প্রবাস ফেরত স্বামী আকরাম হোসেন হত্যার বিচার চেয়ে পাঁচ মাস যাবত পুলিশ, র্যাব ও প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন হতভাগ্য স্ত্রী গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার নারায়নপুর গ্রামের রিমা আক্তার। স্বামী হত্যার বিচার না পেয়ে সঠিক তদন্ত ও আসামিদের দ্রুত গ্রেফতারের দাবি জানান তিনি। বুধবার (১৬ এপ্রিল) দুপুরে স্থানীয় সাংবাদিকেদর সাথে আলাপকালে তিনি এ দাবী জানান। মামলার আসামীরা হলো পশের বরুন গ্রামের মৃত ইয়াকুব আলীর ছেলে সিরাজ উদ্দিন, মৃত আব্দুর রাজ্জাকের ছেলে রাজু এবং সেকুব আলীর ছেলে ইসমাইল , সিরাজুল ইসলামের ছেলে আজিজুল ইসলাম, রাজুর ছেলে শারিকুল, ভবনেরচালা গ্রামের জসিম উদ্দিনের ছেলে আতিকুল ইসলাম আতিক, নলী পলাশ গ্রামের মৃত শরাফত আলীর ছেলে নূরুল ইসলাম এবং রবিন্দ্র চন্দ্র মল্লিকের ছেলে শৈলন্দ্র চন্দ্র মল্লিক। তাদের মধ্যে আতিক, নূরুল ইসলাম এবং শৈলন্দ্র চন্দ্র মল্লিক স্বামীর বসত ভিটায় এসে আমাকেসহ ছেলেমেয়েদেরকে খুন করার হুমকি দেয়। ভুক্তভোগী আকরাম হোসেন গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার নলী পলাশ গ্রামের আলা উদ্দিনের ছেলে। সংসারে স্বচ্ছলতা ফেরানোর জন্য তিনি দীর্ঘদিন যাবত প্রবাস জীবন যাপন করেছেন। হত্যার প্রায় ৩ বছর আগে তিনি দেশে ফিরে গ্রামের বাড়ী গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার নলী পলাশ গ্রামে স্ত্রী, এক ছেলে ও দুই মেয়ে নিয়ে জমি কিনে বাড়ী নির্মাণ করে বসবাস করছিলেন। আসামীরা তাকে ও তার স্ত্রীকে হুমকি দিয়েছিলেন ২ কোটি টাকা লাগলেও বাড়ী থেকে সরিয়ে দিবে এবং পায়ের নিচে মাটি রাখবে না। আকরাম হোসেনের বাড়ী দখল করার জন্যেই আসামীরা তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করেছে বলে অভিযোগ করেন তাঁর স্ত্রী রিমা আক্তার। রিমা আক্তার বলেন, ২০২৪ সালের ৯ নভেম্বর তার স্বামী রাত সাড়ে ৮টায় বাড়ীর পাশে কিত্তনখোলা বিলে মাছ ধরার জন্য পাতানো জাল দেখতে যায়। রাত গভীর হলেও তিনি বাড়ীতে না আসায় ভাসুর দেলোয়ার এবং চাচা শ্বশুর সফিকুল সফি আমার স্বামীকে সম্ভাব্য সকল স্থানে খোঁজাখোঁজি করে পায়নি। পরদিন ১০ নভেম্বর সকাল ১০ টায় ভাসুর দেলোয়ারের মাধ্যমে খবর পাই আমার স্বামীর লাশ বিদ্যুৎস্পৃষ্ট অবস্থায় বরুন বিলে ইসমাইলের ক্ষেতে পাওয়া গেছে। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে স্বামীর মরদেহ দেখতে পাই। তিনি দাবী করেন তার স্বামীর মৃত্যু রহস্যজনক। তার সঙ্গে পাশের বরুন গ্রামের সিরাজ উদ্দিন, রাজু এবং ইসমাইলের জমি সংক্রান্ত মতবিরোধ থাকায় তাকে পরিকল্পিতভাবে রাতের আঁধারে হত্যা করে লাশ জমিতে পুঁতে রাখে। লাশের শরীরের সাতটি স্থানে বৈদ্যুতিক শকের চিহ্ন দেখা যায়। কিন্তু পুলিশ বলছে আকরাম হোসেন বিদ্যুতের তারে জড়িয়ে মারা গেছে। এ ঘটনায় কাপাসিয়া থানায় মামলা করতে গেলে পুলিশ বিভিন্ন অজুহাতে মামলা না নিয়ে বাদী নিহতের স্ত্রী রিমা আক্তারের কাছ থেকে কৌশলে স্বাক্ষর নিয়ে অপমৃত্যু মামলা রুজু করে। পরবর্তীতে তিনি গাজীপুর আদালতেও হত্যা মামলা দায়ের করেন। এ পরিপ্রেক্ষিতে মামলাটি গ্রহণ না করে পুলিশ বাদীকে হয়রানিসহ অপমান করে তাকে থানা থেকে বের করে দেয়। মামলাটির সুষ্ঠু তদন্ত ও আসামিদের দ্রুত গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি। আকরাম হোসেনের স্ত্রী ও মামলার বাদী রিমা আক্তার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সিরাজ উদ্দিন পরিকল্পনায় রাজু, ইসমাইল এবং তাদের সহযোগীরা আমার স্বামীকে পরিকল্পিতভাবে মেরে ফেলল। আমি এই হত্যার বিচার চাই। আমার মাদ্রাসা পড়ুয়া বড় মেয়ে আমাকে প্রশ্ন করে বাবা হত্যাকারীরা এখনো কীভাবে জন সম্মুখে ঘোরফেরা করছে। আমার বাবার হত্যাকারীদেরকে পুলিশ গ্রেফতার করছে না কেন? আসামীরা হুমকি দেয়। আমাকে এবং আমার সন্তানদের নিয়ে ভয়ে আছি। আসামীদের হুমকির ভয়ে এক মেয়ে ও এক শিশু সন্তানকে নিয়ে স্বামীর বাড়ী ছেড়ে বাবার বাড়ীতে গিয়ে থাকতে হচ্ছে। ছেলে-মেয়েরা ভয়ে স্কুল মাদ্রাসায় যেতে পরছে না। তাদের লেখাপড়া বন্ধ হওয়ার পথে। এদিকে, স্বামী নিহতের ঘটনায় মামলা দায়ের করে আসামিদের হুমকিতে প্রাণ ভয়ে ছেলে-মেয়ে নিয়ে স্বামীর বাড়ী ছেড়ে বাবার বাড়ীতে বসবাস করছেন নিহতের স্ত্রী রিমা আক্তার। বুধবার (১৬ এপ্রিল) শ্রীপুরের নারায়নপুরের বাবার বাড়িতে গেলে সাংবাদিকদের কাছে অভিযোগ করেন আকরাম হোসেনের স্ত্রী। নিহতের স্ত্রী আরো জানান, আসামীদের সাথে দীর্ঘদিন যাবত ভিটেবাড়ী নিয়ে বিরোধ চলে আসছিল। এর জেরে আসামীরা পূর্ব পরিকল্পিতভাবে বরুন বিলে ইসমাইলের ক্ষেতের চারপাশে জিআই তার স্থাপন করে তাতে বিদ্যুৎ সংযোগ দিয়ে রাখে। ক্ষেতের পানিতে নামার পর রাতের আঁধারে আমার স্বামীকে তারা শরীরের ৭ স্থানে বৈদ্যুতিক শক দিয়ে হত্যা করে লাশ জমিতেই পুঁতে রাখে। এ ঘটনায় সুরতহাল শেষে ময়নাতদন্ত হয়। ময়না তদন্ত প্রতিবেদনে আমার স্বামীকে বৈদ্যুতিক শক দিয়ে হত্যার প্রমাণ পাওয়া যায়। ৬ মাস যাবত তিনি ছেলে-মেয়ে নিয়ে স্বামীর বাড়ী ছেড়ে বাবার বাড়ী পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। তিনি স্বামীর হত্যার আসামিদেরকে দ্রুত গ্রেফরের জন্য কাপাসিয়া থানা পুলিশের প্রতি জোর দাবি জানান। আসামীদের মধ্যে নূরুল ইসলাম বলেন, আকরাম হোসেন তার বাড়ীর সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করার সময় এক হাত ছেড়ে দিয়ে প্রাচীর নির্মাণ করার জন্য বলেছিলাম। সে জমিতে মাছ ধরার জন্য গেলে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যায়। আমাদের বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে হত্যার যে অভিযোগ আনা হয়েছে তা সঠিক নয়। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কাপাসিয়া থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) আজাদ জানান, নিহত প্রবাসী আকরাম হোসেনের স্ত্রীর দায়ের করা মামলাটি চলমান রয়েছে। আসামিরা গাজীপুরের বিজ্ঞ আদালত থেকে জামিনে রয়েছেন। তদন্ত সাপেক্ষে যত দ্রুত সম্ভব আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন (চার্জশিট) জমা দেওয়া হবে। প্রসঙ্গত, ২০২৪ সালের ৯ নভেম্বর বাড়ীর পাশে কিত্তনখোলা বিলে মাছ ধরার জন্য পাতানো জাল দেখতে যায় আকরাম হোসেন। পরদিন সকাল ১০ টায় বরুন বিলে ইসমাইলের ক্ষেতে পোঁতা অবস্থায় তার লাশ পাওযা যায়।

