
নোয়াখালী, ফেনী ও লক্ষ্মীপুরে ফসল উৎপাদনে বিএডিসি’র বিস্ময়কর সফলতা
নিজস্ব প্রতিনিধি : বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)’র আওতাধীন নোয়াখালী, ফেনী ও লক্ষ্মীপুর জেলায় ক্ষুদ্রসেচ উন্নয়ন প্রকল্পের বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়নের ফলে প্রকল্পভুক্ত এলাকায় ফসল উৎপাদনে বিস্ময়কর সফলতা এসেছে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, প্রকল্প এলাকায় গত বোরো মৌসুমে প্রায় ৫৫ হাজার মেট্রিক টন অতিরিক্ত খাদ্য শস্য উৎপন্ন হয়েছে যার বাজার মূল্য প্রায় ১৩৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা। সূত্র জানায়, প্রকল্পের মাধ্যমে ২০১৭-১৮, ২০১৮-১৯ ও ২০১৯-২০ অর্থ বছরে খাল পুনঃখনন ও সংস্কার কার্যক্রম ৪০০ কিলোমিটারের মধ্যে ২৮৩ কিলোমিটার, হাইড্রোলিক স্ট্রাকচার ১২৫টির মধ্যে ৯৩টির নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এছাড়া ৭০টি এলএলপি স্থাপন করা হয়েছে। এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে ইতোমধ্যে প্রায় ১৬,০০০ হেক্টর জমি সেচের মাধ্যমে চাষাবাদের আওতায় এসেছে; এর মধ্যে প্রায় ৬,৫০০ হেক্টর জমি নতুনভাবে চাষাবাদের আওতায় আনা হয়েছে। সেচ সুবিধা প্রদান করায় যে জমিতে পূর্বে হেক্টর প্রতি ফলন ছিল ৩টন, তা এখন ৫ থেকে ৫.৫০ টনে উন্নিত হয়েছে। এ হিসেবে প্রকল্প এলাকায় গত বোরো মৌসুমে প্রায় ৫৫ হাজার মেট্রিক টন অতিরিক্ত খাদ্যশস্য উৎপন্ন হয়েছে যার বাজার মূল্য প্রায় ১৩৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা। এছাড়া উপকূলীয় চরাঞ্চলে খাল পুনঃখননের ফলে আরো প্রায় ৫,০০০ হেক্টর জমির জলাবদ্ধতা দূর হয়েছে এবং গত আমন মৌসুমে নির্বিঘ্নে আমন চাষ করা সম্ভব হয়েছে। এতে পূর্বে যে জমিতে ২.৫ টন/হেক্টর ফলন ছিল তা বেড়ে ৫ টন/হেক্টরে উন্নিত হয়েছে। জলাবদ্ধতা দূরীকরণের মাধ্যমে অতিরিক্ত আরো প্রায় ১২,৫০০ মেট্রিক টন খাদ্য শস্য উৎপন্ন হয়েছে যার বাজার মূল্য প্রায় ৩১ কোটি ২৫ লাখ টাকা।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বৃহত্তর নোয়াখালী অঞ্চলের কৃষির প্রধান দুই চ্যালেঞ্জ হল জলাবদ্ধতা ও লবণাক্ততা। প্রকল্পের বিভিন্ন কার্যক্রম যেমন খাল খনন, সেচ অবকাঠামো নির্মাণ, সেচ পাম্প স্থাপন, সেচ পাম্পের ভূ-গর্ভস্থ সেচ পাইপ লাইন স্থাপন ইত্যাদির মাধ্যমে প্রকল্পের আওতাভুক্ত এলাকায় জলাবদ্ধতা দূর করা হচ্ছে এবং লবনাক্ততা দূর করে চাষাবাদের আওতায় আনা হয়েছে।
প্রল্পের কার্যক্রম বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা এবং সফলতার বিষয় উঠে এসেছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত প্রকল্পটির নিবিড় পরিবীক্ষণ সম্পন্ন করে। এ লক্ষ্যে আইএমইডি কর্তৃক নিয়োগকৃত পরামর্শক প্রতিষ্ঠান প্রকল্প এলাকার ২০টি উপজেলায় প্রকল্পের আওতায় বাস্তবায়িত বিভিন্ন কার্যক্রম পরিদর্শন করে এবং সংশ্লিষ্ট উপকারভোগী কৃষকদের সাথে মতবিনিময় করে। এ সময় প্রকল্পের পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সদস্যরা প্রকল্পের প্রভাব সম্পর্কেও তথ্য সংগ্রহ করেন। নিবিড় পরিবীক্ষণ প্রতিবেদনে প্রকল্পের আওতায় সেচ ও আবাদের ফলে ফসল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রাা ৮০ শতাংশ ইতোমধ্যে অর্জিত হয়েছে; পাশাপাশি ৩০ শতাংশ সেচ এলাকা সম্প্রসারিত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। এছাড়া খাল পুনঃখনন এবং সংস্কারের মাধ্যমে দ্রুত পানি নিষ্কাশন করা যাচ্ছে বলে জমির জলাবদ্ধতা হ্রাসের ফলে অনেক অধঃপতিত (লবণাক্ততার কারণে পতিত) জমি সেচের আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, পূর্বে যে জমি লবণাক্ত ছিল বর্তমানে সে জমি বোরো ধান উৎপাদনে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে পূর্বের তুলনায় বর্তমানে প্রায় ৩০ শতাংশ অতিরিক্ত জমিতে ফসল উৎপাদন এবং শস্য বহুমুখীকরণের ফলে ধানের ফলন ৮০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
সূত্র জানায়, ১ ডিসেম্বর-২০১৭ থেকে ৩১ ডিসেম্বর-২০২১ মেয়াদী নোয়াখালী, ফেনী ও লক্ষ্মীপুর জেলায় ক্ষুদ্রসেচ উন্নয়ন প্রকল্প ৩টি জেলার ২০টি উপজেলায় বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে। প্রকল্পটি ভূ-পরিস্থ পানির পরিমিত ব্যবহারের মাধ্যমে প্রতি বছর ২০,৩৩৮ হেক্টর জমির কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি করে ২১,৯৬৫ লাখ টাকা মূল্যের ৯১,৫২১ মেট্রিক টন খাদ্য শস্য উৎপাদনের লক্ষ্যে কাজ করছে। পাশাপাশি মেঘনা মোহনার মিষ্টি পানি ব্যবহার করে পানি ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের মাধ্যমে অধঃপতিত জমির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিও প্রকল্পের অন্যতম উদ্দেশ্য। পরিবেশবান্ধব সেচ অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে ভূ-পরিস্থ পানির ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন, জলাবদ্ধতা দূরীকরণের মাধ্যমে ২,০০০ হেক্টর জমি চাষাবাদের আওতায় আনয়ন, সেচ কাজে টেকসই প্রযুক্তির ব্যবহার এবং কৃষক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সেচ দক্ষতা বৃদ্ধিকরণ ও ফলন পার্থক্য কমিয়ে আনার লক্ষ্যে প্রকল্পের বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়িত হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পের লক্ষ্যমাত্রা ২,০০০ হেক্টর হলেও ইতোমধ্যে প্রায় ৫,০০০ হেক্টর জমির জলাবদ্ধতা দূর হয়েছে। ফলে নির্বিঘ্নে আমন ফসল আবাদ করা সম্ভব হচ্ছে; যা আগে সম্ভব ছিল না। আগে জলাবদ্ধতার জন্য আমনের জমিতে দেরিতে রোপন করায় রবি মৌসুমে অন্য ফসল চাষাবাদ করা যেতোনা। এখন জলাবদ্ধতা না থাকায় আমন আগে আগে রোপন করা সম্ভব হচ্ছে, ফলে আমন ফসল আগে আগে তোলাও যাচ্ছে। এতে করে তরমুজ, শসা, খিরাই, সয়াবিন, বাদাম ইত্যাদি ফসল ফলানো সম্ভব হচ্ছে। এছাড়া প্রকল্পের মাধ্যমে ইতোমধ্যে বিভিন্ন খাল খনন করা হয়েছে, খননকৃত উল্লেখযোগ্য খালসমূহ হলোÑ বাতানখালী খাল, চর আলাউদ্দিন খাল, শোল্লোকিয়া খাল, বাগ্গারদোনা খাল, পেটকাটা খাল, গোপাল খাল, মুন্সির খাল, হাইস্যার খাল, বানুবিবির খাল, বাবুল আক্তার খাল, চর যাত্রাখাল ইত্যাদি। রবি মৌসুমে খননকৃত এসব খালে জমানো পানি দিয়ে রবি শস্যে সেচ দেয়া হচ্ছে, তাই ফলনও কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। প্রকল্প কর্তৃক খাল খননের পাশপাশি ঐ খালের শাখা প্রশাখাও খনন করে উৎস খালের বা নদীর সাথে যুক্ত করে দেয়া হয়েছে; তাই দ্রুত পানি নেমে যেতে পারছে এবং জলাবদ্ধতা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে।
প্রকল্প সূত্র জানায়, লবণাক্ত জমিতে মিঠা পানির সাহায্যে সেচ প্রদান করা হলে মাটির উপরের স্তরের লবণ নিচের স্তরে নেমে যায়। এ কৌশল অবলম্বন করে লবণাক্ত জমিতে চাষাবাদ বাড়ানো সম্ভব। নোয়াখালী, ফেনী ও লক্ষ্মীপুর জেলায় ক্ষুদ্রসেচ উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় খননকৃত খালে জমানো পানি এবং মেঘনা অববাহিকার রহমতখালীসহ বিভিন্ন নদী ও খালের মিষ্টি পানি বিভিন্ন ক্ষমতার ১৮৫টি এলএলপি’র সাহায্যে উত্তোলন করে সেচের মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে লবণাক্ত জমি চাষাবাদের আওতায় আনা হচ্ছে। প্রকল্পটি কর্তৃক বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়নের ফলে প্রকল্প এলাকায় কৃষকদের আয় বৃদ্ধি পেয়েছে, কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি তাদের জীবনযাত্রার মানও উন্নত হয়েছে এবং সামাজিক জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে বলে জানা গেছে।

