ঠাকুরগাঁওয়ে আধুনিক প্রযুক্তির অপব্যবহার করে মাদক ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে একটি সংঘবদ্ধ চক্র। মাদকের এই অবৈধ বাজারে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে বিভিন্ন অ্যাপের মাধ্যমে অর্ডার ও ডেলিভারি ব্যবস্থাপনা। ফলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রচলিত পদ্ধতিতে অভিযান চালিয়েও কার্যকর ফলাফল পাচ্ছে না, আর মাদক ব্যবসায়ীরা থাকছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। হোয়াটসঅ্যাপ, টেলিগ্রাম, ফেসবুক মেসেঞ্জারসহ বিভিন্ন এনক্রিপ্টেড অ্যাপ ব্যবহার করে মাদক ব্যবসায়ীরা তরুণ ও যুবকদের কাছে সহজে মাদক পৌঁছে দিচ্ছে। এসব অ্যাপের মাধ্যমে আগেভাগেই যোগাযোগ করে নির্দিষ্ট স্থান ও সময়ে ডেলিভারির ব্যবস্থা করা হয়। ফলে সরাসরি হাতেনাতে ধরার সুযোগ কমে যাচ্ছে। শহর থেকে গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত মাদকের এই ব্যবসা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। বিশেষ করে মোটরসাইকেল, প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাসের মতো অত্যাধুনিক যানবাহন ব্যবহার করে অল্প সময়ের মধ্যেই এক স্থান থেকে অন্য স্থানে মাদক পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। তাছাড়া মূল মাদক ব্যবসায়ীরা নিজের সাথে মালামাল বহন করে না, তারা তাদের নির্দিষ্ট স্থানে মাদক লুকিয়ে রাখে এবং সেখান থেকে মাদক অ্যাপসের মাধ্যমে মাদক দিয়ে থাকে। শুধু তাই নয় শহরের অলিগলিতে ব্যবসায়ীরা খুব সহজেই মাদক সরবরাহ করছে, ফলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি এড়ানো সম্ভব হচ্ছে। ঠাকুরগাঁও শহরের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান মাদকের ব্যবসার মূল কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য এলাকাগুলো হলো আর্ট গ্যালারির আশপাশ,হকার্স মার্কেট, বিসিক শিল্প নগরীর বিভিন্ন পয়েন্ট ,প্রেস ক্লাবের মাঠ, সুইপার পট্টি, নিশ্চিতপুর হ্যাডস মোড়, ডিসি বস্তি, বাসস্ট্যান্ড এলাকা। এসব স্থানে প্রকাশ্যে মাদক বিক্রির অভিযোগ উঠলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা তেমন চোখে পড়ছে না বলে স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করছেন। সাম্প্রতিক অভিযানে দেখা গেছে, মাদক ব্যবসায়ীরা অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও কৌশল ব্যবহার করলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এখনো প্রচলিত এনালগ পদ্ধতিতে অভিযান পরিচালনা করছে। ফলে তাদের কার্যক্রম তেমন সফল হচ্ছে না। এদিকে, মাদক কেনাবেচায় প্রযুক্তির ব্যবহার সম্পর্কে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনেক সদস্যের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও আধুনিক প্রযুক্তির জ্ঞান না থাকায় অপরাধীরা সহজেই আইনের ফাঁক গলে পালিয়ে যাচ্ছে। মাদকের কারণে ঠাকুরগাঁওয়ে দিন দিন সামাজিক অপরাধের হার বৃদ্ধি পাচ্ছে। চুরি, ছিনতাই, কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত এবং পারিবারিক সহিংসতার মতো অপরাধের সংখ্যা বেড়েছে। বিশেষ করে তরুণ সমাজ মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়ায় শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। ঠাকুরগাঁওবাসী মাদকের এই বিস্তার নিয়ে চরম উদ্বিগ্ন। তাদের দাবি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রযুক্তিগত দক্ষতা বাড়িয়ে মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান পরিচালনা করতে হবে। পাশাপাশি, তরুণ সমাজকে মাদকের হাত থেকে রক্ষায় সচেতনতা বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও সংস্কৃতি-খেলাধুলার সুযোগ বাড়ানোর দিকেও গুরুত্ব দিতে হবে। ঠাকুরগাঁওয়ে মাদক ব্যবসার নতুন রূপ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় অপরাধীরা যেভাবে সক্রিয় হয়ে উঠেছে, তা মোকাবিলায় প্রযুক্তিনির্ভর কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যাবে। এ অবস্থায় মাদক নির্মূলে প্রশাসনের পাশাপাশি সমাজের সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন বিশিষ্টজনেরা।

