ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার পূর্ব বেগুনবাড়ি নতুনপাড়া গ্রামে রামদাড়া নদীর ওপর দাঁড়িয়ে আছে ৪ দশকের পুরোনো এক সেতু। একসময় ছোট্ট গ্রামীণ হাঁটার পথ হিসেবে তৈরি হয়েছিল এটি। কিন্তু সময়ের ঢেউ আর মানুষের প্রয়োজনের ভারে সেতুটি আজ এক আতঙ্কের নাম। প্রতিদিন হাজারো মানুষ পা ফেলে, ভ্যান ঠেলে কিংবা সাইকেল চালিয়ে পার হন এই নড়বড়ে কাঠামোর ওপর দিয়ে। শিশুদের ভয়ের সেতু পার হওয়া ও তাদের মুখে একটাই প্রশ্ন “আজ কি ভেঙে পড়বে?” সেতুর পূর্বপাশে দুটি বিদ্যালয়। সকালে ঝাঁক বেঁধে স্কুলে যায় ছোট্ট ছেলেমেয়েরা। কাঁধে বইয়ের ব্যাগ, চোখে স্বপ্ন, অথচ বুকের ভেতর লুকোনো ভয়। ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী হামিম রাইসুল জমিরুল থমথমে গলায় বলল আমরা প্রতিদিন ভয়ে থাকি। মনে হয় সেতু ভেঙে নদীতে পড়ে যাব। আমাদের জন্য নতুন ব্রিজ খুব দরকার। শিশুরা যেখানে খেলাধুলা, পড়াশোনার স্বপ্নে বিভোর থাকার কথা, সেখানে তাদের দিন শুরু হয় আশঙ্কা আর শঙ্কায়। দেখা গেলো কৃষকের বোঝা নদীর তলদেশ দিয়ে নিয়ে যেতে।রামদাড়া অঞ্চলের মানুষ কৃষিপ্রধান। ধান, ভুট্টা, সরষে, পাট ফসল মাঠে ভালো হলেও সেতু দুর্বল হওয়ায় বাজারে পৌঁছানো যেন যুদ্ধ। কৃষক মনসুর আলী দম নিতে নিতে বললেন, ধান কাটার আধুনিক হারভেস্টার মেশিন সেতু দিয়ে পার করা যায় না। নদীর তলদেশ দিয়েই নিতে হয়। এতে সময়ও বেশি লাগে, খরচও বাড়ে। অন্য কৃষক রফিকুল ইসলাম কণ্ঠ কাঁপিয়ে যোগ করলেন, সেতুটি ভেঙে গেলে শুধু আমাদের জীবন নয়, ফসলও নদীতে পড়ে যাবে। একজন কৃষকের ঘাম আর পরিশ্রম যেখানে দেশের খাদ্য নিরাপত্তার ভরসা, সেখানে সেই শ্রমই পড়ে আছে একটি দুর্বল সেতুর করুণার ওপর। ব্যবসা ও জীবিকার সংকটে দুই পারের মানুষ।সেতুর ওপরে ভ্যানচালক রাব্বানী প্রতিদিন যাত্রী তোলেন। কিন্তু তার ভ্যান যখন সেতুর ওপর ওঠে, অন্য ভ্যানকে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হয়। “একসাথে দুটি ভ্যান চলতে পারে না। বড় গাড়ি উঠলেই সেতুটি কেঁপে ওঠে। তখন মনে হয় এখনই ধসে পড়বে।” বললেন রাব্বানী। ব্যবসায়ী মাঈনুদ্দিনও সেতুর ভয়ে দিন কাটান। তিনি ক্ষোভ মিশ্রিত কণ্ঠে বললেন, বড় গাড়ি উঠলেই বুক ধড়ফড় করে। মনে হয় সেতু এখনই নদীতে পড়বে। আমাদের দ্রুত নতুন ব্রিজ দরকার। নদীর ওপারের নি: শ্বাস রামদাড়া সেতুটি যেন মানুষের জীবনের সঙ্গে মিশে আছে। কারো সন্তান স্কুলে যাবে কি না, কারো ধান বাজারে পৌঁছাবে কি না, কারো যাত্রা গন্তব্যে পৌঁছাবে কি না সবকিছুর উত্তর নির্ভর করছে এই ভগ্নদশা কাঠামোর ওপর। এলজিইডির সদর উপজেলা প্রকৌশলী মাবুদ হোসেনও স্বীকার করেছেন বাস্তবতা সেতুটি মূলত হাঁটার জন্য নির্মিত হয়েছিল। বর্তমানে এটি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। মানুষের দাবি, জীবনের দাবি রামদাড়া গ্রামের মানুষের দাবি খুব সরল একটি নতুন সেতু। তাদের চোখে সেই সেতুটি শুধু ইট-পাথর বা লোহার কাঠামো নয়, বরং নিরাপত্তা, আশ্বাস, স্বপ্ন আর জীবনের ভরসা। সকাল-বিকেল সেতুতে দাঁড়ালে দেখা যায় জীবনের এক মিছিল শিশু, কৃষক, ব্যবসায়ী, শ্রমিক, নারী-পুরুষ। প্রত্যেকেই পারাপার করছেন, কিন্তু মনে একটাই ভয় “আজ যদি…” রামদাড়ার সেতুটি তাই শুধু একটি ভাঙা কাঠামো নয়, বরং মানুষের প্রতিদিনের আতঙ্ক, অসহায়তা আর প্রত্যাশার প্রতীক। নতুন সেতু নির্মাণই পারে এ ভয়াবহতা থেকে তাদের মুক্তি দিতে।

