কেরানীগঞ্জের শুভাঢ্যা ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে গুরুতর অনিয়ম, অবৈধ গর্ভপাত বাণিজ্য, আর্থিক শোষণ ও রোগী নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা (FWV) অনন্যা দাসের বিরুদ্ধে। এমবিবিএস ডিগ্রি না থাকলেও তিনি নিজেকে “গাইনী ডাক্তার” পরিচয়ে রোগী দেখেন, গর্ভপাত করান এবং জটিল চিকিৎসা কার্য পরিচালনা করেন। এলাকাবাসীর অভিযোগ, সরকারি সেবা দেওয়ার বদলে তিনি নিয়মিত টাকা নেন, সরকারি সুবিধার কথা বললেই উত্তেজিত হয়ে বলেন “উপরে দিতে হয়।” স্থানীয়রা দাবি করেন, সরকারি ক্লিনিকটিকে তিনি ব্যক্তিগত ব্যবসায় পরিণত করেছেন এবং বছরের পর বছর এভাবে রোগীদের শোষণ করেছেন। ভুক্তভোগী মিম খাতুন জানান, ২১ অক্টোবর গর্ভধারণের কার্ড করতে গেলে প্রথমে ১০০ টাকার টেস্ট করানো হয়। টেস্ট পজিটিভ হলে অনন্যা দাস তাকে একটি নির্দিষ্ট প্রাইভেট ক্লিনিকে টেস্ট করতে বাধ্য করেন। এরপর কার্ড করতে ২ হাজার টাকা দাবি করে টাকা না দিলে সেবা বন্ধের হুমকি দেন। রহিমা জানান, বাচ্চা না রাখার কথা বললে অনন্যা দাস ৮ হাজার টাকা দাবি করেন, পরে ৬ হাজারে এমআর করেন। চিকিৎসায় ভুল পদ্ধতি ব্যবহারের কারণে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং মিটফোর্ড হাসপাতালে ডাক্তাররা জানান, তার জরায়ুতে ক্ষতি হয়েছে। ফাতেমা আক্তার অভিযোগ করেন, ভুল প্রসব চিকিৎসায় তার ইউটেরাস ছিঁড়ে যায়। সরকারি চিকিৎসা নেওয়ার পরও ৪ হাজার টাকার ওষুধ কিনতে বাধ্য করা হয় এবং পরে তাকে গোপনে অন্য হাসপাতালে যেতে বলা হয়। এ ঘটনার পর ফাতেমা দুদক, জেলা প্রশাসক, সিভিল সার্জন ও মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দাখিল করেছেন। অন্য ভুক্তভোগীদের অভিযোগও একই চিত্র তুলে ধরে। কহিনুর জানান, সরকারি ১০ টাকার কনডম ৫০ টাকায় বিক্রি করেন অনন্যা দাস। নিয়মিত সরকারি ওষুধ ও সেবার নামে অতিরিক্ত অর্থ নেন। রাশিদা বলেন, ওয়াস করার পর বাড়ি পৌঁছে গুরুতর রক্তক্ষরণ শুরু হয়, হাসপাতালে ডাক্তাররা জানান, ভুল পদ্ধতিতে করা হয়েছে। অভিযোগ করতে চাইলে অনন্যা দাস হুমকি দেন “আমার স্বামী পুলিশ, ধরা খাইয়ে দেব।” নুর নাহার জানান, ডেলিভারির পর ছাড়পত্র দিতে ৫–৭ হাজার টাকা দাবি করা হয় এবং টাকা না দিলে রোগী ছাড়বেন না বলে হুমকি দেওয়া হয়। নারী ভুক্তভোগীদের বক্তব্য অনুযায়ী, অনন্যা দাস কর্তৃত্ব, ভয়ভীতি ও অবৈধ আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে এই কেন্দ্রটি নিয়ন্ত্রণ করে আসছেন। অভিযোগ রয়েছে অনন্যা দাস রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় এখানে টিকে আছেন। তিনি কেরানীগঞ্জ দক্ষিণ যুবলীগের সাবেক সভাপতি মাহমুদ আলমের ঘনিষ্ঠ ছিলেন এবং তার সুপারিশে নবাবগঞ্জ থেকে শুভাঢ্যায় বদলি হন। পরে উপজেলা চেয়ারম্যান শাহীন আহমেদের সহায়তায় এখানে স্থায়ীভাবে অবস্থান নেন। এছাড়া তার স্বামী সমীর রঞ্জন মজুমদার, সিআইডি নারায়ণগঞ্জে কর্মরত এই পরিচয় ব্যবহার করে তিনি রোগীদের ভয় দেখান এবং অভিযোগ ঠেকানোর চেষ্টা করেন। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের কাছ থেকে আইপিএস, ইলেকট্রনিকস, চেকসহ বিভিন্ন মূল্যবান উপহার গ্রহণ করেন তিনি, যা একাধিকবার স্থানীয়দের হাতে ধরা পড়ে। অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে অনন্যা দাস বলেন “ আমি ঘুষ নেই না, মানুষ আমাকে ভালোবেসে হাস-মুরগি, দুধ দেয়, কাপড় ধুয়ে দেয়।” তিনি দাবি করেন, তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। তবে ভুক্তভোগীরা তার বক্তব্যকে মিথ্যাচার বলে উল্লেখ করেছেন। অন্যদিকে কেরানীগঞ্জ উপজেলা মেডিকেল অফিসার ডা. জেরিন আফরিন জুই বলেন, “অভিযোগ প্রমাণিত হলে এটি গুরুতর প্রশাসনিক অপরাধ; তদন্তেই সব বেরিয়ে আসবে।” শুভাঢ্যা ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের বিরুদ্ধে পাওয়া এসব অভিযোগ নিছক গুজব নয় বরং একাধিক ভুক্তভোগী নারীর সাক্ষাৎকার, চিকিৎসা প্রতিবেদন, স্থানীয় সূত্র এবং দাপ্তরিক অভিযোগের ওপর ভিত্তি করে স্পষ্ট যে এখানে দীর্ঘদিন ধরে চলছে অবৈধ গর্ভপাত বাণিজ্য, ভুল চিকিৎসা, জোরপূর্বক অর্থ আদায় ও ক্ষমতার অপব্যবহার। ভুক্তভোগীরা সুষ্ঠু তদন্ত ও দ্রুত প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন, যাতে আর কোনো নারী এমন বিপদে না পড়েন।

