নিজস্ব প্রতিবেদক: আসন্ন সিটি করপোরেশনের নির্বাচনী হাওয়ায় ঢাকার আবহাওয়া উত্তপ্ত হতে শুরু করেছে। হলফনামায় দেয়া তথ্য অনুযায়ী অর্থ ও মামলায় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী আনিসুল হকের চেয়ে অনেকটাই এগিয়ে বিএনপিপন্থি আব্দুল আওয়াল মিন্টু।
ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে উত্তরের মেয়র পদের প্রার্থী বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও ব্যবসায়ী নেতা আব্দুল আউয়াল মিন্টুর হলফনামায় তার বিরুদ্ধে ১৩টি ফৌজদারি মামলা রয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন। তার বাৎসরিক আয় ৫ কোটি ১৮ লাখ ৪৫ হাজার ৫০৩ টাকা। অপরদিকে আনিসুল হকের বাৎসরিক আয় ৭৫ লাখ ৮২ হাজার ৯৮৭ টাকা। অর্থাৎ অর্থের দিক দিয়ে মিন্টু আনিসুল হকের চেয়ে এগিয়ে। আর মিন্টুর ১৩ মামলার বিপরীতে আনিসুল হকের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত হওয়ার অভিযোগ বর্তমান বা অতীতে কোনো সময়ে ছিল না বলে জানা যায়।
ইসির ওয়েবসাইটের তথ্যমতে, মিন্টুর বিরুদ্ধে বর্তমানে ১৩টি ফৌজদারি মামলা রয়েছে। যার মধ্যে পাঁচটি মামলায় তিনি জামিনে রয়েছেন। বাকিগুলো চলমান অবস্থায় আছে। এর আগেও তার বিরুদ্ধে তিনটি মামলা হয়েছিল। যার দুইটিতে তিনি অব্যাহতি পেয়েছেন, আর একটির কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে বলে হলফনামায় উল্লেখ করা হয়েছে।
তিনি নিজেকে এগ্রিকালচারাল ইকেনোমিকস এবং ট্রান্সপোর্টেশন ম্যানেজমেন্টে মাস্টার্স অব সায়েন্স ডিগ্রিধারী বলে উল্লেখ করেছেন।
প্রগতি ইন্স্যুরেন্স লিমিটেড, নর্থ সাউথ সিড লিমিটেডে, এ অ্যান্ড এ ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড, এমএফ কনজ্যুমারস লিমিটেড, কে অ্যান্ড কিউ (বাংলাদেশ) লিমিটেড, লাল তীর সিড লিমিটেড, প্রগতি লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেড, প্রোটন সার্ভিস সেন্টার লিমিটেডসহ ১৪টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের স্বত্ত্বাধিকারী তিনি।
মিন্টুর বাৎসরিক আয় ৫ কোটি ১৮ লাখ ৪৫ হাজার ৫০৩ টাকা দেখিয়েছেন। এরমধ্যে কৃষিখাত থেকে ৩ কোটি ৫০ লাখ ৯৯ হাজার ৫২২ টাকা, বাড়ি, দোকান ও অন্যান্য ভাড়া থেকে ৯ লাখ ৪ হাজার ৫শ টাকা আয় হয়।
এছাড়া, ব্যবসা থেকে তার আয় হয় ৯৩ লাখ টাকা। শেয়ার ও সঞ্চয়পত্র ও ব্যাংক আমানত থেকে মিন্টুর আয় হয় ২৪ লাখ ৩০ হাজার ৬৭০ টাকা, বিভিন্ন আইনি পরামর্শ বা শিক্ষকতা থেকে ২ লাখ ৭২ হাজার ৮২৩ টাকা এবং অন্যান্য খাতের মূলধনী লাভ থেকে আয় দেখিয়েছেন ৩৮ লাখ ৩৭ হাজার ৯৮৮ টাকা।
তিনি অস্থাবর সম্পত্তিতে নিজ নামে নগদ টাকা ৮ লাখ ৫০ হাজার ৩২০ টাকা ও স্ত্রীর নামে নগদ টাকা ৭ লাখ ৭৭ হাজার ৭৪৩ টাকা দেখিয়েছেন। তার বৈদেশিক মুদ্রা রয়েছে ২০০ মার্কিন ডলার। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জমাকৃত অর্থের পরিমাণ ৬৮ লাখ ৮৯ হাজার ২৬৩ টাকা। স্ত্রীর নামে রয়েছে ১ কোটি ২৫ লাখ ৬২ হাজার ৯৪২ টাকা। বন্ড, ঋণপত্র ও শেয়ার রয়েছে ৪০ কোটি ৫৮ লাখ ৯০ হাজার ৬৫০ টাকা, স্ত্রীর নামে ৩ কোটি ৩০ লাখ ৯১ হাজার ১৬৯ টাকা। পোস্টাল, সার্ভিস সার্টিফেকেটসহ বিভিন্ন ধরনের সঞ্চয়পত্রে বা স্থায়ী আমানতে বিনিয়োগ ৭৪ লাখ ৯৩ হাজার ৬৫৪ টাকা। মোটরগাড়ীতে বিনিয়োগ ৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা ও স্ত্রীর নামে ৯ লাখ ৮৩ হাজার ৬৬২ টাকা দেখিয়েছেন। তার নিজের নামে ২ লাখ টাকার এবং স্ত্রীর নামে ২৬ লাখ ৫৮ হাজার ৫৫১ টাকা স্বর্ণ ও মূল্যবান ধাতু রয়েছে বলে হলফনামায় উল্লেখ করেছেন।
মিন্টুর ইলেকট্রনিক সামগ্রী রয়েছে ৮ লাখ ৮৮ হাজার ৮৫৮ টাকার। তার স্ত্রীর রয়েছে ৫ লাখ টাকার ইলেকট্রনিক সমাগ্রী। নিজের নামে ১১ কোটি ৫১ লাখ ৯১ হাজার ৬৬৩ টাকার এবং স্ত্রীর নামে ৭১ লাখ ১২ হাজার টাকার অন্যান্য সম্পদ দেখিয়েছেন মিন্টু।
এই ব্যবসায়ী নেতার মোট স্থাবর সম্পত্তি ৪ কোটি ৫০ লাখ ৭ হজার ৮৪৯ টাকার। এরমধ্যে মিন্টু নিজের নামে স্থাবর সম্পত্তি ৩৫ লাখ ১০ হাজার ১৬৫ টাকার কৃষি জমি ও ৩ কোটি ৮৫ লাখ ১৪ হাজার ৮৩০ টাকার অকৃষি জমি দেখিয়েছেন হলনামায়। এর বাইরে নিজের নামে ২৯ লাখ ৮২ হাজার ৮৫৪ টাকার বাড়ি রয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন তিনি। তার স্ত্রীর নামে স্থাবর সম্পত্তির পরিমান দেখিয়েছেন অকৃষি জমি ৩১ লাখ ২৮ হাজার টাকার ও ১৯ লাখ ৪১ হাজার টাকা মূলের বাড়ি।
আব্দুল আউয়াল মিন্টুর হলফনামায় ছেলের কাছে থেকে ১ কোটি ৮১ লাখ টাকার ঋণসহ মোট ৫ কোটি ১০ লাখ ৯২ হাজার ৩১৭ টাকা দায়-দেনা দেখিয়েছেন তিনি।
অন্যদিকে, মনোনয়নপত্রের সঙ্গে জমাকৃত হলফনামায় আনিসুল হকের বাৎসরিক আয় দেখানো হয়েছে ৭৫ লাখ ৮২ হাজার ৯৮৭ টাকা। অন্যদিকে তার স্ত্রীর আয় দেখানো হয়েছে প্রায় ৮৫ লাখ টাকা।
ইসির ওয়েব সাইটে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে আনিসুল হকের মনোনয়ন পত্রের সঙ্গে জমা দেয়া হলফনামায় এ তথ্য মিলেছে।
হলফনামায় আনিসুল হক নিজেকে একজন ব্যবসায়ী হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি হিসেবে নিজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান মোহাম্মদী গ্রুপ লি., মোহাম্মদী ফ্যাশন সুয়েটারস লি., দি মোহাম্মাদ লি., টেকনোভিস্তা লি., এম জি প্রোপার্টিজ লি., মোহাম্মদী নিট স্টার লি., এমজি সার্টেক্স লি., দেশ এর্নাজি লি. এবং এমজি নিট ফ্লেয়ার লি. সহ মোট ২২টি প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ করেছেন তিনি।
আনিসুল হক হলফনামায় বাৎসরিক আয় উল্লেখ করেছেন,৭৫ লাখ ৮২ হাজার ৯৮৭ টাকা। সে হিসেবে প্রতিমাসে তার গড় আয় দাঁড়ায় ৬ লাখ ৩১ হাজার ৯১৫ টাকা। আয়ের উৎসগুলো মধ্যে প্রতিবছর বাড়ি-দোকান-অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া থেকে তার আয় হয় ২ লাখ ৪০ হাজার টাকা। ব্যবসা (পারিতোষিক) থেকে তার আয় ২৫ লাখ ৯২ হাজার টাকা। শেয়ার, সঞ্চয়পত্র এবং ব্যাংক আমানতের মাধ্যমে তার আয় ১ লাখ ৬১ হাজার ১৫৬ টাকা। অন্যান্য ব্যবসা (এফ ডিআর মুনাফা) থেকে ৪৫ লাখ ৮৯ হাজার ৮৩১ টাকা বছরে আয় করেন তিনি।
সম্ভাব্য এ প্রার্থীর পরিবারে তার ওপর নির্ভরশীল ব্যক্তিদের মোট বাৎসরিক আয় ১ কোটি ৩৬ লাখ ৪২ হাজার ৪৪১ টাকা। এর মধ্যে স্ত্রীর ৮৪ লাখ ৯৩ হাজার ৪৬২ টাকা এবং ছেলেসহ দুই কন্যার ৫১ লাখ ৪৮ হাজার ৯৭১ টাকা।
আনিসুল হকের অস্থাবর সম্পদের মূল্য ২২ কোটি ৭৫ লাখ ৬৫ হাজার ৮৪৪ টাকা। যেখানে নগদ টাকা রয়েছে ১ কোটি ৯৫ লাখ ১৩ হাজার টাকা, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জমানো টাকা ৬ লাখ ৫৮ হাজার ৭৯৯ টাকা, বন্ড মার্কেট-শেয়ারবাজার তালিকা ভুক্ত ও তালিকাভুক্ত নয় এমন কোম্পানিতে শেয়ার রয়েছে ১১ কোটি ৪৮ লাখ ৪৫ হাজার ৬৮৬ টাকা, পোস্টাল, সেভিং সার্টিফিকেটসহ বিভিন্ন ধরনের সঞ্চয়পত্রে আমানত বিনিয়োগ ৩ কোটি ৫৩ লাখ ৪৫ হাজার ৬৮৬ টাকা। স্বর্ণালঙ্কার ও অন্যান্য মূল্যবান ধাতু রয়েছে ১১ লাখ ১২ হাজার ৭৫০ টাকা। এছাড়া ইলেকট্রনিক সামগ্রী রয়েছে ৯ লাখ ৮৩ হাজার, আসবাবপত্র ১৪ লাখ ২৪ হাজার ও অন্যান্য (ঋণ প্রদান) ৫ কোটি ৩৬ লাখ ৮৩ হাজার ৭৯ টাকা। আর তার স্ত্রীর অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ ৫ কোটি ৬২ লাখ ৬৬ হাজার টাকা।
আনিসুল হকের স্থাবর সম্পত্তির মধ্যে কোনো প্রকার কৃষি জমি না থাকলেও ৩ কোটি ৫৭ লাখ ৬৮ হাজার টাকা মূল্যের অকৃষি জমি রয়েছে। এছাড়া তার স্ত্রীর স্থাবর সম্পত্তির পরিমান ৭০ লাখ ৬১ হাজার ৮৮০ টাকা।
তবে আনিসুল হকের জামানতবিহীন দেনা ৫ কোটি ২৯ লাখ ৪৭ হাজার ৮৯৭ টাকা বলে হলফনামায় উল্লেখ করেছেন। হলফনামায় তিনি ঋণখেলাপি নয় বলেও উল্লেখ আছে হলফনামায়।
শিক্ষাগত যোগ্যতায় আনিসুল হক স্নাতকোত্তর বলে হলফনামায় উল্লেখ আছে। সরকার দলীয় সমর্থিত এই সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থীর বিরুদ্ধে কোনো ধরনের ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত হওয়ার অভিযোগ বর্তমান বা অতীতে কোনো সময়ে ছিল না। তিনি ব্যবসায়ীদের সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

