গাইবান্ধার ৭ উপজেলার বুকে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য নদী, বিল, পুকুর আর নিচু জমিগুলো একসময় যেন ছিল শাপলার বিছানা। বর্ষার পানিতে ভেসে থাকা সেই সাদা ও লালচে শাপলা শুধু সৌন্দর্যের প্রতীক ছিল না এ ছিল আমাদের শৈশবের প্রাণ, আমাদের আনন্দের উৎস, আমাদের বেড়ে ওঠার সাথি। যখন বর্ষা নামত, পুরো বিল যেন ফুলের হাসিতে গেয়ে উঠত। জল কেটে শাপলার ডাঁটা তুলতে নামত শিশুরা। ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা দল বেঁধে নেমে যেত গলা-সমান পানিতে, তবুও ভয় পেত না কোনো কিছুকে। তাদের হাসির শব্দ, পানিতে ছলছল দৌড়ানো, শাপলা তুলে মালা বানানো এই সবকিছুই ছিল গ্রামবাংলার এক অপার সৌন্দর্য। সেই দিনগুলো যে দিনগুলোতে শাপলার মালা ছিল মেয়েদের স্কুল সাজের অংশ। কিশোরীরা কপালে ও মাথায় শাপলার মালা পরত, গলায় ঝুলিয়ে যেত স্কুলে বা নানা-নানির বাড়িতে। বিকেলে সবাই মিলে বিলে নেমে শাপলা তুলতে যেত কেউ হাসত, কেউ গান গাইত, কেউ আবার ভিজে শরীরে মালা পরে লাফালাফি করত। শাপলার গন্ধ, ভেজা ঘাসের স্পর্শ, পানির ঠান্ডা ছোঁয়া সবকিছু মিলেই যেন ছিল শৈশবের এক রূপকথা। কিন্তু আজ? আজ যেন সেই রূপকথার বইটি ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। সুন্দরগঞ্জ উপজেলার, হরিপুর, বামনডাঙ্গা, ধুপনী, বেলকা, কামারজানি যে বিলগুলো একসময় শাপলায় ভরে থাকত, সেখানে এখন পানিই থাকে না, থাকে শুধু শুকনো মাটি আর আগাছা। সাদুল্ল্যাপুরের বুজরুক পাকুরিয়া বিল যার নাম শুনলেই মানুষ শাপলার স্বর্গরাজ্য কল্পনা করত আজ সেখানে শাপলা দেখা যায় বিরলভাবে। শুধু প্রকৃতি শুকিয়ে যায়নি, মানুষের মনও যেন শুকিয়ে যাচ্ছে। লালচামার সরকারপাড়া গ্রামের বৃদ্ধা ফুল জান বিবি যিনি সারাজীবন শাপলা আর শালুক বিক্রি করে সংসার সামলাতেন তিনি চোখের ভেজা কণ্ঠে বললেন, বাবা, শাপলা তো শুধু ফুল নাৃ এটা ছিল আমাদের জীবন। শাপলার নিচে শালুক পাওয়া যেত। মেয়েরা সেটা সিদ্ধ করে খেত দেহে আয়রনের ঘাটতি পূরণ হতো। এখন আর শালুকও পাই না, শাপলাও পাই না। কেউ শালুক চিনেই না।” তিনি আরও বললেন, আগে কত ছেলে-মেয়ে আমার কাছ থেকে শাপলা কিনত। মালা বানিয়ে গলায় দিত, কপালে দিত, গান গাইত। এখন আর সেই দৃশ্য দেখি না। বিলে পানি নাই, ফুল নাই, আনন্দ নাই। সবই শেষ হয়ে যাইতেছে বাবা ফুল জান বিবির কথায় যেন এক গ্রামের নয় পুরো প্রজন্মের কান্না লুকানো। প্রশ্ন উঠছে গাইবান্ধার নদীবিলঝিল থেকে কি সত্যিই হারিয়ে যাবে শাপলা? যে ফুল আমাদের জাতীয় ফুল, যে ফুল আমাদের শৈশবের ইতিহাস, সেই ফুল কি আজ বিলুপ্ত হবে? প্রকৃতি বদলেছে, পানি কমেছে, বিল ভরাট হয়েছে, নদীর বুক শুকিয়ে গেছে এমন বাস্তবতায় শাপলার বেঁচে থাকা সত্যিই কঠিন হয়ে পড়েছে। আজকের শিশুরা আর জানেই না শাপলা তুলতে বিলের জলে নামার আনন্দ। ফুল হাতে নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে ছবি তোলার সহজ সুখটাও তারা পায় না। মাটির গন্ধ, পানির শীতলতা, মালার রঙ সবই তাদের অচেনা। শাপলা হারিয়ে গেলে হারিয়ে যাবে আমাদের শৈশব। হারিয়ে যাবে গ্রামবাংলার কোমল সৌন্দর্য। হারিয়ে যাবে সেই সহজ-সরল জীবনযাপনের গল্প। হারিয়ে যাবে সেই হাসি-আনন্দ যা কোনোদিন ফিরে আসে না। তবুও মনে হয় যদি কোনো এক ভোরে হঠাৎ দেখি, বিলে আবার সাদা শাপলা ফুটেছে? যদি কোনো দুপুরে শুনি, শিশুরা আবার বিলে নেমে হাসছে, দৌড়াচ্ছে? যদি কোনো বিকেলে দেখি, একদল কিশোরী মাথায় শাপলার মালা পরে স্কুলে যাচ্ছে? স্বপ্ন মনে হলেও, মানুষ সেই স্বপ্নই দেখতে চায়। শৈশবের সেই রঙিন দিনগুলোকে ফিরে পেতে চায়। কারণ শাপলা শুধু ফুল নয় এটি আমাদের স্মৃতি, আমাদের অনুভূতি, আমাদের অতীতের আলো। তাই প্রশ্ন রয়ে যায় গাইবান্ধার এই হারিয়ে যাওয়া শাপলা কি আর কোনোদিন ফিরে আসবে।

