সিলেটের সাবেক জেলা প্রশাসকের বেআইনি অপকর্মের কারণে সিলেট পানি উন্নয়ন বোর্ডের ২৫০ কোটি টাকা মূল্যের ৮ একর জমি লুট হওয়ার পথে। স্বৈরশাসকের দোসরদের সঙ্গে মিলে প্রাক্তন জেলা প্রশাসক কাজী এমদাদুল ইসলাম ছিলেন এর নাটের গুরু। ২০১৮ সালের রাতের ভোটের নির্বাচনের অন্যতম কারিগর সিলেটের তৎকালীন জেলা প্রশাসক এম কাজী এমদাদুল ইসলাম শহরের প্রাণ কেন্দ্রে অবস্থিত আম্বরখানা মৌজায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের ৮ একর জমি বেআইনিভাবে কতিপয় ভূমিদস্যুর হাতে তুলে দেবার ভয়ঙ্কর ফন্দি এটেছিলেন।
সাবেক পররাষ্ট্র মন্ত্রী একে আব্দুল মোমেনের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ভূমিদস্যুদের যোগসাজসে ৮ একর জমি বেআইনিভাবে ফন্দি ফিকিরের মাধ্যমে রিজিউম করে ভূমিদস্যুদের নামে স্থায়ী বরাদ্দ দেয়ার যে পরিকল্পনা করেছিলেন তা রীতিমতো চাঞ্চল্যকর। বিভিন্নভাবে অনুসন্ধান ও নথিপত্র পর্যবেক্ষণ করে জানা গেছে, সিলেট পাউবোর মনু প্রকল্পের কলোনি ও অফিস ভবন নির্মাণের জন্য ৮ একরসহ মোট ১৫.০২ একর জমি এলএ কেস নং-১০/১৯৬৩-৬৪ এর মাধ্যমে ১৯৬৪ সালে অধিগ্রহণ করা হয়। ১৫.০২ একর জমির মধ্যে ৬.৬০ একর জমি বিধি মোতাবেক অধিগ্রহণ করা হয়নি মর্মে নিম্ন আদালতে স্বত্ব মামলা নং ০২/১৯৬৪ দায়ের করা হয়। মামলাটি বিভিন্ন স্তরের আদালতে রায়-আপিলের শেষে চূড়ান্তভাবে আপীল বিভাগের ৩২৯/১৯৬৯ নম্বর আপীল আবেদনে ১৯৮৩ সালের ৭ মার্চ পাউবোর অনুকূলে রায় দেয়া হয়। এতে জমি হতে অবৈধ দখল উচ্ছেদের কর্মসূচি হাতে নেয়া হয়। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে উচ্ছেদ কার্যক্রম বিলম্ব হতে থাকে এবং এক সময় কিছু ভূমিদস্যু ও দুর্বৃত্তরা এ প্রক্রিয়ায় যোগ দেয়। বেআইনি অধিগ্রহণ মর্মে উত্থিত মামলায় চূড়ান্তভাবে জয়ী হতে ব্যর্থ হয়ে ঐ সব ভয়ঙ্কর প্রকৃতির দুর্বৃত্ত ও ভূমিদস্যুরা জেলা প্রশাসককে হাত করে ডি-রিকুইজিশন কর্মসূচীর অবতারণা করেন এবং ১৯৯৬ সালে জেলা প্রশাসক স্বেচ্ছায় “আবেদনকারীদের আবেদনে উল্লেখিত হুকুমদখলকৃত অব্যাবহৃত ভূমির মূল মালিক আবেদনকারীগণ বিধায় অবমুক্তির আবেদন বিধিমতে করিয়াছেন” মর্মে প্রতিবেদন দাখিল করাতে সক্ষম হন। এর ধারাবাহিকতায় দুষ্কৃতিকারী চক্র উক্ত জমি অব্যাবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে বিধায় মূল মালিকদের অনুকূলে অবমুক্তির নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন নম্বর ৩৬২৯/২০০৯ দায়ের করা হয়। পরবর্তীতে সিভিল আপীল নম্বর ১২৭/২০১৪ এবং সর্বশেষ সিভিল রিভিউ পিটিশন নম্বর ৫১২/২০১৭ এর ২০১৮ সালের ৮ নভেম্বর চূড়ান্ত রায়ে পাউবো ডিক্রি লাভ করে। এতে অধিগ্রহণের ৫৫ বছর পর উপরোক্ত জমির উপর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নিষ্কণ্টক মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয়।
এদিকে ৫৫ বছর মামলা চলমান থাকায় একদিকে যেমন মনু প্রকল্পের কলোনি ও অফিস নির্মাণ ব্যাহত হয়, অপরদিকে সম্পত্তির কিছু কিছু অংশে অবৈধ স্থাপনা গড়ে ওঠে। কাজেই রায় পাওয়া পরপরই পাউবো থেকে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের উদ্যোগ নেয়া হয় এবং ২০১৯ সালের ২২ জানুয়ারি সিলেট পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী এক পত্রের মাধ্যমে উচ্ছেদের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য জেলা প্রশাসককে জানান এবং ২০১৯ সালের ২৪ জুলাই উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনার জন্য বিশেষভাবে পুনরায় অনুরোধ জানানো হয়। কিন্তু দুর্বৃত্তদের লালনকারী ও দুর্নীতিবাজ তৎকালীন জেলা প্রশাসক এম কাজী এমদাদুল ইসলাম উচ্ছেদ অভিযানের জন্য কোন আইনি কিংবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তার উদ্যোগ না নিয়ে উল্টো পাউবোকে ২০১৯ সালের ৩ সেপ্টেম্বর এক পত্রের মাধ্যমে জমির দাগসূচি, স্কেচ ম্যাপ ও অবৈধ দখলদারদের তালিকা প্রস্তুত করার নির্দেশ দেন এবং গোপনে ভূমিদস্যু ও মাফিয়া চক্রের সঙ্গে হাত মিলিয়ে তিনি অবৈধ দখলদারদের তালিকা প্রস্তুতির ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করেন। বাধা সৃষ্টি করেই তিনি ক্ষান্ত হননি, উল্টো সিলেট পাউবোর প্রকৌশলীদের পিছে লেলিয়ে দেন সন্ত্রাসীদের। ফলশ্রুতিতে থমকে যায় অবৈধ দখলদারদের তালিকা প্রস্তুতির কার্যক্রম। প্রকৌশলীদের ব্যাপক বাধার সম্মুখীন হতে হয় এবং কর্মকর্তা কর্মচারিদের প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়া হয়। ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা হয়। যা নির্বাহী প্রকৌশলীর ২০১৯ সালের ৫ সেপ্টেম্বরের এক পত্র উল্লেখ রয়েছে। এরই মধ্যে এমদাদুল ইসলাম বিগত ২০১৯ সালের ২৭ আগস্ট অব্যাবহৃত ভূমির বিষয়ে মতামত প্রদানের জন্য নির্বাহী প্রকৌশলীকে পত্র দিয়ে তা বিলি না করার নির্দেশ প্রদান করেন। ফলশ্রুতিতে বাধ্য হয়ে গোপন রাখা হয় পত্রের বিষয়টি। এই পত্রের অনুলিপি ভূমি, পানি এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে প্রেরণের কথা থাকলেও তা ধামাচাপা দিয়ে শুধুমাত্র তৎকালিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে দেয়া হয়। এতেই প্রমাণিত হয় স্বৈরশাসকের দােসর পলাতক পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আব্দুল মোমেন এই দুর্বৃত্ত এবং ভূমিদস্যু চক্রের লালনকারী। এদিকে ২০১৯ সালের ৩ নভেম্বর রিজিউম কমিটির সভার নাম করে নির্বাহী প্রকৌশলীকে ডেকে নিয়ে মোমেনের সামনে এই জমির প্রয়োজন নেই মর্মে লিখিত দেবার জন্য নির্বাহী প্রকৌশলীকে বাধ্য করা হয়। কিন্তু নির্বাহী প্রকৌশলী সভায় তীব্র আপত্তি জানিয়ে পাউবোর প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন এবং একই তারিখ পত্রের মাধ্যমেও জেলা প্রশাসককে প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি অবহিত করা হয়। অথচ এই সভার কোন কার্যবিবরণী বা সিদ্ধান্ত লিখিত আকারে কখনও প্রকাশ করা হয়নি। পরবর্তীতে অত্যন্ত গোপনে পাউবো বা পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়কে কোন কিছু না জানিয়ে ২০২০সালের ২ জানুয়ারি রিজিউম কেস নম্বর ০২/২০১৯ এর আদেশের একটি বেআইনি হাস্যকর নথির অবতারণা করা হয়। কিন্তু অসহায় পাউবোর প্রকৌশলীরা আশা ছাড়েননি। সমস্ত হুমকি ধমকি উপেক্ষা করে তাদের কার্যক্রম অব্যাহত রাখেন।
৫৫ বছর ধরে উক্ত মামলায় লড়াই করে আপীল বিভাগের রিভিউ আবেদনে চুড়ান্ত জয়লাভ অর্জিত হয়। যার ফলে জমির উপর পাউবোর নিরঙ্কুশ মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয়। এতে সিলেট পাউবোর কলোনির আবাসন সংকট কেটে যাবে এবং মনু প্রকল্পের অধিকর্তা সিলেট পাউবোর প্রধান প্রকৌশলী এবং বাসভবন নির্মাণের সুযোগ তৈরি হবে এই ভেবে কর্মকর্তা কর্মচারীদের মুখে যখন এক মুঠো হাসির ঝিলিক ছড়িয়ে পড়ে, ঠিক তখনই অশুভ চক্রের কুদৃষ্টি পড়ে এখানে। আপীল বিভাগের রায়ের পর উচ্ছেদ অভিযান বাধাগ্রস্ত করতে তৎকালিন ডিসি এমদাদুল আইন কানুনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে খাসকরণ কর্মসূচীর সূচনা করেন। ২০১৭ সালের আইনের ১৯(১) ও ১৯(২) ধারা মোতাবেক প্রত্যাশী সংস্থা যে কাজে অধিগ্রহণ করেছে সেই কাজ ব্যতিরেকে অন্য কাজে ব্যবহার করলে বা বিধি বহির্ভূতভাবে হস্তান্তর করলে ১৯(৩) ধারা মোতাবেক সরকারের পূর্বানুমোদন নিয়ে খাসকরন কেসের অবতারণা করতে পারে। কিন্তু বিচারাধীন থাকার কারণে বেদখল অব্যাবহৃত ভূমির ক্ষেত্রে জয়লাভের পর এ ধরনের খাসকরন মামলার অবতারণা করার কোন বিধান নেই। বরং অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করার বিধান রয়েছে। আইনের ৩ ধারায় অন্য আইনের উপর এটিকে প্রাধান্য দেবার কথা বলা হলেও এমদাদুল পূর্বের বিভিন্ন আইনের সারাংশ হিসেবে প্রণীত ভূমি অধিগ্রহণ ম্যানুয়াল, ১৯৯৭ এর ধারা ৭৮ অনুসুরণ করেছেন বলে রিজিউম মামলা নম্বর ০২/২০১৯ এর আদেশ এবং ২০২০ সালের ৫ জানুয়ারি খাসকরণ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করেছেন। অবৈধ দখলদারদেরকে উচ্ছেদের লক্ষ্যে ৩০ দিনের নোটিশ জারির বিধান থাকলেও এমদাদুল উল্টো প্রত্যাশী সংস্থাকে ৩০ দিনের বেআইনি নোটিশ প্রদান করেন এবং কার্যত ৫৫ বছর মামলা লড়াই করে জয়লাভের পর প্রত্যাশী সংস্থাকে উচ্ছেদ করে ভূমিদস্যুদের নামে স্থায়ী বরাদ্দ দেবার ফন্দি ফিকির খুঁজতে থাকেন তিনি। খাসকরণ মামলায় তিনি ভূমি অধিগ্রহণ ম্যানুয়াল, ১৯৯৭ এর যে ৭৮ ধারা প্রয়োগ করেছেন তাতে এ ধরনের নোটিশ দেওয়ার কোন বিধান নেই। বরং ৭৭ (খ) ধারা অনুযায়ী নোটিশ দেবার বিধান থাকলেও সেটি অধিগ্রহণের উদ্দেশ্য ব্যতিত অন্য উদ্দেশ্যে ব্যবহার করলে বা কোনভাবে হস্তান্তর করলে এবং কোনভাবেই বেদখল অব্যবহৃত জমির ক্ষেত্রে নয়। তাছাড়া সিলেটের নির্বাহী প্রকৌশলী এবং ৩ জন প্রধান প্রকৌশলী ক্রমাগতভাবে পত্রের মাধ্যমে মনু প্রকল্পের অধিকর্তা প্রধান প্রকৌশলী, সিলেটের অফিস ও বাসভবন নির্মাণ এবং কর্মচারী কোয়ার্টার নির্মাণের জন্য উক্ত জমির প্রয়োজনীয়তা এবং একটি প্রকল্প হাতে নেওয়ার ব্যাপারে বারবার তাগিদ দেন। পাউবোর সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক (যুগ্ম সচিব) একাধিকবার পত্রের মাধ্যমে খাসকরণ মামলা স্থগিত করে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের মাধ্যমে জমিটি পাউবোর ব্যবহার উপযোগী করার জন্য অনুরোধও করেন। পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে বিগত ২০২১ সালের ২৯ মার্চ এক পত্রে রিজিউম কার্যক্রম স্থগিত করে মন্ত্রণালয়ের নজরে আনার নির্দেশ প্রদান করা হয় এবং উচ্ছেদের পদক্ষেপ নিতেও অনুরোধ জানানো হয়। এমনকি এমদাদুলের সরাসরি রিপোর্টিং কর্মকর্তা সিলেটের বিভাগীয় কমিশনারের নেতৃত্বে বিভাগীয় উন্নয়ন কমিটির গত ২০১৯ সালের ২১ অক্টোবর এবং ২০১৯ সালের ১৮ ডিসেম্বর এক সভায় উক্ত জমির অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের বিষয় আলোচিত হয় এবং সভাপতি জেলা প্রশাসকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে উচ্ছেদের তড়িৎ ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা দেন যা উভয় সভার কার্যপত্রে প্রতিফলিত হয়েছে। এছাড়া ভূমি মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনক্রমে উক্ত জমি পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অন্য কাজে ব্যবহার করারও সুযোগ রয়েছে। অথচ জেলা প্রশাসক এমদাদুল ইসলাম আইন-কানুন, বিধি-বিধান, আদেশ-উপদেশ কোন কিছুই তোয়াক্কা করেননি। পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মোঃ মোকাব্বির হোসেনের মোবাইলে যোগাযোগ করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।তবে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের মহাপরিচালক মোঃ এনায়েত উল্লাহ দৈনিক পাঞ্জেরীকে বলেন, ‘সরকারি সম্পত্তি যারা অবৈধভাবে ভোগ দখলের সঙ্গে সম্পৃক্ত তাদের আইনের আওতায় আনা হবে এবং অচিরেই সিলেট পাউবোর বেহাত হওয়া সম্পত্তি উদ্ধারে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে’।

