
মমতার কুল বাগানে কন্যা রতি রাণী
নিজস্ব প্রতিনিধি : পঁচিশ শতাংশের একটি কুল বাগান। চলতি বছর এই বাগান থেকে ৫৫ হাজার টাকার কুল বিক্রি হয়েছে। আরো কমপক্ষে ষাট হাজার টাকার কুল বিক্রি হবে, হাসিমুখে জানালেন মমতা রাণী সরকার। কুলচাষ তাকে দিয়েছে সুন্দর একটি জীবনের স্বপ্ন-নতুন দিনের আশা।
গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলার বড়দাউদপুর গ্রামে আঠার বছর আগে এসএসসি পাশ মমতা রাণী গৃহবধূ হিসাবে এসেছিলেন অষ্টম শ্রেণী পাশ রতন সরকারের ঘরে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও বাবা মায়ের কথামত বিয়ে করতে হয়েছিল রতন সরকারকে। মমতার বড় ইচ্ছা ছিল এমএ পাশ করার পর চাকরি করবেন-তারপর বিয়ের কথা ভাববেন। কিন্তু মমতার সে স্বপ্ন আর আলোর মুখ দেখেনি। বাবা মায়ের অভাব অনটনের সংসারে মাধ্যমিক পাসের পর এগোনো সম্ভব হয়নি। বিয়ের পর সংসারে মনোযোগী হন মমতা। স্বামী, এক মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে সুখের সংসার তার। কিন্তু অর্থের অভাবে সন্তানদের যেন তার মতো অল্পতেই পড়ালেখা বন্ধ না হয় সেই দুশ্চিন্তা লেগেই থাকত।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের দ্বিতীয় শস্য বহুমুখীকরণ প্রকল্প (এসসিডিপি)’র সহায়তায় কুলচাষ মমতা রাণীর জীবন বদলে দিয়েছে। তিনি এখন সন্তানদের উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করার পাশাপাশি সুন্দর ও সচ্ছল জীবন যাপনের স্বপ্ন বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। চোখে মুখে তার দৃঢ় প্রত্যয়ের ছাপ। মমতা জানালেন, দুই সন্তানকে এমএ পাশ করাবেন। আরো জানালেন, দুই বছর আগেও সংসারে অভাব অনটন লেগেই থাকত; কিন্তু বর্তমানে কোন অভাব নেই। দুই সন্তানের মধ্যে সাড়ে ১৪ বছরের মেয়ে রতি রাণী সরকার বড়, মেধাবী ছাত্রী, মাদারগঞ্জ দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণীতে পড়ছে সে। চটপটে রতি রাণীও মায়ের মতো আত্মবিশ্বাসী; জানালো স্বনির্ভর জীবন গড়ার স্বপ্নের কথা। পড়াশুনার ফাঁকে নিয়মিত বরইবাগান পাহারা ও পরিচর্যা করে মায়ের স্বপ্ন ও সাধ পূরণে সাহায্য করে।
প্রচন্ড আত্মবিশ্বাসী রতি রাণী জানালো, বড় হয়ে স্কুল শিক্ষিকা হবে। মায়ের ইচ্ছামত এমএ পাস করে চাকরির পর বিয়ের কথা ভাববেন। মমতা রাণীর ১২ বছরের ছেলে রণি সরকারও চটপটে, মেধাবী; বোনের সাথে একই স্কুলে সপ্তম শ্রেণীতে পড়ে। রণি পড়াশুনার পাশাপাশি নিয়মিত সংগীত চর্চাও করে। ইতোমধ্যে রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে সংগীত পরিবেশন করে বংশগত প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছে। মমতার স্বামী রতন সরকার অতিভদ্র মানুষ হিসাবে এলাকায় পরিচিত। সংগীতে প্রতিভাবান রতন যে কোন বিষয়ের উপর তাৎক্ষণিক গান লিখে ও গেয়ে শোনাতে অত্যন্ত পটু। কৃষি ও মৎস্য বিষয়ক জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও প্রচার কাজে সংগীত পরিবেশনের জন্য তিনি ইতোমধ্যে ডেনমার্ক, সুইডেন ও সিঙ্গাপুর সফর করেছেন।
রতন জানালেন, অনেক আগে থেকেই বিভিন্ন শাকসবজি, ফলমূল আবাদ করলেও ২০১২-১৩ সালে দ্বিতীয় শস্য বহুমুখীকরণ প্রকল্প (এসসিডিপি) থেকে সাদুল্লাপুর উপজেলা কৃষি অফিসের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ নেয়ার পর থেকে কুলচাষে আকৃষ্ট হন। স্থানীয় উপসহকারি কৃষি কর্মকর্তা প্রভাত কুমার অধিকারির সহায়তায় কুলচাষ শুরু করেছিলেন। প্রথম বছর পঁচিশ শতাংশের কুলবাগান থেকে পঁয়তাল্লিশ হাজার টাকা এবং পরের বছর ষাট হাজার টাকা লাভ করেছেন। কিন্তু এ বছর তার প্রত্যাশা লক্ষাধিক টাকার উপর।
রতন জানালেন, কুল চাষ করে লাভের টাকা দিয়ে তিনি পাকা বাড়ি তৈরি করেছেন। আগে তিনি কুঁড়েঘরে থাকতেন। তিনি আরো জানান, তার কুল বাগানের ফলন আশপাশে অন্যান্য চাষিদের চেয়ে বেশি। সার প্রয়োগের বিষয়ে জানতে চাইলে রতন বলেন, ইউরিয়া, টিএসপি, এমওপি, জিপসাম সারের পাশাপাশি নিজ বাড়িতে তৈরি ভার্মি কম্পোস্ট বা কেঁচো সার গর্তপ্রতি গড়ে ১০ কেজি ব্যবহার করেন। রতনের মতে, কেঁচোসার এবং বাগানের নিয়মিত পরিচর্যাই তার অধিক ফলনের রহস্য। কুলচাষে বাড়িতে তৈরি কেঁচোসার বাদে অতিরিক্ত খরচ হয় মাত্র বার থেকে তের হাজার টাকা। পঁচিশ শতাংশ জমিতে মোট একশ’ আটত্রিশটা কুলগাছ তার। প্রতি বছর পুরাতন গাছ কেটে নতুন করে গাছ লাগান রতন। বসতভিটাসহ তার মোট সাড়ে তিন বিঘা জমি। ফসলী জমিতে ধান, শাকসবজি ও ফলমূল আবাদ করলেও মূলত কুলচাষই এনে দিয়েছে আর্থিক স্বচ্ছলতা, সম্মান, ছেলেমেয়ের উচ্চ শিক্ষাসহ উন্নত জীবনের স্বপ্ন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সাদুল্লাপুরের উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. ওবায়দুর রহমান মণ্ডল দৈনিক পাঞ্জেরীকে বলেন, দ্বিতীয় শস্য বহুমুখীকরণ প্রকল্পের কার্যক্রমের ফলে এসসিডিপি গ্রুপের চাষিদের মধ্যে কুল চাষসহ উচ্চমূল্য ফসলের আবাদ জনপ্রিয়তা পেয়েছে-তাদের আয়ও বেড়েছে। নিয়মিত প্রশিক্ষণ প্রদানসহ বিভিন্ন বিষয়ে সহযোগিতার মাধ্যমে চাষিদের উচ্চমূল্যের ফসল আবাদে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। মমতা রাণী ও রতন সরকারের মতো আরো অনেকে কুলচাষসহ অন্যান্য ফসল আবাদ করে সুন্দর ও সচ্ছল জীবন গড়ার স্বপ্ন দেখছেন।

