যথাযোগ্য মর্যাদা ও গভীর শ্রদ্ধায় ৩ ডিসেম্বর পালিত হলো ঠাকুরগাঁও পাকহানাদার মুক্ত দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনে দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী থেকে মুক্ত হয়েছিল উত্তরের এই জনপদ। স্বাধীনতার ৫৩ বছর পরেও বিজয়ের এই দিনটি স্মরণে আজও আবেগে ভাসে ঠাকুরগাঁওবাসী। উত্তরের জেলা ঠাকুরগাঁও তখন ছিল দিনাজপুর জেলার একমাত্র মহকুমা। ঠাকুরগাঁও পঞ্চগড় অঞ্চলের ১০টি থানাজুড়ে ছিল এ মহকুমার বিস্তৃতি। নভেম্বরের শেষ দিক থেকে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের তীব্র লড়াই এবং স্থানীয় জনগণের দুর্বার প্রতিরোধে পাকবাহিনী পিছু হটতে শুরু করে। চূড়ান্ত বিজয়ের মুখ দেখেছিল আজকের এই দিনটি ৩ ডিসেম্বর। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে পাক হানাদাররা ঝাঁপিয়ে পড়ে ঠাকুরগাঁওয়ের নিরীহ মানুষের ওপর। শুরু হয় নির্বিচার হত্যা, ধর্ষণ, লুণ্ঠন ও অগ্নিসংযোগ। ১৫ এপ্রিল আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত পাকবাহিনী দখল নেয় ঠাকুরগাঁও শহর। এ সময় কয়েকজন ছাত্রকে আটক করে নির্মমভাবে হত্যা করে নদীর পাড়ে ফেলে রাখে যেখানে আজ রয়েছে বধ্যভূমির স্মৃতিসৌধ। ঠাকুরগাঁও তখন ছিল মুক্তিযুদ্ধের ৬ নম্বর সেক্টরের অন্তর্ভুক্ত। সেক্টর কমান্ডার ছিলেন বিমান বাহিনীর স্কোয়াড্রন লিডার এম খাদেমুল বাশার। এ সেক্টরে প্রায় ১০ হাজার মুক্তিযোদ্ধা যুদ্ধ করেছিলেন। ২৯ নভেম্বর প্রথম শক্রমুক্ত হয় পঞ্চগড় থানা। এতে পাকবাহিনীর মনোবল ভেঙে পড়ে। ২ ডিসেম্বর রাতেও ঠাকুরগাঁওয়ে ভয়াবহ গোলাগুলির পর পাক হানাদাররা পিছু হটে ২৫ মাইল এলাকায় অবস্থান নেয়। এবং অবশেষে ৩ ডিসেম্বর ভোরে ঠাকুরগাঁও পুরোপুরি শক্রমুক্ত হয়। ঠাকুরগাঁও জেলা জুড়ে পাকবাহিনী ও রাজাকার-আলবদর-আলশামস মিলিতভাবে শতাধিক স্থানে গণহত্যা চালায়। অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষ জীবন দেন পাকিস্তানি সেনাদের যন্ত্রণায়। তবে এই অঞ্চলের মানুষ দমে যায়নি গড়ে তোলে দুর্বার প্রতিরোধ, যা বিজয়ের পথকে আরও ত্বরান্বিত করে। শক্রমুক্তির পর ৩ ডিসেম্বর সকাল থেকেই শহরের রাস্তাঘাটে জড়ো হতে থাকে মানুষ। বের হয় দীর্ঘ বিজয় মিছিল। স্বাধীন বাংলাদেশের জয়ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো ঠাকুরগাঁও। সদর উপজেলা আহ্বায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা আনোয়ার হোসেন বলেন, “আজকের এই দিনে রণাঙ্গনের সকল শহীদ সহযোদ্ধার আত্মার মাগফিরাত কামনা করি। রিক্সাচালক শহীদ মোহাম্মদ আলী, শহীদ নরেশ চৌহান, সুবেদার মেজর কাজিম উদ্দীন, ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ হোসেন , ফজলুল করিম, লুৎফর রহমান খান তাদের অবদান ঠাকুরগাঁওয়ের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।” জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা নুর করিম জানান, “১৯৭১ সালের এই দিনে মুক্তিযোদ্ধা ও স্থানীয় জনগণের প্রাণান্তকর লড়াইয়ের মুখে পাক হানাদার বাহিনী প্রাণভয়ে ঠাকুরগাঁও জেলা ছেড়ে পালায়। ঠাকুরগাঁও পাকহানাদার মুক্ত দিবস উপলক্ষে জেলা প্রশাসন, জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, ঠাকুরগাঁও প্রেসক্লাব, সাংস্কৃতিক সংগঠন, শিল্পী গোষ্ঠী এবং বিভিন্ন সামাজিক-রাজনৈতিক সংগঠন দিনব্যাপী নানা কর্মসূচি পালন করে। শহরের স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ, আলোচনা সভা, প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনী, দোয়া মাহফিল এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ছিল দিনের বিশেষ আয়োজন।

