আসন্ন আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ঠাকুরগাঁও জেলার ১, ২ ও ৩ সংসদীয় আসনে বইতে শুরু করেছে নির্বাচনি হাওয়া। রাজনৈতিক মাঠে এখন সরগরম পরিবেশ, বিভিন্ন দলের সম্ভাব্য প্রার্থীরা শুভেচ্ছা বার্তা এবং সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে নিজেদের সরব উপস্থিতি জানাচ্ছেন। বিশেষ করে বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীরা আগেভাগেই প্রচারণা শুরু করে দিয়েছেন। উত্তরের সীমান্তবর্তী জেলা ঠাকুরগাঁও এক সময় ছিল আওয়ামী লীগের ঘাঁটি। তবে ‘জুলাই আন্দোলন’ পরবর্তী সময়ে এই জেলার রাজনীতিতে ঘটেছে বড় ধরনের রদবদল। আওয়ামী দলের সংগঠন এখন কার্যত অকার্যকর, বেশিরভাগ নেতাই আত্মগোপনে। সেই শূন্যতা পূরণে সংগঠিত ও দৃশ্যমানভাবে রাজপথে সক্রিয় হয়ে উঠেছে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী। আওয়ামী লীগ নেই, আছে মামলা আর পুড়ে যাওয়া অফিস। জুলাই আন্দোলন’-এর সময় জেলার বিভিন্ন পর্যায়ে আওয়ামী লীগের কার্যালয় ও নেতাদের বাড়িতে হামলা হয়। ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় মামলা হয় অন্তত ১৮টি। আসামির তালিকায় নাম রয়েছে ৮৭১ জন নেতা-কর্মীর, অজ্ঞাতনামা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে আরও ১,৬৩০ জনকে। এই অবস্থায় দলের প্রায় সব পর্যায়ের নেতাই আত্মগোপনে চলে গেছেন। জেলা আওয়ামী লীগের কোনো কর্মসূচি নেই বললেই চলে। স্থানীয় রাজনীতিতে তারা কার্যত অনুপস্থিত। জেলা আওয়ামী লীগের এক সিনিয়র নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “মাঠে নামলেই গ্রেপ্তার, কেউ কোনো সাহস পাচ্ছে না, তাই নির্বাচন নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। বিএনপির ঘুরে দাঁড়ানোর সাথে সাথে সংগঠনে প্রান ফেরানোতে ব্যস্ত। বিএনপি এখন ঠাকুরগাঁও রাজনীতির সবচেয়ে সংগঠিত দল। দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নিজ জেলা হওয়ায় এখানে দলীয় তৎপরতা সর্বোচ্চ পর্যায়ে। সম্প্রতি দলীয় কার্যালয়টি নতুন করে নির্মাণের পর এখন জমজমাট হয়ে উঠেছে। প্রতিদিনই সেখানে অনুষ্ঠিত হচ্ছে বিভিন্ন কর্মসূচি। দলটির নেতাকর্মীরা গ্রামে গ্রামে ঘুরে উঠান বৈঠক, মিছিল এবং জনসংযোগ করছেন। জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মির্জা ফয়সল আমীন সাংবাদিক কামাল হোসেনকে বলেন,”নতুন জেলা কমিটি গঠনের পর মেয়াদোত্তীর্ণ উপজেলা ও ইউনিয়ন কমিটিগুলো পুনর্গঠনের কাজ করছে। সংগঠনকে আগের চেয়ে আরও শক্তিশালী করার চেষ্টায় ব্যস্ত।” সবচেয়ে সরব জামায়াতে ইসলামী। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় নিষ্ক্রিয় থাকলেও জামায়াত এখন ঠাকুরগাঁওয়ের মাঠের রাজনীতিতে সবচেয়ে বেশি সক্রিয়। জেলা সদর থেকে ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত চলছে নিয়মিত সভা, সাংগঠনিক প্রশিক্ষণ ও গণসংযোগ। জামায়াতের জেলা আমির বেলাল উদ্দিন প্রধান বলেন, “পূর্বের দমন-পীড়নের মধ্যেও আমরা সংগঠন ধরে রেখেছি। এখন আর কোনো বাধা নেই। জনগণ আমাদের পাশে আছে।” জাতীয় পার্টি, বাম জোট ও নতুন দলগুলো খুঁজে ফিরছে অবস্থান। বিএনপি-জামায়াতের দাপটে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে অন্যান্য দলগুলো। বিশেষ করে জাতীয় পার্টি, জাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টি ও এনসিপির তৎপরতা প্রায় শূন্য। এনসিপির যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক গোলাম মর্তুজা সেলিম বলেন, “জেলা-উপজেলায় এখনো সংগঠন গঠন হয়নি, সদস্য সংগ্রহ চলছে।” তবে গণ অধিকার পরিষদ এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ কিছুটা সক্রিয়। তারা বিভিন্ন জায়গায় গণসংযোগ ও প্রচারণা চালাচ্ছে। আসন ভিত্তিক নির্বাচনী প্রস্তুতিতে মাঠে রাজনৈতিক দলগুলো। ঠাকুরগাঁও জেলায় রয়েছে তিনটি সংসদীয় আসন ঠাকুরগাঁও-১, ২ ও ৩। জেলায় মোট ভোটারের সংখ্যা – ১২০১৪৭৩ জন, পুরুষ ভোটারের সংখ্যা -৬০৬৯০৭ জন, নারী ভোটারের সংখ্যা- ৫৯৪৫৫৯ জন। ভোট কেন্দ্রের সংখ্যা মোট – ৪১৭টি। প্রতিটি আসনেই এখন ব্যাপক আলোচনায় বিএনপি ও জামায়াত। ফ্যাক্ট তরুণ ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোট যার দিকে যাবে সেই দল এই আসনে বিজয়ী হবে।
ঠাকুরগাঁও -১ (সদর)
বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নিজস্ব এলাকা হওয়ায় এ আসন ঘিরে আগ্রহ তুঙ্গে। ভোটার সংখ্যা ৫ লাখ ৪৮ হাজার ৮৩৮; যার মধ্যে সংখ্যালঘু ভোটার ১ লাখ ১৯ হাজার এবং তরুণ ভোটার ১ লাখ ৯২ হাজার ৫৬৭। এ আসনে আওয়ামী লীগের রমেশ চন্দ্র সেন ২০০৮ থেকে টানা ৪ বার নির্বাচিত হলেও অভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিস্থিতিতে বিএনপি অনেকটা এগিয়ে রয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তবে ১৯৯১,১৯৯৬,২০০৮,২০১৮ সালে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ঠাকুরগাঁও -১আসনে পরাজিত হলেও ২০০১ সালের নির্বাচনে তিনি বিজয়ী হন, তার প্রাপ্ত ভোট সংখ্যা -১,৩৪,৯১০টি তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগের শ্রী রমেশ চন্দ্র সেনের প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা -৯৬,৯৪৮ টি। বিএনপির পক্ষ থেকে এখনও প্রার্থীর নাম ঘোষণা না হলেও মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকেই দেখা হচ্ছে প্রধান সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে। জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক পয়গাম আলী বলেন, “ভোটারদের সাড়া দেখে আমরা আশাবাদী এই আসনে বিপুল ভোটে জয়ী হবেন মির্জা ফখরুল।” অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে এ আসনে চূড়ান্ত প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে সাবেক শিবির সভাপতি ও কেন্দ্রীয় নেতা মো. দেলাওয়ার হোসেনকে। নিজ এলাকায় জনপ্রিয়তা ও রাজনৈতিক কর্মযোগের কারণে তিনিও ব্যাপক সাড়া ফেলেছেন।
ঠাকুরগাঁও -২ (বালিয়াডাঙ্গী, হরিপুর ও আংশিক রানীশংকৈল)
এ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৩৬ হাজার ১৭৭ জন। এরমধ্যে পুরুষ ভোটারের সংখ্যা ১লাখ ৭৩ হাজার ৭৩ জন এবং নারী ভোটারের সংখ্যা ১ লাখ ৬৩ হাজার ১০৩ জন। উল্লেখযোগ্য ভোটার গোষ্ঠী তরুণ (৯০ হাজার ৮৭৭) এবং সংখ্যালঘু (৪৪ হাজার ৬৯৮)। ১৯৮৬ থেকে ২০২4 সাল পর্যন্ত বারবার আওয়ামী লীগের দবিরুল ইসলাম ও তার পুত্র মাজহারুল ইসলাম সুজন নির্বাচিত হয়েছেন। তবে এবারের নির্বাচনে বিএনপি এবং জামায়াত উভয়ই শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিএনপির পক্ষে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে উঠে এসেছে জেলা বিএনপির সভাপতি ও মির্জা ফখরুলের ছোট ভাই মির্জা ফয়সাল আমিনের নাম। যদিও অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে দলীয় সংগঠনে ধীরগতি দেখা যাচ্ছে। জামায়াতের পক্ষে এ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন মাওলানা মো. আব্দুল হাকিম। উপজেলা জামায়াত সভাপতি রফিকুল ইসলাম বলেন, “গত পাঁচটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে লড়ে হেরে যাওয়া এই প্রার্থী এবারও সংখ্যালঘু ও সাধারণ ভোটারদের সহানুভূতি পাচ্ছেন।” গণঅধিকার পরিষদের কেন্দ্রীয় নেতা ফারুক হাসানও এ আসনে নিজের অবস্থান জানান দিতে মাঠে রয়েছেন, যদিও স্থানীয় পরিচিতি তুলনামূলক কম।
ঠাকুরগাঁও ৩ (পীরগঞ্জ ও রানীশংকৈল)
এ আসনের ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৬০ হাজার ৪৫৮ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটারের সংখ্যা – ১ লাখ ৮২ হাজার ৬৩৮ জন এবং নারী ভোটার ১ লাখ ৭৭ হাজার ৮১৮ জন এবং এরমধ্যে সংখ্যালঘু ভোটার ৫৩ হাজার ৫৭৬। এ আসনে ৪ টি রাজনৈতিক দল পূর্বে জয় লাভ করেছে, যার মধ্যে আওয়ামী লীগ – ৩ , জাতীয় পার্টি – ২, ওয়ার্কার্স পার্টি – ২ ও বিএনপি – ১ বার জয়ী হয়েছে। ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী জাহিদুর রহমানের প্রাপ্ত ভোট সংখ্যা – ৮৮ হাজার ৫১০টি, সতন্ত্র প্রার্থীর প্রাপ্ত ভোট সংখ্যা – ৮৪ হাজার ৩৯৫ এবং ওয়ার্কার্স পার্টির প্রার্থীর প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা -৩৮ হাজার ৬২টি। বিএনপির পক্ষে সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকায় রয়েছেন সাবেক সংসদ সদস্য জাহিদুর রহমান, অ্যাডভোকেট মো. জয়নাল আবেদিন, ওবায়দুল্লাহ মাসুদ, কামাল আহম্মেদ আনোয়ার, জিয়াউর রহমান জিয়া ও গোলাম মুর্তজা সেলিম। এদের মধ্যে জাহিদুর রহমান এগিয়ে থাকলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বই নেবে। অ্যাড. জয়নাল বলেন, “দল থেকে মনোনয়ন পেলে জয় নিশ্চিত।” জামায়াতের পক্ষে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন সাবেক উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান (মাস্টার)। তিনি বলেন, ১৭ বছর পর মানুষ ভোট দিতে পারবে, এবার জনগণ দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ভোট দেবে। ঠাকুরগাঁওয়ের ৩টি আসনেই আগামী নির্বাচনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের ইঙ্গিত স্পষ্ট। বিএনপি, জামায়াত ও অন্যান্য দলের প্রার্থীরা নির্বাচনি প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন নিয়মিত। তরুণ ও সংখ্যালঘু ভোটারদের মন জয় করাই হবে বিজয়ের মূল চাবিকাঠি। স্থানীয় ভোটারদের মতে, যদি অবাধ, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হয়, তাহলে ঠাকুরগাঁওয়ে বিরোধী দলগুলো শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে সক্ষম হবে। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে বর্তমান ঠাকুরগাঁওয়ের অবস্থা যে রকম হবে। বিশ্লেষকরা বলছেন, আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি ঠাকুরগাঁওয়ে রাজনীতির ভারসাম্যে বড় ধরনের পরিবর্তন আনবে। নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে এলে যদি আওয়ামী লীগ মাঠে ফিরতেও চান্স পায়, ততদিনে হয়তো তারা সংগঠনিকভাবে পিছিয়ে পড়বে। ফলে এই জেলার নির্বাচনী ফলাফল জাতীয় রাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। ঠাকুরগাঁওয়ের রাজনীতিতে এখন নাটকীয় পালাবদল চলছে। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি, বিএনপি-জামায়াতের সক্রিয়তা এবং নতুন রাজনৈতিক গোষ্ঠীর আত্মপ্রকাশ সব মিলিয়ে এই জেলার রাজনীতি একটি রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁওয়ের ফলাফলে সেই পরিবর্তনের প্রতিফলন স্পষ্ট হতে পারে।

