ঢাকার আশুলিয়ার পুরাতন গরুর হাট সংলগ্ন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে গড়ে উঠেছে মাদকের এক অন্ধকার সাম্রাজ্য। এলাকাবাসীর অভিযোগ, সংঘবদ্ধ একটি চক্র প্রকাশ্যেই গাঁজা, ইয়াবা ও বিদেশি বিভিন্ন ব্র্যান্ডের মাদক বিক্রি করে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান হলেও থেমে নেই তাদের কার্যক্রম।
স্থানীয় সূত্র ও অনুসন্ধানে জানা যায়, এই চক্রের নেতৃত্বে রয়েছে মাতাল মান্নানের ছেলে মামুন খন্দকার। তার সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িত রয়েছে তার চাচাতো ভাই রাতুল খন্দকার ও রাজীব খন্দকার। এছাড়া তাদের সহযোগী হিসেবে কাজ করছে নয়ন, রিওন এবং আশুলিয়া বাজারের এক কসাইয়ের ছেলে আকাশ।
আরও পড়ুন
নিপীড়িত সাংবাদিকদের পাশে সব সময় থাকবে: বাংলাদেশ সাংবাদিক উন্নয়ন সংস্থা
এলাকাজুড়ে বিস্তৃত নেটওয়ার্ক
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই চক্রটি শুধু আশুলিয়া পুরাতন গরুর হাট এলাকায় সীমাবদ্ধ নয়; আশুলিয়া বাজারসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় তাদের মাদক সরবরাহের নেটওয়ার্ক রয়েছে। স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, প্রতিদিন সন্ধ্যার পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত এলাকায় সন্দেহজনক লোকজনের আনাগোনা বেড়ে যায়।
তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, মাদক ব্যবসার ক্ষেত্রে এই চক্রটি বেশ সংগঠিত পদ্ধতিতে কাজ করে। গাঁজা, ইয়াবাসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক সংগ্রহ করে তারা নির্দিষ্ট ক্রেতাদের কাছে সরবরাহ করে থাকে।
মোটরসাইকেলে মাদক পরিবহন
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মাদক পরিবহনের ক্ষেত্রে চক্রটি দ্রুতগতির মোটরসাইকেল ব্যবহার করে। বিশেষ করে আকাশ ও রিওনের মোটরসাইকেলের মাধ্যমে বিভিন্ন স্থানে মাদক পৌঁছে দেওয়া হয়। এতে করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়িয়ে দ্রুত মাদক সরবরাহ করা সম্ভব হয়।
এছাড়া মাদক বিক্রির ক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তিও ব্যবহার করছে তারা। অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিকাশের মাধ্যমে টাকা লেনদেন করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। নির্দিষ্ট নম্বরে টাকা পাঠানোর পর নির্ধারিত স্থানে গিয়ে মাদক সংগ্রহ করতে হয় বলে জানিয়েছেন কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা।
ভয়-ভীতি দেখিয়ে নিয়ন্ত্রণ
স্থানীয়দের অভিযোগ, এই চক্রটি শুধু মাদক বিক্রি করেই থেমে নেই; বরং তারা ক্রেতাদের উপর এক ধরনের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে। কেউ যদি তাদের কাছ থেকে মাদক কেনা বন্ধ করে দেয় বা অন্য কোথাও থেকে সংগ্রহ করতে চায়, তখন তাকে ভয়-ভীতি দেখানো হয়।
অভিযোগ রয়েছে, মামুন খন্দকার অনেক সময় আশুলিয়া পুলিশ ফাঁড়ির পুলিশের নাম ব্যবহার করে ক্রেতাদের ভয় দেখায় এবং অতিরিক্ত দামে মাদক বিক্রি করতে বাধ্য করে।
‘জিরো পয়েন্ট’—মাদকের গোপন ঘাঁটি
মাদক ব্যবসাকে আরও বিস্তৃত করার উদ্দেশ্যে অভিযুক্তরা আশুলিয়ার ফরিদা বিল্ডিং সংলগ্ন একটি ফাঁকা জায়গা ভাড়া নিয়ে সেখানে রিকশার গ্যারেজ স্থাপন করে। এলাকায় এটি “জিরো পয়েন্ট” নামে পরিচিত।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এই গ্যারেজের আড়ালেই গড়ে তোলা হয়েছে মাদক সেবন ও কেনাবেচার একটি গোপন আস্তানা। দিনের বেলায় এটি সাধারণ গ্যারেজ হিসেবে ব্যবহার হলেও রাত নামার পর সেখানে মাদকসেবীদের আনাগোনা বেড়ে যায়।
পুলিশের অভিযান
কিছুদিন আগে আশুলিয়া পুলিশ ফাঁড়ির একটি দল অতর্কিত অভিযান চালিয়ে ওই গ্যারেজের অফিস কক্ষ ভেঙে দেয়। অভিযানের সময় মাদক সেবনের বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয় বলে জানা গেছে।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, এসআই মতিয়ারের নির্দেশে এই অভিযান পরিচালিত হয়। অভিযানের পর কিছুদিন এলাকায় মাদক কার্যক্রম কমে গেলেও বর্তমানে আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে চক্রটি—এমনটাই অভিযোগ এলাকাবাসীর।
বাড়ছে সামাজিক ঝুঁকি
স্থানীয়দের মতে, মাদক ব্যবসার কারণে এলাকায় কিশোর ও তরুণদের মধ্যে মাদকাসক্তির প্রবণতা বাড়ছে। এর ফলে চুরি, ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধের ঝুঁকিও বেড়ে যাচ্ছে।
একজন স্থানীয় বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,
“আমাদের এলাকায় এখন সন্ধ্যার পর অনেকেই বের হতে ভয় পায়। মাদকসেবীদের কারণে পরিবেশ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।”
প্রশাসনের নজরদারি দাবি
এ বিষয়ে আশুলিয়া পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মাহাবুবুল্লাহ সরকার এর বক্তব্য জানতে চেষ্টা করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
এলাকাবাসী দ্রুত প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপ কামনা করে বলেন, নিয়মিত অভিযান ও কঠোর নজরদারি না বাড়ালে আশুলিয়া এলাকায় মাদকের বিস্তার আরও বাড়তে পারে।
সচেতন মহলের মতে, মাদকবিরোধী অভিযানকে আরও জোরদার করা এবং স্থানীয় জনগণের সহযোগিতা নিয়ে একটি সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করলেই এই ধরনের চক্র ভেঙে দেওয়া সম্ভব।

