বগুড়ার সবজি যাচ্ছে সাত দেশে। এর মধ্যে আলু অন্যতম। সবজি উৎপাদনের জন্য পরিচিত বগুড়া থেকে আলু রফতানির মাধ্যমে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছে। ফুলকপি, বাঁধাকপি ও কাঁচামরিচের পর এবার জেলায় উৎপাদিত আলু যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়াসহ সাতটি দেশের বাজারে। চলতি মৌসুমে প্রায় ১০ হাজার টন আলু রফতানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে কাজ শুরু করেছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী ও রফতানিকারকরা। সৌদি আরব, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইসহ মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ ছাড়াও সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও নেপালে বগুড়ার আলুসহ অন্যান্য সবজি রফতানি হচ্ছে। স্থানীয় কৃষকদের কাছ থেকে বিশেষ এজেন্টের মাধ্যমে এসব সবজি সংগ্রহ করে প্রথমে চট্টগ্রাম বন্দরে পাঠানো হয়। সেখান থেকে জাহাজে বিভিন্ন দেশের বাজারে পৌঁছে দেয়া হয়।
উত্তরাঞ্চলের বগুড়াকে ‘সবজির জেলা’ বলা হয়। অনুকূল আবহাওয়া ও উর্বর মাটির কারণে সারা বছরই বিভিন্ন ধরনের সবজি উৎপাদন হয়। স্থানীয় কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, শীত মৌসুমে জেলায় প্রায় ২৮ প্রজাতির ও গ্রীষ্ম মৌসুমে প্রায় ২০ প্রজাতির সবজি চাষ হয়। এর মধ্যে আলু অন্যতম ফসল। বগুড়ার শাজাহানপুর, শিবগঞ্জ, শেরপুর, কাহালু ও গাবতলীসহ বিভিন্ন উপজেলায় ব্যাপক আকারে আলুর চাষ হয়ে থাকে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত মৌসুমে বগুড়ায় ১৩ হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে শীতকালীন সবজি চাষ হয়েছে। এ থেকে উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৩ লাখ ২০ হাজার টন। চলতি ২০২৫-২৬ মৌসুমে ১৩ হাজার হেক্টর জমিতে প্রায় তিন লাখ টন সবজি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। তবে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বগুড়া জেলার শিবগঞ্জ উপজেলা থেকে বিভিন্ন ধরনের সবজি বিদেশের বাজারে যাচ্ছে বিশেষ ব্যবস্থায়। ডিসেম্বরে ফুলকপি ও বাঁধাকপি পাঠানো হলেও এবার যাচ্ছে আলু। উপজেলার কয়েকটি মোকাম থেকে এসব সবজি চট্টগ্রাম হয়ে বিভিন্ন দেশে যাচ্ছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মতো স্থানীয় মেসার্স সাগর ট্রেডার্স বিদেশে সবজি রফতানি করে থাকে। প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী সাগর হোসেন জানান, শিবগঞ্জসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ভালোমানের সবজি সংগ্রহ করে গ্রেডিংয়ের পর বিশেষভাবে প্যাকেটজাত করা হয়। প্রতিটি প্যাকেটের ওজন সাত কেজির বেশি। পরে সেগুলো কাভার্ড ভ্যানে করে চট্টগ্রাম বন্দরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে জাহাজে করে বিভিন্ন দেশে পাঠানো হয়। এসব সবজি সাতটি দেশে রফতানি করছে দেশীয় কিছু এজেন্ট।
রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে বিভিন্ন দেশের আমদানিকারকদের কাছ থেকে প্রায় ১০ হাজার টন আলু, পাঁচ হাজার টন ফুলকপি ও বাঁধাকপি এবং উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কাঁচামরিচ ও টমেটোর চাহিদা পাওয়া গেছে। কৃষকরা বলছেন, রফতানির কারণে আলুর ন্যায্যমূল্য পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বর্তমানে স্থানীয় বাজারে নতুন আলু প্রতি মণ এক হাজার ১০০ থেকে এক হাজার ৬০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে হিমাগারে সংরক্ষিত পুরনো আলু তুলনামূলক কম দামে বিক্রি হলেও রফতানি বাড়লে দাম আরো স্থিতিশীল থাকবে বলে আশা করছেন তারা।
শিবগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল হান্নান জানান, রফতানিযোগ্য আলু উৎপাদনে কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহযোগিতা দেয়া হচ্ছে। এছাড়া গুণগত মান নিশ্চিত করতে মাঠপর্যায়ে তদারকি করা হচ্ছে। পাশাপাশি রফতানির আগে প্যাকেজিং ও মান পরীক্ষা করা হচ্ছে। বগুড়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির কর্মকর্তা মাসুদ রানা বলেন, ‘এর আগেও বগুড়া থেকে আলুসহ বিভিন্ন সবজি সিঙ্গাপুরসহ কয়েকটি দেশে পাঠানো হয়েছে। নিয়মিতভাবে রফতানি অব্যাহত থাকলে স্থানীয় কৃষকরা আরো লাভবান হবেন। পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের নতুন একটি খাত তৈরি হবে।’ বিশেষজ্ঞদের মতে, আলু রফতানির এ ধারা ধরে রাখা গেলে বগুড়া তথা উত্তরাঞ্চলের কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি আরো শক্তিশালী হবে। একই সঙ্গে দেশের সামগ্রিক রফতানি আয়ে বড় অবদান রাখবে এ খাত। আলুসহ কৃষিপণ্য রপ্তানি হওয়ায় কৃষক ন্যায্য মূল্য পাবে। ফলে আবাদের প্রতি তাদের উৎসাহ বাড়বে। দেশও অর্থনীতিকভাবে লাভবান হবে।

