ঢাকাThursday , 4 December 2025
  1. অর্থনীতি
  2. আইন-আদালত
  3. আন্তর্জাতিক
  4. আবহাওয়া
  5. কৃষি ও অন্যান্য
  6. খেলাধুলা
  7. গল্প ও কবিতা
  8. জাতীয়
  9. তথ্যপ্রযুক্তি
  10. দেশজুড়ে
  11. ধর্ম ও জীবন
  12. প্রবাস
  13. বানিজ্য
  14. বিনোদন
  15. বিশেষ প্রতিবেদন
আজকের সর্বশেষ সবখবর

গাইবান্ধায় বিলুপ্ত প্রায় লাঠিখেলা

Link Copied!

গাইবান্ধা জেলার ৭ টি উপজেলায় এক সময় ঢাক-ঢোল, শানাই আর লাঠির তালে তালে মুখরিত হতো গ্রামের পাড়া-মহল্লা। ৯০-এর দশক জুড়ে ঈদের আনন্দের মতোই মানুষ অপেক্ষায় থাকত লাঠি খেলার আয়োজনের জন্য। এখন আধুনিকতার ছোঁয়ায় সেই গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী লাঠি খেলা আজ প্রায় বিলুপ্ত প্রায় চাইলেও আর চোখে পড়ে না সেই দৃশ্য, যে দৃশ্য একদিন গ্রামবাংলাকে মাতিয়ে রাখত উৎসবের আমেজে। একসময় গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ, সুন্দরগঞ্জ, সাঘাটা, ফুলছড়িসহ বিভিন্ন এলাকায় লাঠি খেলার দল ছিল প্রায় প্রতিটি গ্রামের গর্ব। ঢোল পিটিয়ে ঘোষণা হতো অমুক সরকারের বাড়ির মাঠে আজ লাঠি খেলা! এই ঘোষণার শব্দে জমে উঠত চারপাশ। মাঠে যাওয়ার আগে লাঠিয়ালরা কোমরে গামছা বেঁধে, মাথায় পাগড়ি জড়িয়ে, তেলমাখা লাঠি হাতে নিয়ে নামতেন এক যুদ্ধসদৃশ খেলায়। দলনেতার নির্দেশে শুরু হতো রাজকীয় সেই খেলা যেখানে শক্তি, কৌশল আর নাচের ছন্দ মিলেমিশে তৈরি করত এক অনন্য শিল্প। সে সময় লাঠি খেলা শুধু খেলা ছিল না; এটি ছিল গ্রাম বাংলার এক উজ্জ্বল ঐতিহ্য, ছিল মানুষের শেকড়ের স্পন্দন। গ্রামে কোথাও লাঠি খেলার আয়োজন হলে আশপাশের মানুষ দলে দলে ছুটে যেত। স্কুলের মাঠ, ধনবান ব্যক্তির বিশাল উঠান কিংবা খোলা জনপদে আয়োজন হতো এই খেলা। খেলার দিন এলাকায় ছোটখাটো মেলা বসত। দোকানিদের হাঁকডাকে মুখরিত থাকত মাঠের চারপাশ। কে কোথায় বসবে সেই নিয়েও তর্ক-বিতর্ক চলত। বৃদ্ধরা বসতেন কাঠের টুল বা পিঁড়িতে, যুবকরা গাছের ডালে বা বাড়ির চালায় উঠে খেলাটি উপভোগ করতেন। নারী-পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধ সবার জন্যই ছিল এই খেলা এক অন্যরকম পরম আনন্দের উৎস। ঢোলের তালে তালে লাঠির শব্দ যেন বাজনা হয়ে প্রতিধ্বনিত হতো আকাশে-বাতাসে। গোবিন্দগঞ্জ, বামনডাঙ্গা, কামারজানী, নলডাঙ্গা, সুন্দরগঞ্জ উপজেলার নাচনী ঘগেয়া, এসব গ্রাম ছিল লাঠি খেলার সবচেয়ে প্রাণবন্ত কেন্দ্র। এসব এলাকায় লাঠিয়ালদের দল গড়ে উঠত তাদের সরদারের নেতৃত্বে। সরদারের ক্লাসিক নির্দেশে দলবদ্ধ হয়ে খেলোয়াড়রা লাঠি ঘুরিয়ে দেখাতেন নানা রণকৌশল।
৭৬ বছরের কিংবদন্তি লাঠিয়াল ইদ্রিস পালোয়ান-এর স্মৃতিচারণ সুন্দরগঞ্জ উপজেলার নাচনী ঘগেয়া, গ্রামের ৭৬ বছর বয়সী লাঠিয়াল দলের সরদার ইদ্রিস পালোয়ান ছিলেন এই অঞ্চলের কিংবদন্তি লাঠিয়াল। তাকে সবাই পালোয়ান নামে ডাকত। কারণ তিনি ছিলেন সাহসী, তেজস্বী ও অপরাজেয় শক্তির অধিকারী। বয়সের ভারে এখন হয়তো তার কোমর নুয়ে গেছে, কিন্তু স্মৃতি তার অটুট। ম্লান হাসি আর স্মৃতিমাখা চোখে তিনি বলেন এখন তমুই হইচম বুড়া, বয়স ৭৬ হইছে। কোমরও আর আগের মতো জোর নাই। মোর আসল নাম ইদ্রিস কিন্তু লাঠি খেলায় লোকে মোকে পালোয়ান কয়। আগের দিনগুলা মনে পড়লে এখনও লাঠি হাতাতে ইচ্ছে করে মন সাহস পায়। তিনি বলেন, আগে লাঠি খেলা হইলেই গ্রামের মানুষ মেলা বানাইত। ঢাক ঢোল বাজত, মাঠ লইয়া হৈচৈ চলত। মানুষ আনন্দ করতৃ এখন মানুষ অলস হইছে, মোবাইল গেইম দেখে। এ খেলা আর দেখা যায় না।
অনেক প্রবীণ লোক, মনে করেন, সরকার ও স্থানীয় প্রশাসন একটু এগিয়ে এলেই এই ঐতিহ্যবাহী লাঠি খেলা আবার ফিরে আসতে পারে নতুন প্রজন্মের সামনে। মানুষের আনন্দ, উৎসব আর সংস্কৃতির অংশ হিসেবে পুরনো সেই খেলা আবারো প্রাণ পেতে পারে।
ইদ্রিস পালোয়ান বলেন যদি সরকার বাহাদুর সাহায্য করে, এই খেলা আবার ফিরাই আনতে পারমু। মানুষ আবার হাসব, গ্রামের মানুষ আবার আনন্দ পাব। এখন মোবাইল ফোনে পাবজি, ফ্রি-ফায়ার; মাঠে ক্রিকেট, ফুটবল, ভলিবল, ব্যাডমিন্টন নতুন প্রজন্মের কাছে এগুলোই বিনোদনের প্রধান মাধ্যম। ফলে লাঠি খেলার মতো ঐতিহ্যবাহী খেলা হারাচ্ছে তার স্থান ও গুরুত্ব। তবুও কিছু গ্রামে আজও দু-একটি লাঠি খেলা অনুষ্ঠিত হয়। ঢোলের তালে নাচা লাঠিয়ালদের দেখে মনে হয় ঐতিহ্য পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। এখনও টিকে আছে কালের সাক্ষী হয়ে। অতীতের সোনালি দিনগুলো আবার ফিরে আসবে এই আশাই করছে গাইবান্ধার মানুষ।