ার আহ্বান ‘জাগো অরুণ ভৈরব’। ছায়ানটের জেষ্ঠ্য শিক্ষার্থীদের কণ্ঠে এরপর গীত হয় ‘শুভ্র সমুজ্জ্বল হে চির নির্মল’ গানটি।
শিল্পী তানিয়া মান্নান ঝটপট গেয়ে ফেললেন ‘আমি তোমারি মাটির কন্যা’ গানটি। এরপর গান থেকে ক্ষণিকের বিরতি। পাঠ নিয়ে মঞ্চে আসেন আব্দুস সবুর খান চৌধুরী। তিনি পাঠ করেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘চিরযাত্রী’ কবিতাটি। তার ভরাট কণ্ঠে সকালে নির্মল বাতাসে ভেসে আসে- ‘অস্পষ্ট অতীত থেকে বেরিয়ে পড়েছে ওরা দলে দলে,/ ওরা সন্ধানী, ওরা সাধক,/ বেরিয়েছে পুরাপৌরাণিক
কালের/ সিংহদ্বার দিয়ে…।’
পাঠের মুগ্ধতার রেশ থাকতে থাকতেই ছায়ানটের বড় ও ছোট শিক্ষার্থীরা এক হয়ে পরিবেশন করে ‘মোরা সত্যের পরে মন’ গানটি। এরপর ছোটদের কণ্ঠে ‘জয় হোক জয় হোক’ ও বড়দের কণ্ঠে পরিবেশিত হয় ‘ওরে বিষয়ম দইরার ঢেউ’ গানটি। এরপর বরেণ্য রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী মিতা হকের কণ্ঠে পরিবেশিত হয় ‘ওরে ভাই মিথ্যা ভেবো না’ গানটি।
এরপর একক সঙ্গীত পরিবেশন করেন নাসিমা শাহিন ফ্যান্সি। তিনি গেয়ে শোনান ‘নিচুর কাছে নিচু হতে’ গানটি। সিফায়েত উল্লাহ মুকুল পরিবেশন করেন ‘যদি তোর ভাবনা থাকে’। বিদ্যায়তনের ছোট শিল্পীদের কণ্ঠে গীত হয় ‘আলোর দেশ থেকে’ ও বড়দের কণ্ঠ থেকে নিঃসৃত হয় ‘সংঘ শরণ তীর্থযাত্রা পথে’ গান দুইটি। মাহমুদুল হাসান পরিবেশন করেন ‘জাগো সত্যের শুভ্র আলোয়’, মোহিত খান পরিবেশন করেন ‘ও ভাই খাঁটি সোনার চেয়ে খাঁটি আমার বাংলাদেশের মাটি’।
ছায়ানটের জ্যেষ্ঠ শিল্পীরা এরপর গেয়ে শোনান ‘ও আলোর পথযাত্রী’ গানটি। বিজনচন্দ্র মিস্ত্রী পরিবেশন করেন ‘জাগো অনশন বন্দি ওঠো রে’ ও চন্দনা মজুমদার গেয়ে শোনান ‘মানুষ গুরু নিষ্ঠা যায়’।
এরপর আয়োজনের শেষ পাঠ। লিয়াকত খান পাঠ করে শোনান ‘বাংলাদেশ’ কবিতাটি। যা মুক্তিযুদ্ধের সময় লিখেছিলেন আমাদের সুহৃদ পাকিস্তানের কবি কাইফি আজমী। যার বঙ্গানুবাদ করেছেন মৌরি আইয়ূব। একজন পাকিস্তানি নাগরিক হয়েও বাংলাদেশের প্রতি তার মমত্ববোধ ফুটে ওঠে এই কবিতায়- ‘তুমি জ্বালিয়ে ছাই করে দিতে পার/ আমি সেরকম কোনো দেশ নই/ তুমি ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে পার/ আমি সে রকম কোনো দেয়াল নই…কী অবাক কী আশ্চর্য দ্যাখো/ চৌদ্দ কোটি হস্ত আজ শূন্যে উত্থিত/ কোন হাতে পরাবে শিকল/ আমার স্কন্ধে সাত কোটি উদ্ধত মস্তক/ কটি তার ছিন্ন করবে তুমি !!’।
এরপর শেষ একক কণ্ঠে গান পরিবেশন করেন সুকান্ত চক্রবর্তী। তার কণ্ঠে গীত হয় ‘ব্যর্থ প্রাণের আর্বজনা’ গানটি। এরপর ১৪ বছর আবারো ছায়ানটের পহেলা বৈশাখের প্রভাতী আয়োজন থেকে ধ্বনিত হয় কবিগুরুর লেখা অমর গান ‘এসো হে বৈশাখ’ গানটি। ছায়ানটের ছোট-বড়, আমন্ত্রিত সব শিল্পীদের একসঙ্গে গেয়ে শোনানো হয় গানটি। যাতে সুরে মেলাতে ভোলেননি রমনার বটমূলে উপস্থিত লাখো মানুষ। এরপর ছায়ানট সভাপতি রবীন্দ্র গবেষক ড. সনজীদা খাতুন অংশ নেন বৈশাখ কথনে। যার কথা শেষে ছায়ানটের খুদে শিল্পীরা গেয়ে শোনায় ‘ধিন ধিন ধিন তাক ধিনা ধিন’ গানটি। ছায়ানটের রীতি অনুযায়ী জাতীয় সঙ্গীতের পরিবেশনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় পহেলা বৈশাখের সবচেয়ে আর্কষণীয় আয়োজনটি।
পুরো আয়োজনে সবার সঙ্গে বেহালায় ছিলেন আলমাছ আলী, এসরাজে অসিত বিশ্বাস, ঢোলে দশরথ দাশ, দোতরায় রতন কুমার রায়, তবলায় এনামুল হক ওমর, সুবীর ঘোষ ও স্বরূপ হোসেন এবং মন্দিরায় ছিলেন প্রদীপ কুমার রায়।