ঠাকুরগাঁও জেলার গ্রামীণ জনপদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অন্যতম অংশ “লক্ষ্মীধামের গানের আসর”। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের লক্ষ্মীপূজা ও কালী পূজাকে কেন্দ্র করে প্রতি বছর জেলার বিভিন্ন গ্রামে এ আয়োজন হয়ে থাকে। শতবর্ষ পুরোনো এই লোকজ ধারাটি কেবল ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং গ্রামীণ সমাজের বিনোদন, সংস্কৃতি ও মানবিক বোধের এক অনন্য সংমিশ্রণ। এক সময় জেলার প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় ধামের গানের আসর বসত। শিক্ষিত-অশিক্ষিত, নারী-পুরুষ, বৃদ্ধ-শিশু সবাই মাটির ঢিবির চারপাশে বাঁশের ঘের দিয়ে সাজানো মঞ্চে রাতভর গান ও নাট্যরস উপভোগ করত। করুন ও সামাজিক গল্পে চোখের জল ফেলত শ্রোতারা, আবার হাসির দৃশ্যে মাতত আনন্দে। ধামের গানের উৎপত্তি সম্পর্কে নির্দিষ্ট তথ্য না থাকলেও ধারণা করা হয় কয়েক শতাব্দী আগে থেকেই ঠাকুরগাঁও অঞ্চলে এ ধারার সূচনা। ‘ধাম’ শব্দের অর্থ আশ্রয়স্থল বা ধর্মীয় সমবেত স্থান। সেই স্থানেই লোকনাট্যরূপে গান, সংলাপ ও অভিনয়ের মিশ্রণে গড়ে ওঠে “ধামের গান” যা আজ ঠাকুরগাঁওয়ের এক বিশেষ লোকনাট্য রীতিতে পরিণত হয়েছে। স্থানভেদে ধামের গানের আরও নাম প্রচলিত মারাঘুরা গান, পালাটিয়া গান, হুলিগান বা লক্ষ্মীর ধামের গান। এই গানের সংলাপ সংক্ষিপ্ত, ভাষা সম্পূর্ণ আঞ্চলিক। গদ্য ও গান মিলিয়েই চলে পরিবেশনা। সাধারণত ধানের মৌসুম শেষে, শীতের আগমনে লক্ষ্মীপূজা থেকে কালীপূজার পর পর্যন্ত চলে ধামের গানের আসর। অতীতে অনেক আসর টানা সপ্তাহব্যাপী চলত, এখন তা দুই-তিন দিনে সীমাবদ্ধ। বর্তমানে জেলায় প্রায় দুই শতাধিক নামের মঞ্চ রয়েছে। রঙিন কাপড়, বাঁশের বেষ্টনী, ও কুপি-বাতির আলোয় সাজানো মঞ্চে এক রাতে তিন-চারটি পালা অনুষ্ঠিত হয়। কোনো কোনো এলাকায় প্রতিযোগিতাও হয় বিজয়ী দল পায় টেলিভিশন, বাইসাইকেল, গাভী বা নগদ অর্থ পুরস্কার। ধামের গানের বিশেষত্ব পুরুষরাই নারী চরিত্রে অভিনয় করেন। মাথায় খোঁপা, নাকে নাকফুল, কানে দুল পরে তাদের দেখা যায় রূপান্তরিত রূপে। খকেন পাল নামে এক শিল্পী বলেন, “আগে তিন দিন ধরে গান চলত, এখন এক-দুই দিনেই শেষ হয়। নতুন প্রজন্ম আগের মতো আগ্রহ দেখায় না।” এই শিল্পীদের বেশিরভাগই পেশাদার নয় কেউ দিনমজুর, কেউ ভ্যানচালক, কেউ রাজমিস্ত্রীর জোগালি। তাদের অভিনয়ের শিক্ষা নেই, তবে সমাজ পর্যবেক্ষণের দারুণ ক্ষমতাই তাদের অভিনয়ের মূল শক্তি। কোনো লিখিত পাণ্ডুলিপি থাকে না সবই তাৎক্ষণিক অভিনয় ও সংলাপে গড়া। ধামের গানের বিষয়বস্তু প্রান্তিক জীবনের সুখ-দুঃখ, প্রেম, পারিবারিক টানাপোড়েন, অন্যায়, বৈষম্য, কিংবা সমাজের নানা অসঙ্গতি। কখনও ব্যঙ্গ, কখনও হাস্যরস, কখনও করুণ আবেগে ফুটে ওঠে বাস্তব জীবনের প্রতিচ্ছবি। ধর্মীয় উপলক্ষকে কেন্দ্র করে হলেও গানের গল্প সার্বজনীন সব ধর্মের মানুষ সমান আগ্রহে উপভোগ করে। গ্রামীণ সমাজের ব্যস্ততা ও আধুনিক বিনোদনের বিকল্প বিস্তারে ধামের গানের আগের জনপ্রিয়তা কিছুটা কমেছে। অনেক গ্রামে আসর আর বসে না, অনেক দল ভেঙে গেছে। তবে কিছু এলাকার মানুষ এখনও ঐতিহ্য বাঁচিয়ে রাখার প্রাণান্ত চেষ্টা করছে। নেকমরদ হাটের ১৬ দলের সর্দারনি নামে একটি যাত্রাপালা, সেই যাত্রাপালার মাষ্টার জিতেন পাল বলেন, হামার গ্ৰামত যে ঘটনালা ঘটে সে ঘটনালা দিয়া হামরা গান তৈরি করি।অনেক সময় বই থেকেও হামরা গান তৈরি করি।ছেলেরা মেয়ে সাজে অভিনয় করে।আর মানুষজন ওইসব দেখে মজা নেয় আনন্দ করে। আকচা পালপাড়া ধাম গান কমিটির সভাপতি মহেন্দ্র পাল বলেন, “আগে ২৪ ঘণ্টা গান চলত, এখন শুধু রাতে হয়। দল কমে গেছে। তারপরও আমরা প্রতিবছর প্রতিযোগিতা আয়োজন করি যেন ঐতিহ্যটা টিকে থাকে।” ধামের গান কেবল লোকসংগীত নয়, এটি ঠাকুরগাঁওয়ের সাংস্কৃতিক আত্মার প্রতিধ্বনি। সাধারণ মানুষের মুখের ভাষায়, জীবনের গল্পে, আবেগের অভিনয়ে গাঁথা এই ঐতিহ্য আজও গ্রামীণ সমাজে মিলন, বিনোদন ও মানবিকতার অনন্য উৎসব হয়ে বেঁচে আছে।

