ঢাকাWednesday , 1 January 2020
  1. অর্থনীতি
  2. আইন-আদালত
  3. আন্তর্জাতিক
  4. আবহাওয়া
  5. কৃষি ও অন্যান্য
  6. খেলাধুলা
  7. গল্প ও কবিতা
  8. জাতীয়
  9. তথ্যপ্রযুক্তি
  10. দেশজুড়ে
  11. ধর্ম ও জীবন
  12. প্রবাস
  13. বানিজ্য
  14. বিনোদন
  15. বিশেষ প্রতিবেদন
আজকের সর্বশেষ সবখবর

কারাগার যাদের দেখিয়েছে আলোর পথ

Link Copied!

কুষ্টিয়া সংবাদদাতা : অপরাধীদের সাজার জন্য কারাগার, এটা সকলের জানা। কিন্তু কারাগারের অভ্যন্তরের অনেক কাহিনী জানেনা সাধারণ মানুষ।
নুর মোহাম্মদ। কুষ্টিয়া শহরের চৌড়হাস এলাকার মুনসাদ আলীর ছেলে। একটি মামলায় সে বেশ কিছুদিন কুষ্টিয়া কারাগারে বন্দি ছিলেন। বন্দি থাকা অবস্থায় তিনি তিন মাস মেয়াদী ইলেকট্রিক এন্ড হাউজ ওয়ারিং কাজের ট্রেনিং গ্রহণ করেন। জামিনে বের হয়ে এসে তিনি এখন ইলেকট্রিক ওয়ারিংকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন।
প্রতিদিন গড়ে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা উপার্জন হয় নুর মোহাম্মদের। এ দিয়ে তার সংসার চলে। তার মতো নাহিদ হাসান, নাসিম, চান্নু মিয়া, সুমন আহমেদ, রুবেল হোসেন, ফজলে রাব্বিসহ অনেকেই এখন পেশাদার ইলেকট্রিক মিস্ত্রি। কারাগার তাদের আলোর পথ দেখিয়েছে। অপরাধ ছেড়ে বেছে নিয়েছেন পেশা। এতে তাদের মর্যাদা বেড়েছে সমাজের কাছে।
খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, কারা কর্তৃপক্ষের নেয়া বেশ কয়েকটি পদক্ষেপে আমূল বদলে গেছে কারাগার। বিশেষ করে বন্দিদের আলোর পথে নিয়ে আসার জন্য বর্তমান জেল সুপার জাকের হোসেন নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। বিশেষ করে গত দুই বছরে কারাগার বদলে গেছে। প্রথম দিকে নানা চ্যালেঞ্জ থাকলেও এখন সুবিধা পাচ্ছেন কয়েদি ও হাজতিরা। জেল সুপার জাকের হোসেনের আন্তরিক প্রচেষ্টায় কুষ্টিয়া জেলা কারাগার এখন মাদক ও নিরক্ষরমুক্ত।
কারা কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, সরকারের একটি কর্মসূচী আছে নিরক্ষর কেউ থাকবে না। সেই কর্মসুচী বাস্তবায়ন হচ্ছে কুষ্টিয়া কারাগারে। নতুন কোন আসামি কারাগারে আসলে তার তথ্য সংগ্রহ করা হয়। কেউ লেখাপড়া ও নাম স্বাক্ষর না জানলে তাকে আলাদা ওয়ার্ডে রাখা হয়। কারগারে আসার পর দিনই শুরু হয় নাম স্বাক্ষর শেখানো। বর্তমানে একটি মামলায় যাবজ্জীবন জেল হওয়া উচ্চশিক্ষিত সোহেল রানা শিক্ষক হিসেবে কাজ করছেন।
সোহেল রানা জানান, তিনি এ পর্যন্ত কারাগারে ৯০০জনকে স্বাক্ষরসহ লেখাপড়া শিখিয়েছেন। ২০১৭ সাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত ৩ হাজার ২৮৮জনকে স্বাক্ষরসহ লেখাপড়া শেখানো হয়েছে।
লাহিনীপাড়া এলাকার পারুল নামের এক নারী জানান, তার স্বামী ইসমাইল কারাগারে আছেন। নাম স্বাক্ষরসহ লেখাপড়া জানতেন না। কারাগারে আসার পর এখন পড়তে পারেন নামও লিখতে পারেন। এছাড়া কুরআন শিক্ষা গ্রহণ করেছেন তিনি।
কারাগার সূত্রে জানা গেছে, কারাগারকে প্রকৃত পক্ষেই সংশোধনাগার করতে পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। যাতে মাদক ব্যবসায়ী, ছিনতাইকারী, চুরিসহ নানা অপরাধ করে আসা আসামিরা কারাগার বের হয়ে কাজ করে জীবন যাপন করতে পারে। সেই উদ্যোগের অংশ হিসেবে তাঁতপল্লী ও হস্তশিল্প, পাওয়ার লুম, দর্জি প্রশিক্ষণ, ইলেকট্রিক এন্ড হাউজ ওয়ারিং এর মত বিষয়গুলো হাজতিদের ট্রেনিং করানো হচ্ছে। পাশাপাশি কয়েদিরাও শিখছে এসব কাজ।
কুষ্টিয়ার কুমারখালী থেকে কয়েকজন শিক্ষক এসে প্রথমে কয়েদিদের প্রশিক্ষণ দেন। এরপর কয়েদিরা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হয়ে নিজেরাই হস্তশিল্প ও পাওয়ার লুমে প্রশিক্ষণ প্রদান করছেন। তারা নিজেরাই শাড়ি, লুঙ্গী উৎপাদন করছেন কারাগারে। এসব উৎপাদনকৃত পণ্য কুষ্টিয়া কারাগারের সামনে প্রদর্শনী ও বিক্রয় কেন্দ্রে বিক্রি হচ্ছে। কারাগার থেকে এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন বিপ্লব, শাজাহান, রুবেলসহ আরো অনেকেই। মুক্তি পেয়ে তারাও এখন এ কাজ করে উপার্জন করছে।
জানুয়ারি মাস থেকে পাওয়ার লুম ও হস্ত চালিত তাঁত পুরোদমে উৎপাদনে যাবে। তখন চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ করা হবে। উৎপাদনকৃত পণ্য বিক্রির অর্ধেক পাবেন কয়েদিরা। কয়েদিরা কারাগারে একতারা তৈরি করছেন। এই একতারা লালন একাডেমির অনুষ্ঠানে অতিথিদের উপহার দেয়া হয়।
পাশাপাশি প্রতিদিন সকালে ইসলামিক ফাউন্ডেশন ও কারাগার থেকে পৃথকভাবে কুরআন শিক্ষা দেয়া হচ্ছে বন্দিদের।
ভাদালিয়া এলাকায় বাড়ি রুবেল হুসাইন জানান, কারাগার থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে তিনি বাইরের একটি দোকানে চাকরি শুরু করেছেন। প্রতিমাসে ১০ হাজার টাকা বেতন পান তিনি। ভাদালিয়া বাজারে মা টেলিকমে কাজ করেন রুবেল।
একই সাথে বিনোদনের জন্য জেল সুপার জাকের হোসেন সাংস্কৃতিক টিম গঠন করেছেন। কয়েদিদের নিয়ে বিশেষ টিম গঠন করেছেন তিনি। নিয়মিত সঙ্গীত প্রশিক্ষণসহ পরিবেশন করেন শিল্পীরা। জেলা ও দায়রা জজ এবং জেলা প্রশাসকসহ উধ্র্বতন কর্মকর্তারা কারাগার পরিদর্শনে গেলে এ টিমের সদস্যরা গান পরিবেশন করেন।
একই সাথে কারা অভ্যন্তরে একটি লাইব্রেরি স্থাপন করা হয়েছে। বন্দিদের বই পড়ার সুযোগ দিতে এ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তবে অর্থের অভাবে লাইব্রেরির অনেক কাজ বাকি রয়েছে।
কারাগার বিশেষ করে যারা মাদক ব্যবসায়ী আছেন তাদের পুনর্বাসন করতে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। মাদক ব্যবসায়ীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের কর্মের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এতে অনেক মাদক ব্যবসায়ী প্রশিক্ষণ নিয়ে এখন কাজ করে উপার্জন করছে।
তবে প্রশিক্ষন নিয়ে যারা বাইরে কাজ করছেন এমন কয়েকজন জানালেন, তারা প্রশিক্ষণ নিয়ে লোন পাচ্ছেন না। লোন পেলে তারা নিজেরাই সাবলম্বী হতে পারতেন।
জেল সুপার জাকের হোসেন বলেন, ‘বন্দিদের আলোর পথে আনতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বিভিন্ন ট্রেডে প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। বিশেষ করে নাম স্বাক্ষরসহ লেখাপড়া শেখা বাধ্যতামূলক। পাশাপাশি পাওয়ার লুম, দর্জি, হস্তচালিত তাঁত, ইলেকট্রিক, সঙ্গীত চর্চার ব্যবস্থা করা হয়েছে। বন্দিদের মাঝে পরিবর্তন আনার পাশাপাশি মাদক ব্যবসায়ীসহ অন্য আসামিদের আলোর পথে আনতে এসব উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। অনেকেই আলোর পথ খুঁজে পেয়েছেন। তারা উপার্জন করে সংসার চালাচ্ছে। এছাড়া বন্দিরা নানা ধরনের পণ্য উৎপাদন করছে। এ পণ্য বিক্রির অর্থ তারাও পাচ্ছে।’
জেলা প্রশাসক মোঃ আসলাম হোসেন বলেন, ‘জেল সুপারের তৎপরতায় কারাগারে নানা ধরণের প্রশিক্ষণ পাচ্ছেন বন্দিরা। পাশাপাশি যারা প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন তাদের যাতে অর্থ দিয়ে পুনর্বাসন করা যায় এমন বিষয় উধ্র্বতন কর্তৃপক্ষের নজরে আনা হবে। যাতে তারা কর্মসংস্থানের পথ করে নিতে পারে। আর যাতে নতুন করে কোন অপরাধে না জড়ায়।’